নবদেশ ডেস্ক
;
নবদেশ ডেস্ক
আপডেট : রবিবার ১৮ই জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০১ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
ছবি সংগৃহীত
‘ইতিহাসের সেরা নির্বাচন হবে’—বারবার এমন আশ্বাস দিয়ে আসছে বর্তমান নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অথচ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর চার সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকতে নানা ঘটনায় সেই আশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দেশের প্রায় ১৩ কোটি ভোটার অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রত্যাশায় থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু খবর জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কিছু ভিডিও ও কথোপকথনে দেখা যাচ্ছে—প্রবাসীদের জন্য বরাদ্দ পোস্টাল ব্যালট পেপার ‘ঝুট কাগজের স্তূপে’ পরিণত করা হচ্ছে। কোথাও কাড়াকাড়ি, হুড়োহুড়ি, বাগ্বিতণ্ডা ও ভাগাভাগির দৃশ্য উঠে এসেছে। এসব থেকেই ধারণা তৈরি হয়েছে যে, পরিকল্পিতভাবে বিপুল সংখ্যক পোস্টাল ব্যালট একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই ভোটের আগেই ‘ভোটের মহড়া’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। বিশেষ করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিষয়টি রাজনীতি সচেতন মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। প্রশ্নের তীর এখন অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দিকেই।
দীর্ঘদিন ধরেই সচেতন নাগরিক মহলে অভিযোগ রয়েছে—সরকারি আমলাতন্ত্রের ভেতরে পরিকল্পিতভাবে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিস্তার ঘটেছে। সাম্প্রতিক পোস্টাল ব্যালট ইস্যু সেই অভিযোগকে আরও উসকে দিয়েছে। অনেকের মতে, নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেই প্রভাবের বাইরে নেই।
জনমনে ঘুরেফিরে আলোচিত হচ্ছে—পোস্টাল ব্যালট একবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে সামনে আর কী কী অনিয়ম দেখা দিতে পারে?
এ বিষয়ে জানতে চাইলে একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রবীণ সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম বলেন— “ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাটি কার্যত একটি দলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এর মাধ্যমে ভোট ম্যানিপুলেশনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এই ব্যবস্থাটি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে—এমন আস্থা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়নি। এখনই বিকল্প ও কার্যকর চিন্তাভাবনা করা জরুরি।”
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং এটি অসদুপায়মুক্ত রাখা সম্ভব কিনা—সে বিষয়টি গভীরভাবে পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম অঞ্চল ঘিরে প্রতিক্রিয়া বেশি হওয়ার পেছনে রয়েছে একটি বাস্তব কারণ। বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পোস্টাল ব্যালট নিবন্ধন হয়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে।
পরিসংখ্যান বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অংশ নিতে পোস্টাল ব্যালটে নিবন্ধন করেছেন চট্টগ্রামের ৯৫ হাজার ২৪৬ জন প্রবাসী ভোটার। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া–লোহাগাড়া) আসনেই নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ১৪ হাজার ৩০১।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—ভাইরাল হওয়া পোস্টাল ব্যালট সংক্রান্ত ঘটনাগুলোর বেশিরভাগই ঘটেছে সৌদি আরব, বাহরাইন ও কুয়েতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
আরেকটি চমকপ্রদ বিষয় হলো পোস্টাল ব্যালট পেপারের নকশা। অভিযোগ উঠেছে, ব্যালটের শীর্ষ স্থানে একটি নির্দিষ্ট প্রতীককে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, আর দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রতীক ব্যালটের মাঝামাঝি ভাঁজের জায়গায় অবস্থান করেছে। এতে ভোটারদের মধ্যে বিস্ময় ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—কোন যুক্তিতে এমন বিন্যাস করা হয়েছে? এটি কি নিছক কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে?
এদিকে মাঠপর্যায়ে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী আগাম বিজয়ের আত্মবিশ্বাসে মত্ত বলে সমালোচনা রয়েছে। যদিও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার সতর্ক করে বলেছেন—এই নির্বাচন মোটেও সহজ হবে না, কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে এবং সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
সমালোচকদের মতে, এই আত্মতুষ্টির সুযোগেই একটি বিশেষ দল প্রশাসনিক ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় নিজেদের প্রভাব আরও শক্ত করছে।
নির্বাচন কমিশনে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ নিয়ে বিএনপির আগের দাবিও বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে মাঠ প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় তৃণমূলের মানুষজন বলছেন—পোস্টাল ব্যালট যেভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে, তাতে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ হবে না—এর নিশ্চয়তা কে দেবে?
সময়ের আগেই সতর্ক না হলে পরে আক্ষেপ ছাড়া কিছুই থাকবে না—এই কথাটিই এখন ঘুরে ফিরে শোনা যাচ্ছে।