স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে প্রাধান্য দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের লক্ষ্য সামনে রেখে টেকসই কর্মসংস্থানের জন্য ভারী শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিচ্ছে দলটি। এজন্য তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিকস খাত বিশেষ গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি রপ্তানি পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে জোর দেওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা থাকবে প্রতিশ্রুতির শীর্ষ তালিকায়। আওয়ামী লীগের ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণা করবে আওয়ামী লীগ। সেই লক্ষ্যে ইশতেহার প্রণয়নের কাজ পুরোদমে চললেও এখন পর্যন্ত এর প্রতিপাদ্য চূড়ান্ত হয়নি। আসন্ন নির্বাচনী ইশতেহারে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনের অনেক বিষয় ধারাবাহিকভাবে স্থান পেলেও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের মর্যাদা পেতে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা নিয়ে ইশতেহার প্রণয়ন করছে দেশের সবচেয়ে পুরোনো এই দল।

ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির প্রধান ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সবসময় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। এবারও নির্বাচনী ইশতেহার হবে জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। আমরা এখনো প্রতিপাদ্য চূড়ান্ত করিনি। তবে ডিজিটালের সঙ্গে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দেওয়া হবে। শিল্প কারখানা ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী ইশতেহার প্রণয়ন করা হবে।’

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্ত করতে কাজ করছে ড. আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে ২৫ কমিটি। এরই মধ্যে কমিটির কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইশতেহার প্রণয়ন কমিটি গত অক্টোবর মাসে প্রথম সপ্তাহে নাগরিকদের মতামত চেয়ে একটি গণবিজ্ঞপ্তি দেয়। গতকাল রোববার এই কমিটি পেশাজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করে। সভায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, সে বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হয়।

দলটির ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির একাধিক সদস্য জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের গত তিন মেয়াদে প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো নির্মাণ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এর মধ্যে যোগাযোগ খাতের অবকাঠামো সবচেয়ে বেশি করা হয়েছে। এখন দেশের প্রতিটি জেলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় ভালো। পদ্মা সেতুর কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থনৈতিক চাকায় গতি পেয়েছে। চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। সারা দেশে ১০০ শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ এখন বড় বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত। ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠার সময় এখন। তাই এখন টেকসই শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়ে ইশতেহার প্রণয়ন করা হচ্ছে।

তারা জানান, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা বা রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস পোশাক খাত। দেশের অর্থনীতিতে এ খাতটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ খাতের রপ্তানির উল্লেখযোগ্য বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও কিছু পশ্চিমা দেশ। বিকল্প বাজার বা পণ্য না থাকায় মাঝেমধ্যে বিপদে পড়তে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে পোশাক আমদানির অজুহাতে এসব দেশ সময়-অসময় নানা খবরদারি করে বাংলাদেশের ওপর। এমনকি বাংলাদেশের নানা আভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনৈতিক হস্তক্ষেপও করে। এ কারণে বিকল্প বাজার খোঁজার ওপর জোর দিয়ে এ বিষয়ে ইশতেহারে থাকছে একটি পথনকশা।

পাশাপাশি বিগত বছরগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি আয় ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। এ খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সবচেয়ে বেশি। এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি খাতটি রপ্তানি আয়ে পোশাক খাতের বিকল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যে কারণে আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে এ খাতটির ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি বাড়ানো গেলে পোশাক খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমে আসবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ভালো হবে।

কমিটির এক সদস্য জানান, বিশ্বের শিল্প-উন্নত অনেক দেশ শুরুতে পোশাক তৈরি করত। ধীরে ধীরে তারা ভারী শিল্পের দেশে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে জার্মানি ও জাপান অন্যতম। এখন দেশ দুটি বিশ্বে ভারী শিল্প স্থাপন ও মেশিনারিজ উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অর্থনীতি এখন যে পর্যায়ে রয়েছে, এ পর্যায়ে বড় বিনিয়োগ ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠা করা গেলে ২০৪১ সালের উন্নত দেশের কাতারে যাওয়ার লক্ষ্য পূরণে বেগ পেতে হবে না। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ তৈরি হবে।

জানা গেছে, ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রথমে গুরুত্ব পাবে ভারী যন্ত্রাংশ উৎপাদনে বড় বড় কারখানা প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য দরকার বিদেশি বিনিয়োগ। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে দেশব্যাপী ১০০ শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। এসব শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজনীয় সব সুবিধা রাখা হচ্ছে। কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে এরই মধ্যে কিছু কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব শিল্পাঞ্চল পুরোদমে চালু করা গেলে উল্লেখযোগ্য হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। কর্মসংস্থানের বিবেচনায় এর পরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ইলেকট্রনিক্স খাতকে। এরই মধ্যে বিশ্বের বড় বড় কয়েকটি ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। এরপর সেবা খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে মোট কর্মসংস্থানের মধ্যে ৫২ শতাংশই সেবা খাতে। তাই এ খাতে টেকসই কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া বিগত ইশতেহারের মতো আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ প্রক্রিয়া জোরদারকরণ; আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ; দক্ষ, সেবামুখী ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা; জনবান্ধব আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়ে তোলার নিশ্চয়তা; দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিগ্রহণ; উচ্চ আয়; টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন; অবকাঠামো উন্নয়নে বৃহৎ প্রকল্পগুলোর (মেগা প্রজেক্ট) দ্রুত ও মানসম্মত বাস্তবায়ন; গ্রামে নগরের সুবিধা সম্প্রসারণ, নারীর ক্ষমতায়ন, লিঙ্গসমতা ও শিশুকল্যাণ নিশ্চিতকরণ; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা; আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাভিত্তিক যান্ত্রিকীকরণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

এ ছাড়া গত নির্বাচনের ইশতেহারে উল্লিখিত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি রোধে জিরো টলারেন্স নীতির বিষয়টি এবারও গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনা হবে। নানাবিধ কারণে এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আওয়ামী লীগ অতীতের অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি উদ্যোগী হবে বলে জানিয়েছেন ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সদস্যরা।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব সেলিম মাহমুদ বলেন, ‘সারা পৃথিবীতেই দুর্নীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। আমাদের এবারের ইশতেহারেও এ দুটি বিষয় থাকছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেয়া হবে নির্বাচনী ইশতেহারে। এজন্য পেশাজীবিদের কাছে থেকে বিস্তারিত মতামত নেওয়া হয়েছে। অনেকে লিখিতভাবেও জানিয়েছেন। সব কিছু নিয়ে আলোচনা করেই জনবান্ধব ইশতেহার উপস্থাপন করা হবে।’