বছর ঘুরলেই দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনী মাঠ সরকার ও বিরোধীপক্ষের বক্তব্য-সমালোচনায় সরগরম। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে অনড়। আর আওয়ামী লীগ সাফ জানিয়ে দিয়েছে বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচন হবে। ফলে রাজনীতিতে দেখা দিয়েছে এক ধরনের সংকট। এ অবস্থায় সামনে আসছে সংলাপের কথা। বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা দিচ্ছেন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। কেউ বলছেন সংলাপের বিকল্প নেই, কেউ আবার বলছেন, সংলাপের কথা ভাবছি না। দলটির সাধারণ সম্পাদক বলেই ফেলেছেন, ‘সংলাপের মুলা’ দেখে বিএনপির জিভে পানি এসে গেছে।

আসলেই কি ক্ষমতাসীনরা সংলাপের মুলা ঝুলাচ্ছে? এমন প্রশ্ন ছিল দলটির নেতা ও বিশিষ্টজনদের কাছে। তারা বলছেন, কথাটি হয়তো রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। তবে সংলাপের বিকল্প নেই। গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সব দলকে এক জায়গায় বসতে হবে।

৬ জুন ১৪ দলের এক সমাবেশে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, ‘দেশে গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচনী সমস্যা সমাধানে আলোচনা হতে পারে। প্রয়োজনে জাতিসংঘের প্রতিনিধি আসুক। আমরা বিএনপির সঙ্গে মুখোমুখি বসে আলোচনা করতে চাই। আলোচনায় সমাধান হবে, অন্য কোনো পথে নয়। বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে লাভ নেই। জল ঘোলা করার প্রয়োজন নেই।’

পরদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সংলাপের মাধ্যমে সবকিছু সমাধান হতে পারে। আলোচনার কোনো বিকল্প নেই।’

এই এক বক্তব্যে গুমোট রাজনীতিতে শীতল হাওয়া বয়ে যায়। কিন্তু বিধিবাম! ৭ জুন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে আলোচনার সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। আমাদের দেশে এমন কোনো রাজনৈতিক সংকট হয়নি যে জাতিসংঘের ইন্টারফেয়ার করতে হবে। জাতিসংঘ মধ্যস্থতা করবে এ রকম কোনো সংকট স্বাধীন বাংলাদেশে হয়নি।’

একই দিন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, ‘সংলাপ নিয়ে বক্তব্যটি তার (আমির হোসেন আমু) ব্যক্তিগত। এ বক্তব্য নিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা হয়নি, এমনকি ১৪ দলেও হয়নি।’

এরপর ৮ জুন দলের এক সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ বিষয়ে ফের কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘সংলাপের মুলা দেখে তাদের (বিএনপি) জিহ্বায় পানি আসছে। মনে করছেন, আওয়ামী লীগ তাদের সংলাপে ডাকবে। এই সংলাপের কথা আমরা ভাবছি না।’

তবে বিএনপি এ বিষয়ে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘কোথায় কোন সমাবেশে কে কী বলছে তার জবাব দেওয়া আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা রাজনীতি পরিবর্তন করছি। আমাদের কাছে কেউ লিখিত প্রস্তাব দিলে সেটার জবাব দেওয়ার জন্য ভাববো।’

তবে রাজনৈতিক অঙ্গনের বহুল আলোচিত সংলাপ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের দুই রকম বক্তব্য আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে। অনেকে বলছেন, এটি আসলে তাদের কৌশল। মূলত আওয়ামী লীগ কোনো সংলাপ করতে রাজি নয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও একই কথা বলেন। তার বক্তব্য, আন্দোলন ভিন্ন খাতে নিতে সংলাপের কথা বলছে আওয়ামী লীগ।

তাহলে আসলেই কি সংলাপের ‘মুলা ঝুলাচ্ছে’ আওয়ামী লীগ? প্রশ্ন ছিল দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের কাছে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ অফিসিয়ালি এখনো কোনো সংলাপের আহ্বান জানায়নি। ১৪ দলের এক সমাবেশে সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমু সংবিধানের আওতায় সংলাপের কথা বলেছেন। দলীয় ফোরামে কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত ছাড়া তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন। বিষয়টি বেশ আলোচিত হলেও এটি আওয়ামী লীগের দলীয় সিদ্ধান্ত নয়।’

বিএনপির সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংলাপ নিয়ে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা একেকজন একেক কথা বলছেন। কেউ সংলাপের আহ্বান করছেন, কেউ আবার বলছেন সংলাপের সিদ্ধান্ত হয়নি। তাদের নিজেদের মধ্যে আগে সংলাপ হওয়া দরকার, তারা আসলে কী চায়? মূলত তারা নানা রকম চাপে দিশেহারা। একদিকে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মতো নির্বাচন করতে পারবে না। আবার সুষ্ঠু নির্বাচন দিলে ১০টির বেশি সিটও পাবে না। এ অবস্থায় তারা দিশেহারা হয়ে গেছে। কী করবে বা বলবে বুঝে উঠতে পারছে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের দলের অবস্থান পরিষ্কার হয়েছে। আনুষ্ঠানিক কোনো আমন্ত্রণ বা প্রস্তাবনা পেলে দল পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে। মূলত, আলোচনা তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেমন হবে, কীভাবে হবে এসব? এর বাইরে তো কোনো আলোচনা নেই।’

এ নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও দৈনিক ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংলাপের মুলা দেখানো— কথাটি রাজনৈতিক কৌশল। তবে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই। আসলে তো সংলাপ করতেই হবে। সংলাপ আগেও করেছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও তো সংলাপ করেছে। এবারও একটা গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে সব দলকে একটা জায়গায় বসতে হবে। তার উদ্যোগ যে কেউ নিতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমির হোসেন আমু সাহেব তো ২০১৩ সালের রেফারেন্স টেনেছেন। তখন তো জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় সংলাপ হয়েছে। কিন্তু সেই জায়গায় তো বিএনপি এখন নেই। বিএনপি বর্তমান সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবি করছে। এর বাইরে কোনো বিষয়ে তারা আলোচনা করবে না। সরকারি দলও অনড় অবস্থানে- এই ইস্যুতে তারা কোনো আলোচনা করবে না। যার কারণে একটা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এটি রোধ করতে পারে দুটো জায়গা থেকে। এক. রাজনীতিবিদরা নিজেরা করতে পারেন, অথবা আন্তর্জাতিক কোনো চাপ। আমরা অতীতে দেখেছি, জিমি কার্টার ও তারানকো থেকে শুরু করে বাংলাদেশে এ ধরনের অচলাবস্থা নিরসনে বহু লোক এসেছে। এবার কী হবে, সেটা বলা যাচ্ছে না।’

‘আমরা আগেও দেখেছি, আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া-আব্দুল জলিল বসে দীর্ঘদিন আলোচনা করেছেন। আরও আগে ফয়েজ আহম্মেদের নেতৃত্বে কেএম সোবহান, আতাউস সামাদসহ পাঁচজন বুদ্ধিজীবী একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। সেরকম জায়গা থেকেও একটা উদ্যোগ হতে পারে। এটা স্পষ্ট- সংলাপ ছাড়া তো জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন।’

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রিপরিষদের এক সদস্য জানান, বিএনপির সঙ্গে সংলাপে অনীহা তাদের। রাজনীতিতে বিএনপির বর্তমান যে অবস্থান, তাতে তারা নির্বাচনে আসতে পারবে না। পরে অভিযোগও করতে পারবে না। এতে সুফল পাবে আওয়ামী লীগ।