যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আফরিন আখতার দুই দিনের সফর শেষে মঙ্গলবার (১৭ অক্টোবর) রাতে ঢাকা ছেড়েছেন। সফরের শেষ দিন বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্টের অবস্থান জানিয়ছেন তিনি।

আফরিন আক্তার ওয়াশিংটনের অবস্থান জানিয়ে বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখবে যুক্তরাষ্ট্রে। একই সঙ্গে দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বকে এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের শান্তিপূর্ণ উত্তরণে যুক্তরাষ্ট্র জোর দিচ্ছে। গত সোমবার ঢাকায় আসেন আফরিন আখতার। সফরের প্রথম দিন তিনি পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় দেখা করেন। এর আগে তিনি সেখানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই মহাপরিচালক ফেরদৌসি শাহরিয়ার ও খন্দকার মাসুদুল আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন।

বুধবার (১৮ অক্টােবর) কূটনৈতিক সূত্রে বলা হয়-আফরিন আক্তারের দুই দিনের সফরে সরকার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। নির্বাচনের বিষয়টি ঘুরেফিরে আলোচনায় এসেছে।

আফরিন আক্তার ঢাকা সফরে বেশ স্পষ্ট করেই অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের ব্যাপারে তার সরকারের আশাবাদের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন প্রাক্‌-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের পাঁচ দফা সুপারিশকে দেশটির প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন সমর্থন করে।

আফরিন আক্তার মে মাসের পর দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকা ঘুরে গেলেন। বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনের আগে এটিই হতে পারে জ্যেষ্ঠ কোনো প্রতিনিধির শেষ সফর। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় যুক্তরাষ্ট্রের উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের বিষয়ে তাদের অভিমত জানতে চেয়েছেন।

চা-চক্রে উপস্থিত দুই অতিথি জানান, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিষয়টি নিয়ে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলতে তারা জনগণের অংশগ্রহণ এবং দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অংশ নেওয়ার ওপর জোর দেন। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ভোট পাওয়ার হার প্রায় সমান। তাই পছন্দের দল ও প্রার্থী বেছে নেওয়ার সুযোগ জনগণকেই দিতে হবে।

এ সময় আফরিন আক্তার অতিথিদের জানান, যুক্তরাষ্ট্রও চায় জনগণ ভোট দিক। অবশ্যই যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে তাদের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার যথাযথ সুযোগ থাকে।

অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের বিষয়ে বাংলাদেশ বারবার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করছে। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র কেন এ বিষয়টিতে জোর দিচ্ছে। এ নিয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কূটনীতিক এই প্রতিবেদককে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে অঙ্গীকার নয়, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখতে চায়। তাই বাংলাদেশ যেন তার অঙ্গীকার যথাযথভাবে পূরণ করে, সে জন্য একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ অব্যাহত রাখছে।

হুমায়ুন কবীর মনে করেন, নির্বাচন যদি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়, তাহলে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও সমৃদ্ধ হবে—এই বার্তাই আফরিন আক্তার দিয়ে গেছেন।

আফরিন আক্তারের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উত্তর আমেরিকা অনুবিভাগের মহাপরিচালক মাসুদ আলমের বৈঠকের পর ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ফেসবুক পেজে এক বার্তায় বলা হয়, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণভাবে দেখতে চায় বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। আমরা দুই দেশের শক্তিশালী বহুমুখী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেছি। বিনিয়োগ ও বাণিজ্য, দুই দেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারত্ব, মধ্যপ্রাচ্য, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষক দলের সাম্প্রতিক সফর, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও কথা হয়েছে। এ ছাড়া আলোচনা হয়েছে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে জনগণের ভোট প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সরকারের প্রচেষ্টা নিয়ে।

নাগরিক সমাজের স্থান সংকুচিত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন করলে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, তারা বলেছে, পর্যবেক্ষক দলের সুপারিশগুলো যুক্তরাষ্ট্র সরকার সমর্থন করে। সুপারিশগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ কী করছে বা কী করবে, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করেননি।

পর্যবেক্ষক দলের সুপারিশ বাংলাদেশ সমর্থন করে কিনা– এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা তা এখনো বিচার বিশ্লেষণ করছি। নির্বাচন কমিশনও এটা দেখছে। এ মুহূর্তে এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো মন্তব্য নেই।

যুক্তরাষ্ট্র কি সংলাপ চায়– উত্তরে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সংলাপের কথা যুক্তরাষ্ট্র বলেছে। নতুন করে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ নিয়ে বৈঠকে কোনো পক্ষ কিছু বলেনি।

নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় কোনো চুক্তি হবে কিনা– উত্তরে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এ মুহূর্তে নতুন করে কোনো চুক্তির সম্ভাবনা দেখছি না।

নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ কিনা– উত্তরে তিনি বলেন, তারা যদি অযাচিতভাবে এ বিষয়ে কথা বলে এবং সেটি যদি আমরা মনে করি আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ, তখন আমরা ভিয়েনা সনদের কথা বলি। বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে বা উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে যদি কোনো মন্তব্য থাকে অভ্যন্তরীণ আলোচনায়, সেটা আমরা সবসময়ে উত্তর দিতে প্রস্তুত। কিন্তু জনসম্মুক্ষে কিছু বললে আমাদের আপত্তি রয়েছে।

মাসুদ বিন মোমেন বলেন, আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব র‍্যাব ও এর কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।