টুপির রাজধানী হিসেবে পরিচিত নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা। গ্রামীণ নারীদের হাতে সুচ ও রঙিন সুতায় নিপুণ সেলাইয়ে তৈরি হয় বিশেষ ধরনের টুপি। যা প্রায় ১৫ বছর আগে শুরু হয়েছিল। এখন সারা জেলায় তৈরি হচ্ছে এ টুপি। আর এসব টুপি চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। সারা বছরই এসব টুপি তৈরি হলেও রমজান মাস এলে বেড়ে যায় এসব টুপির চাহিদা। এ মাসে প্রায় ১৫ কোটি টাকার টুপি রপ্তানির আশা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের।

মহাদেবপুর উপজেলায় প্রায় ১৫ বছর আগে সাদা কাপড়ের ওপর বিভিন্ন নকশায় সুচ-সুতার নিপুণ সেলাইয়ে টুপির যাত্রা শুরু হয়। বছর বছর চাহিদা বেড়ে এখন জেলার অন্যান্য উপজেলায় তৈরি হচ্ছে এসব টুপি। বছরের দুই ঈদে এই টুপির চাহিদা থাকে বেশি। সারা বছর টুপি সেলাইয়ের কাজ হলেও রমজান এবং ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ততা বেড়ে যায়।

এসব টুপি চলে যায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমান, সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারে। সাদা কাপড় সাইজ মতো কেটে সেলাই ও নকশা করে পাঠানো হয় বিভিন্ন গ্রামের নারী কারিগরদের কাছে। এরপর কয়েক হাত ঘুরে সুচ ও রঙিন সুতা দিয়ে নিখুতভাবে সেলাই করে তৈরি হয় টুপি। প্রকারভেদে এসব টুপি বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।

এক সময় টুপি তৈরির সুতা ঢাকা থেকে নিয়ে এসে কাজ করতেন ব্যবসায়ীরা। তবে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখন মহাবেপুর উপজেলায় গড়ে উঠেছে সুতার দোকান। যা থেকে কর্মসংস্থান হয়েছে এলাকার বেকারদের।

এসব টুপির কারিগর মূলত নারীরা। সাংসারিক কাজ শেষে পাড়ায় পাড়ায় নারীরা একত্রিত হয়ে গল্পে আড্ডায় করেন টুপি সেলাইয়ের কাজ। চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার আরও ১০ উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে এ টুপি তৈরির কাজ। টুপি তৈরির সঙ্গে জেলার প্রায় ৪০ হাজার নারী কারিগর জড়িত। এ কাজ করে বাড়তি আয়ে সংসারে ফিরেছে স্বচ্ছলতা। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন নারীরা।

ব্যবসায়ীরা জানান, জেলায় প্রায় ৭ জন মহাজন (বড় ব্যবসায়ী) আছেন। এ মৌসুমে জেলা থেকে প্রায় ৫০ হাজার পিস টুপি উৎপাদন হয়েছে। যার উৎপাদন খরচ প্রায় ৮ কোটি টাকা। তবে বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এগুলো সবই রপ্তানি করা হবে। তবে সরাসরি নিজেরা রপ্তানি করতে পারলে বাড়তি দামে বিক্রি করে লাভবান হতে পারতেন তারা। ব্যবসার পরিধি বাড়াতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তার

মহাদেবপুর উপজেলার মধুবন গ্রামের টুপির কারিগর মৌসুম বেগম বলেন, গত প্রায় ১০ বছর থেকে টুপি সেলাইয়ের কাজ করছি। আগে দানা সেলাইয়ের কাজ করতাম। মজুরি ছিল ২৫০-৪০০ টাকা। সময় ও পরিশ্রম বেশি হতো সে তুলনায় মজুরি কম ছিল। তবে এখন দানা সেলাইয়ে মজুরি প্রায় ১৫০০ টাকা। এক কাজ সময় বেশি লাগায় করা হয় না। তবে টুপির হাসু (দুই সেলাইয়ের মাঝে মোটা সুতা ঢুকানো) কাজ করা হয়। এ কাজে পরিশ্রম কম হয়। প্রতিটি টুপির মজুরি পাওয়া যায় ১৫ টাকা। মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকার মতো কাজ করা যায়। সংসারের কাজের পাশাপাশি এ কাজ করা হয়। বাড়তি আয়ে সংসারে অনেক সুবিধা হয়েছে।

উদ্যোক্তা ইসরাফিল হোসেন বলেন, দানা, চেইন, ভরাট ও মাছকাটা এই চার ধরনের টুপি তৈরি হয়। প্রকারভেদে এসব টুপি তৈরিতে খরচ পড়ে ২৬০ টাকা ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। মাঠ থেকে তৈরি হওয়ার পর এসব টুপি প্রকারভেদে ৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা লাভে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। এ টুপির সঙ্গে প্রায় ২০০ জন উদ্যোক্তা (ছোট ব্যবসায়ী) জড়িত। আমরা ছোট ব্যবসায়ী, পুঁজি কম। যদি সরকার থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতো আমাদের ব্যবসার পরিধি আরও বাড়ানো যেত।

উপজেলার কুঞ্জবন গ্রামের পাইকারি টুপি ব্যবসায়ী আমিনুল হক বলেন, গত ১৫ বছর থেকে টুপি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এ বছর ৫ কার্টুন টুপি যাবে বিদেশে। প্রতিটি কার্টুনে প্রায় ৫ লাখ টাকার টুপি আছে। বাঙালি কিছু ব্যবসায়ী বিদেশে আছেন, তাদের কাছেই টুপি পাঠানো হয়। তারা দ্বিগুণ দামে টুপি বিক্রি করে লাভবান হন। আমরা যদি সরাসরি টুপি রপ্তানি করতে পারতাম তাহলে লাভবান হতে পারতাম। সেইসঙ্গে টুপির সঙ্গে যারা জড়িত বিশেষ করে ছোট ব্যবসায়ী ও কারিগর তাদের বেশি দাম ও মজুরি দিতে পারতাম।

মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু হাসান বলেন, টুপি তৈরিতে উপজেলাসহ জেলার সুনাম ছড়িয়েছে। এসব টুপি চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এ টুপির সঙ্গে অনেক নারী কারিগর জড়িত। এ কাজ করে তারা বাড়তি আয় করতে পারছেন। টুপির কাজকে এগিয়ে নিতে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতার জন্য ব্যাংকগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা হবে। যেন সহজ শর্তে ঋণ পেয়ে তারা টুপির কাজকে আরও প্রসারিত করতে পারেন। এতে দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি সুনাম বয়ে নিয়ে আসবে বলে মনে করি।