ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ঢাকায় আসছেন রোববার (১০ সেপ্টেম্বর)। তার এ সফরের সময় দু’দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ম্যাক্রোঁর সফরকালে বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয় স্যাটেলাইটের বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। এর বাইরে অস্ত্র, উড়োজাহাজ কেনা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক ইস্যুতে উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঢাকার ফরাসি দূতাবাস তাদের ফেসবুক পেজে বলেছে, প্রেসিডেন্টের এই সফর কিছু সুনির্দিষ্ট প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, ম্যাক্রোঁর ঢাকা সফর দুই দেশের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে ‘নতুন উচ্চতায়’ নিয়ে যাবে।

গুরুত্ব পাবে যেসব বিষয়

ঢাকায় কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই সফর কয়েকটি কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রান্স অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশের কাছে সমরাস্ত্র বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দেশটি সামরিক সরঞ্জাম শিল্পেও বেশ প্রভাবশালী।

যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িংয়ের আধিপত্য কমাতে দেশের বিমান বহরের জন্য ফরাসি এয়ারবাস কোম্পানির উড়োজাহাজ কেনার কথা বিবেচনা করছে বাংলাদেশ সরকার। অন্যদিকে ভারত মহাসাগরকে ঘিরে ফ্রান্সের আলাদা কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। এ অঞ্চলে দেশটির সামরিক উপস্থিতিও রয়েছে। ফ্রান্স এখন চাইছে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবিরের মতে, ফরাসিরা ব্যবসা ও ভূ-কৌশলগত বিষয়ে সবসময় বিশেষ দৃষ্টি দিয়ে থাকে। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, প্রেসিডেন্ট নিজেই যেহেতু আসছেন, তাই সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে আলোচনা হবেই। আমার ধারণা, সেটি ব্যবসায়িক বিষয়ই হবে। ব্যবসার জন্য ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সরাসরি ভূমিকা রেখে থাকেন। আর যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার মো. আব্দুল হান্নান বলছেন, ফ্রান্স ইউরোপের প্রভাবশালী একটি দেশ। ফলে ভূ-কৌশলগত ও ভূ-অর্থনৈতিক বিবেচনায় ফরাসি প্রেসিডেন্টের এ সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ফ্রান্সের গুরুত্ব দেওয়ার প্রমাণই হলো দেশটির প্রেসিডেন্টের সফর। আশা করা হচ্ছে, ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বের বড় ২২টি অর্থনীতির একটি হবে বাংলাদেশ। সঙ্গত কারণেই ফ্রান্স প্রযুক্তি ও ব্যবসার নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এ কারণে শীর্ষ পর্যায়ের এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

ঢাকার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের বিষয়ে একটি সমঝোতা চুক্তি সেই হতে পারে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সফরকালে। এটি হবে একটি আর্থ অবজারভেটরি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্থলভাগ ও জলভাগ পর্যবেক্ষণ সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হয়েছিল ২০১৮ সালের ১৯ মে যুক্তরাষ্ট্রের কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে। সেটিও নির্মাণ করেছিল ফরাসি একটি প্রযুক্তি কোম্পানি। এছাড়া এয়ারবাস কোম্পানি থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে উভয় দেশের কর্মকর্তারা আলোচনা করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালে র‍্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। তার মধ্যেই চলতি বছরের শুরুতে ফ্রান্সের এয়ারবাস কোম্পানি থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকেও নতুন উড়োজাহাজ কেনা অব্যাহত রাখার বিষয়ে চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ফরাসি প্রেসিডেন্টের এই সফরে বিষয়টি আলোচনায় আসবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

২০২১ সালে শেখ হাসিনার ফ্রান্স সফরের সময়ে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সমঝোতাপত্রে সই করেছিল বাংলাদেশ ও ফ্রান্স। দেশটি অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশে সমরাস্ত্র বিক্রি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। বাংলাদেশও ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর মাধ্যমে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেছে। এসব নিয়ে আলোচনার জন্য শেখ হাসিনার ফ্রান্স সফরের আগে ২০২০ সালের মার্চে ফরাসি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঢাকায় এসেছিলেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের কাছে রাফাল জঙ্গিবিমান বিক্রির প্রস্তাব তুলে ধরা। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, সমরাস্ত্র হোক বা এয়ারবাস-তাদের মূল নজরই থাকবে ব্যবসা। আর মনে রাখতে হবে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্সের স্বতন্ত্র সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। অর্থাৎ এ অঞ্চলটি তাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই ফ্রান্স চাইবে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত করতে।

স্বস্তি আসবে সরকারের জন্য?
ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, জি-২০ সম্মেলন থেকে সরাসরি ঢাকায় আসার যে সিদ্ধান্ত ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিয়েছেন, তার রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। বিশেষ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র যখন বাংলাদেশের ওপর নানা ইস্যুতে ক্রমাগত চাপ তৈরি করছে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের বিষয়েও আগ্রহ রয়েছে ফ্রান্সের।

অন্যদিকে, পশ্চিমা সরকারপ্রধানদের মধ্যে একমাত্র ফরাসি প্রেসিডেন্টই চীন সফর করেছেন। চীন আবার বাংলাদেশের নানা প্রকল্পে ব্যাপকভাবে জড়িত। এমন পরিস্থিতিতে ফরাসি প্রেসিডেন্টের ঢাকার সফর নির্বাচনের আগে বাংলাদেশর বর্তমান সরকারের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘যুক্তরাষ্ট্রের কারণে তৈরি হওয়া অস্বস্তি’ কাটাতে সহায়তা করবে বলে আশা করছে সরকারি সূত্রগুলো।

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার মো. আব্দুল হান্নান বলছেন, ভূ-কৌশলগত ও ভূ-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ তার গুরুত্ব তৈরি করতে পেরেছে বলেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট এ সফরে আসছেন। তিনি বলেন, স্যাটেলাইট ও এয়ারবাস নিয়ে উভয় দেশ কাজ করছে। এখন এসব নিয়ে চুক্তি করা বা চুক্তির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার মানে ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তি অংশীদারত্বের জন্য বাংলাদেশকে সক্ষম হিসেবে বিবেচনা করছে ফ্রান্স। এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম কোনো ফরাসি প্রেসিডেন্ট ঢাকা সফরে আসছেন। এর আগে, ম্যাক্রোঁর আমন্ত্রণেই ২০২১ সালের নভেম্বরে ফ্রান্স সফর করেন শেখ হাসিনা।