স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দিচ্ছে না আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলের এমন সিদ্ধান্তে যেন প্রার্থিতার জোয়ার বইছে। সিটি করপোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনসহ বিভিন্ন স্তরের আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে বিপুলসংখ্যক প্রার্থী প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে বিভিন্ন এলাকায় সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলেও তা নিয়ে চিন্তিত নয় ক্ষমতাসীন দল। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় প্রার্থীরা জয়ী হলে একদিকে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে এলাকার উন্নয়নে তারা যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারবেন—এমনটিই প্রত্যাশা আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক এমন প্রার্থীদের আশঙ্কা, শেষ মুহূর্তে দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হলে তা নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ ধরনের কোনো সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা। আসন্ন নির্বাচনে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে না আসার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় স্থানীয় সরকারের বেশিরভাগ পদে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা বেশি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের মতোই স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দেখতে আগ্রহী ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সংশ্লিষ্ট আসনের এমপিদের থেকে প্রভাবমুক্ত রাখতে দলীয়ভাবে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা জোরালো হবে বলে অভিমত আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের।

আওয়ামী লীগ কাউকে কোনো সমর্থন দেবে না, জনগণ যাকে পছন্দ তাকে নির্বাচিত করবে, যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে উল্লেখ করে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘কোনো বড় কাজ করতে হলে, কিছু ছোট ছোট বিষয় আছে, এগুলো এর মধ্যে এসে পড়বে। কারও ইচ্ছায় নির্বাচন প্রভাবিত হবে, এমন কোনো কারণ নেই। নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী—এবার তারা প্রমাণ করেছে এবং তারা আরও শক্তিশালী হবে। তারা আরও বেশি করে তাদের ওপর আরোপিত দায়িত্ব পালন করতে পারবে। তাতে নির্বাচনী ব্যবস্থায় সামনের দিকে আমাদের জন্য শুভ দিন অপেক্ষা করছে।জানা গেছে, আগামী ৯ মার্চ ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে নতুন মেয়াদে এবং কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। একই দিন পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, এবং জেলা পরিষদের নির্বাচন ও উপনির্বাচন রয়েছে। ঈদের পরপরই সারা দেশে উপজেলা পরিষদে ধাপে ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার বিধান থাকলেও কোনো দল প্রার্থী না দিলেও সমস্যা না থাকায় আওয়ামী লীগ সেই সুযোগ নিতে যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন  বলেন, ‘দলের তো কারও প্রতি সমর্থন থাকবে না—এটা নিশ্চিত করা হয়েছে। সুতারাং প্রার্থী বেশি হবে, যে জনপ্রিয় সেই নির্বাচিত হবে। প্রার্থী বেশি হলেও সংঘাত হবে না। কারণ নির্বাচন কমিশন শক্ত হাতে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। যেমন করেছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে।’

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালের ৫ মে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ইকরামুল হক টিটু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। তবে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রতীকে প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় এবার এই সিটিতে নির্বাচন জমে উঠবে বলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের ধারণা। একই সঙ্গে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রভাব এই নির্বাচনে পড়বে বলেও মনে করেন তারা।

জানা গেছে, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে অংশ নিতে আওয়ামী লীগেরই অন্তত ছয় জন নেতা মাঠে রয়েছেন। তারা হলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান মেয়র ইকরামুল হক টিটু, সাবেক সভাপতি সাদেক খান মিল্কী টজু, সাবেক সহসভাপতি গোলাম ফেরদৌস জিলু, সাবেক পৌর মেয়র মাহমুদ আল নূর তারেকের ছেলে ফারমার্জ আল নূর রাজীব এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এহতেশামুল আলম রয়েছেন। এর বাইরেও অন্যান্য দল ও সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে কয়েকজন নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অন্যদিকে গত বছর ১৩ ডিসেম্বর আরফানুল হক রিফাতের মৃত্যুতে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ শূন্য হয়। এখানকার মেয়র পদের উপনির্বাচনেও প্রার্থীর ছড়াছড়ি। অন্তত ১০ জন এই উপনির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। তাদের মধ্যে আছেন মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আতিক উল্ল্যাহ খোকন, কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জহিরুল ইসলাম সেলিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ নুরুর রহমান, সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা আফজল খানের মেয়ে আঞ্জুম সুলতানা সীমা, সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের মেয়ে তাহসিন বাহার সূচনা, ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম, দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সাবেক সভাপতি কবির ইসলাম শিকদার ও আনিসুর রহমান মিঠু।

বরগুনা জেলার আমতলী পৌরসভার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের তিনজন প্রার্থীসহ অন্তত পাঁচজন রয়েছেন, যারা আসন্ন নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। এই তালিকায় থাকা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নাজমুল আহসান নান্নু  বলেন, ‘প্রার্থীরা সবাই এখন মাঠে। জনগণের ভোটেই নির্বাচিত হতে হবে। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, সুতরাং এখানে কোনো প্রভাব সেভাবে কাজে আসবে না। যে জনপ্রিয় সেই জিতবে।

অন্যদিকে ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল পৌরসভার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অন্তত চারজন নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। দলীয় প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়েছে। রাত-দিন এক করে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নবী নেওয়াজ সরকার  বলেন, ‘প্রস্তুতি নিচ্ছি। গতবার তো নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করেছিলাম; কিন্তু এবার তো নৌকা নেই। দলীয় প্রতীক তো একটি শক্তি, একটি চাপ। দলীয় প্রভাব যেহেতু থাকবে না, সুতরাং নির্বাচন কঠিন হবে। প্রতিযোগিতা অনেক বেশি হবে।

একই ধরনের অবস্থা জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ পৌরসভায়। এখানে আওয়ামী লীগের অন্তত তিনজন প্রার্থী রয়েছেন। সব মিলিয়ে অর্ধডজন প্রার্থী পৌর মেয়র হতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবেন।

অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ ও উপনির্বাচনেও প্রার্থীর ছড়াছড়ি। দলীয় প্রতীক না থাকার সুবাদে ভোটের হিসাব-নিকাশ নতুন করে করছেন বিভিন্ন পদে আগ্রহী প্রার্থীরা।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীদের জনপ্রিয়তার সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল চাবিকাঠি হিসেবে ভূমিকা রাখে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেন সব ধরনের প্রভাবমুক্ত হয়, সেজন্য নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও কাজ করবে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম  বলেন, ‘প্রভাব তো কেউ কেউ খাটাতে চেষ্টা করবেই। জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন যে সফলতা দেখিয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সেভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন করবে। দলীয় প্রতীক যেহেতু থাকবে না, সেহেতু নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রাখতে আওয়ামী লীগ যথাযথ ভূমিকা পালন করবে। নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত রাখতেই দলের পক্ষ থেকে কাউকে সমর্থনও দেওয়া হবে না।