সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সহযোগিতা করেছেন তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান। সব সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে তারেক-জোবায়দার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেছেন রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী।

বুধবার (২ আগস্ট) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আছাদুজ্জামান এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন। রায়ে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি ১৩ বছরের কারাদণ্ড প্রত্যাশা করছে দুদক।

এর আগে পৃথক চার মামলায় তারেক রহমানের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। তবে, জোবায়দার এটি প্রথম ও একমাত্র মামলার রায় বলে জানিয়েছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা। মুদ্রা পাচারের মামলায় ২০১৩ সালে তারেক রহমানকে প্রথমে খালাস দিয়েছিলেন ঢাকার আদালত। তবে, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিলের পর হাইকোর্টের রায়ে সাত বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। তার পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়া এতিমখানা দুর্নীতি ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে তারেকের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। খালেদার হয় পাঁচ বছর কারাদণ্ড, তারেকের হয় ১০ বছর সাজা। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলার রায়ে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের দুই মামলার প্রতিটিতে কয়েকটি ধারায় তাকে তিনবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সেইসঙ্গে বিস্ফোরক আইনের আরেকটি ধারায় তার ২০ বছর কারাদণ্ডাদেশ হয়। তবে, সবগুলো সাজা একসঙ্গে কার্যকরের উল্লেখ থাকায় তারেককে যাবজ্জীবন সাজা খাটার বিষয়টি রায়ে উল্লেখ করা হয়।

সর্বশেষ ২০২১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিযোগে নড়াইলে দায়ের হওয়া মানহানি মামলায় তারেক রহমানকে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেন আদালত। পাশাপাশি তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সহযোগিতা করেছেন তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান। আমরা সব সাক্ষ্য প্রমাণে তাদের বিরুদ্ধে দুদক আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। ২৬ (২) ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের কারাদণ্ড ও ২৭(১) ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের সর্বোচ্চ কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আমরা যুক্তি উপস্থাপন শেষে তাদের দুই আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যাশা করছি।

বিএনপির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ জয়নুল আবেদীন মেজবাহ বলেন, তারেক রহমান ও জোবায়দা রহমানের বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে তা রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য। তারেক রহমানের এর আগে চার মামলায় কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এ দণ্ডগুলোও রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য দেওয়া হয়েছে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আরও একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। জোবায়দা রহমানের বিরুদ্ধে এটি প্রথম ও একমাত্র মামলা। তাকেও রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার জন্য এ মামলা করা হয়েছে।

এর আগে বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. আছাদুজ্জামান রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে তারেক-জোবায়দার মামলার রায় ঘোষণার জন্য বুধবার (২ আগস্ট) দিন ধার্য করেন। এ মামলায় ৫৬ জন সাক্ষীর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৪২ জন সাক্ষ্য দেন।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কাফরুল থানায় তারেক ও জোবায়দার বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলাটি করেন দুদকের উপ-পরিচালক জহিরুল হুদা। এতে তাদের বিরুদ্ধে ঘোষিত আয়ের বাইরে চার কোটি ৮১ লাখ ৫৩ হাজার ৫৬১ টাকার মালিক হওয়া এবং সম্পদের তথ্য গোপন ও জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়। এছাড়া মামলায় আসামি করা হয় তারেক রহমানের শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুকে।

এরপর ২০০৮ সালে তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম। এ মামলা থেকে সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানুকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

এর আগে ২০২২ সালের ১ নভেম্বর অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে তারেক রহমান ও জোবায়দা রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। বর্তমানে তারা পলাতক। ২০২৩ সালের ১৩ এপ্রিল তারেকের বিরুদ্ধে দুদক আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন আদালত। আর জোবায়দা রহমানের বিরুদ্ধে তারেক রহমানকে সহযোগিতার অভিযোগে ১০৯ ধারায় অভিযোগ গঠন করেন আদালত।

যে অভিযোগ প্রমাণিত হলে যে শাস্তি হতে পারে তারেক-জোবায়দার
২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৬(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘কমিশন কোন তথ্যের ভিত্তিতে এবং উহার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় [অনুসন্ধান] পরিচালনার পর যদি এ মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, কোনো ব্যক্তি, বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, বৈধ উৎসের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পত্তির দখলে রহিয়াছেন বা মালিকানা অর্জন করিয়াছেন, তাহা হইলে কমিশন, লিখিত আদেশ দ্বারা, উক্ত ব্যক্তিকে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতিতে দায়-দায়িত্বের বিবরণ দাখিলসহ ওই আদেশে নির্ধারিত অন্য যেকোনো তথ্য দাখিলের নির্দেশ দিতে পারিবে। (২) যদি কোনো ব্যক্তি- (ক) উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত আদেশ প্রাপ্তির পর তদ্নুযায়ী লিখিত বিবৃতি বা তথ্য দিতে ব্যর্থ হন বা এমন কোনো লিখিত বিবৃতি বা তথ্য প্রদান করেন যাহা ভিত্তিহীন বা মিথ্যা বলিয়া মনে করিবার যথার্থ কারণ থাকে, অথবা (খ) কোনো বই, হিসাব, রেকর্ড, ঘোষণাপত্র, রিটার্ন বা উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো দলিলপত্র দাখিল করেন বা এমন কোনো বিবৃতি দেন যাহা ভিত্তিহীন বা মিথ্যা বলিয়া মনে করিবার যথার্থ কারণ থাকে, তাহা হইলে ওই ব্যক্তি ৩ (তিন) বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তাহার নিজ নামে, বা তাহার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তির নামে, এমন কোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির দখলে রহিয়াছেন বা মালিকানা অর্জন করিয়াছেন, যাহা অসাধু উপায়ে অর্জিত হইয়াছে এবং তাহার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ বলিয়া মনে করিবার যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে এবং তিনি এরূপ সম্পত্তি দখল সম্পর্কে আদালতের কাছে বিচারে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হইলে ওই ব্যক্তির অনূর্ধ্ব ১০ (দশ) বছর এবং অন্যূন ৩ (তিন) বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং তদুপরি অর্থ দণ্ডেও দণ্ডিত হইবেন। এরূপ সম্পত্তিগুলো বাজেয়াপ্ত যোগ্য হইবে। (২) উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত কোনো অপরাধের বিচার চলাকালীন যদি প্রমাণিত হয় যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজ নামে, বা তাহার পক্ষে অপর কোনো ব্যক্তির নামে, তাহার জ্ঞাত আয়ের উৎসের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা অর্জন করিয়াছেন বা অনুরূপ সম্পত্তির দখলে রহিয়াছেন, তাহা হইলে আদালত অনুমান করিবে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই অপরাধে দোষী, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতে ওই অনুমান খণ্ডন করিতে না পারেন এবং কেবল এরূপ অনুমানের ওপর ভিত্তি করিয়া কোনো দণ্ড অবৈধ হইবে না।