শ্রাবণ মাস ভরবর্ষার সময়। কিন্তু দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলই এখনো বৃষ্টিহীন। একই সঙ্গে বইছে তাপপ্রবাহ। বৃষ্টি যা হচ্ছে তাও সামান্য। সুনীল আকাশ, হঠাৎ এক চিলতে মেঘ এসে বৃষ্টি নামিয়ে দিচ্ছে। এক পশলা হালকা বৃষ্টি শেষে ঝকঝকে রোদ। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বৃষ্টির এ বৈশিষ্ট্য বর্ষাকালের সঙ্গে যায় না।

যখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ক্ষেত, জলাশয়, পুকুর পানিতে থইথই করার কথা সেখানে পানিতে ঘাসও ডোবেনি। এতে কৃষিকাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে তাপমাত্রার পারদও স্বাভাবিকতার সীমা ছাড়িয়েছে। শ্রাবণেও যেন চৈত্রের গরম, তাই বর্ষার যৌবনেও জনজীবনে নাভিশ্বাস।

আবহাওয়াবিদরা জানান, সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম বৃষ্টি হচ্ছে। চলতি মাসে এখন পর্যন্ত কোথাও কোথাও ৭০ শতাংশের কম বৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে ১ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকছে। তাই অস্বাভাবিক বৃষ্টি ও তাপমাত্রার বর্ষাকাল পার করছে বাংলাদেশ।

আবহাওয়াবিদ ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষার এমন আচরণ অতীতেও দেখা গেছে। সাগর থেকে প্রয়োজনীয় জলীয়বাষ্প স্থলভাগে আসতে পারছে না। তাই মৌসুমি বায়ুর নিষ্ক্রিয়তায় এ বৃষ্টিহীনতা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ আবহাওয়ার বিভিন্ন বিষয় এর জন্য দায়ী।

বৃষ্টিহীন তপ্ত বাস্তবতা এ মুহূর্তে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই খরা যাচ্ছে। গত শুক্রবার বার্তা সংস্থা এএফপি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার শীর্ষ জলবায়ুবিদ গ্যাভিন স্মিট এক বিবৃতিতে জানান, চলমান জুলাই মাস হতে পারে শত শত বছরের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ মাস। এছাড়া চলতি বছরের তুলনায় ২০২৪ সাল আরও বেশি উষ্ণ বছর হতে পারে।

মঙ্গলবার (২৫ জুলাই) বর্ষার দ্বিতীয় মাস শ্রাবণের ১০ তারিখ। কোথাও কোথাও হালকা ও ছিঁটেফোঁটা বৃষ্টি হচ্ছে, এছাড়া বেশিরভাগ অঞ্চলেই বৃষ্টি নেই। চলতি মাসের বাকি দিনগুলোতেও বৃষ্টি বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন না আবহাওয়াবিদরা।

আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, ‘জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমরা বর্ষাকাল ধরি। সারা বছর যে বৃষ্টিপাত হয়, এর ৭১ শতাংশই হয় এ চার মাসে।’

তিনি বলেন, ‘২২ জুলাই পর্যন্ত যে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, সেই অনুযায়ী সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫৯ শতাংশ বৃষ্টি কম হয়েছে। তবে আগামী কয়েকদিন তো টুকটাক কিছু বৃষ্টি হবে। তাই জুলাইয়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বৃষ্টি কম হতে পারে।’

এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সবচেয়ে কম জানিয়ে তিনি বলেন, ‘২২ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৭ শতাংশ বৃষ্টি কম হয়েছে। চট্টগ্রামে প্রচুর বৃষ্টি হয়। অতীতের বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি, সেখানে ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এবার সেখানে বৃষ্টি সবচেয়ে কম।’

‘২২ তারিখ পর্যন্ত রেকর্ড করা বৃষ্টিপাত অনুযায়ী স্বাভাবিকের চেয়ে ঢাকায় ৫৩ শতাংশ, ময়মনসিংহে ১৬ শতাংশ, সিলেটে ৯ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫৮ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া রংপুরে ৩২ শতাংশ, খুলনায় ৬০ শতাংশ, বরিশালে ৬৯ শতাংশ বৃষ্টি কম হয়েছে।’

এখন সারাদেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা মোটামুটি ১ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকছে। কখনো কখনো তা ৬ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে বলেও জানান নাজমুল হক।

গত ২৩ জুলাই দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয় জানিয়ে এ আবহাওয়াবিদ বলেন, ‘এ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।’

একই সঙ্গে রোববার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রংপুরে সাড়ে ৩ ডিগ্রি, ময়মনসিংহে ১ ডিগ্রি, সিলেটে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, চট্টগ্রামে ৪ ডিগ্রি, খুলনায় ৩ ডিগ্রি, বরিশালে সাড়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল বলেও জানান তিনি।

নাজমুল হক বলেন, ‘জুলাই মাসে এমন কম বৃষ্টি হয় না, তা নয়। এবার বৃষ্টি কম হচ্ছে, আগামী কয়েক বছর বৃষ্টি কম নাও থাকতে পারে। আবার কোনো এক বছর বৃষ্টি একেবারে কমে গেলো। এবার বৃষ্টি ও তাপমাত্রা স্বাভাবিক নয়, এটা বলা যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর অবস্থান দুটি জায়গায় মূল্যায়ন করি। একটি বাংলাদেশের স্থলভাগে, আরেকটি উত্তর বঙ্গোপসাগরে। সেই মৌসুমি বায়ু এখন বাংলাদেশের স্থলভাগে কম সক্রিয়, তবে উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে।’

‘এ সময়ে সমুদ্র থেকে যে পরিমাণ জলীয়বাষ্প স্থলভাগে আসার কথা, সেই পরিমাণ না এলে বৃষ্টি কম হয়। এসবের ওপর ভিত্তি করে মৌসুমি বায়ু সক্রিয়তার বিষয়টি নির্ভর করছে। প্রতিটি সিজনেই জলীয়বাষ্পের পরিমাণের তারতম্য হয়।’

এ অস্বাভাবিক বর্ষাকালের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা তো বিশ্বের বাইরে না। কেউ পাঁচ হাত দূরে সিগারেট খেলে সেই ধোঁয়া তো আমার কাছেও আসবে। তবে মৌসুমি বায়ু কম সক্রিয় থাকার অনেক রেকর্ড রয়েছে।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন মাসের অর্ধেকটা জুড়ে ছিল বর্ষার প্রথম মাস আষাঢ়। জুন মাসেও সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ১৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। জুন মাসে রাজশাহী বিভাগে ৪৮, বরিশাল বিভাগে ৩৬, ঢাকা বিভাগে ১০, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৩, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৮, খুলনা বিভাগে ২০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। তবে সিলেটে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫৫ শতাংশ এবং রংপুরে ১৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।

জুন মাসে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ০ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। সারাদেশে গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল বলেও জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

গত কিছুদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মৃদু তাপপ্রবাহ (৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বইছে। সবশেষ সোমবার রাজশাহী, পাবনা, রংপুর, দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছিল।

তাপপ্রবাহ কয়েকটি জেলায় বইলেও গরমের অস্বস্তি রয়েছে সারাদেশ জুড়েই। কারণ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকলেও অনুভূত হচ্ছে বেশি। কারণ বৃষ্টি না হওয়ায় বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে শরীরে ঘাম হয় এবং তা সহজে বাষ্পীভূত হয় না, এতে অস্বস্তি লাগে। গরমের অনুভূতি বেশি হয়। বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ৭০ শতাংশের বেশি থাকছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে এখন সারা পৃথিবীতেই তাপমাত্রা বেশি। মৌসুম শুরুর দিকে কিছুটা বৃষ্টি হয়েছে। এখন একটা ব্রেক যাচ্ছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হচ্ছে না। ওপরের বাতাসের কারণে সাগর থেকে জলীয়বাষ্প আসতে পারছে না। বৃষ্টি হওয়ার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সাগরে নিম্নচাপ হলে সেটা হয়তো প্রচুর জলীয়বাষ্প নিয়ে স্থলভাগে এসে বৃষ্টি ঝরাবে। সাতদিন হয়তো কিছুটা বৃষ্টি হয়েছে, এখন ১৫ দিন বৃষ্টি নেই। এতে কৃষির অনেক ক্ষতি হয়। গরম বেড়ে যায়। এটা একটা অস্বাভাবিক অবস্থা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবকিছু পরিবর্তন হয়ে গেছে। আমরা মনে হয়, সাগরে একটা নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে বৃষ্টি হওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে।’