১০ ডিসেম্বর যত ঘনিয়ে আসছে তত উত্তেজনা বাড়ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিএনপির এ বিভাগীয় সমাবেশ ঘিরে নেতাদের মধ্যে চলছে উত্তপ্ত বাক্যবাণ। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা যেভাবে প্রতিদিন ‘খেলা হবে’ ঘোষণা দিচ্ছেন তাতে জনমনে শঙ্কা বাড়ছে আরও। এর আগেই ছাত্রলীগের কাউন্সিল ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সমাবেশ দুই পক্ষকে মুখোমুখি করবে বলে মনে করছেন অনেকে। কী হতে চলেছে তাহলে ১০ ডিসেম্বর? তা নিয়েও রয়েছে নানান গুঞ্জন।

আগামী ১০ ডিসেম্বর বিএনপির পূর্বঘোষিত ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ। এখান থেকেই ঘোষণা করা হবে আগামী দিনের কর্মসূচি। এর আগে ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন ও ৯ ডিসেম্বর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সমাবেশ। প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকবে রাজধানী ঢাকা। এ অবস্থায় প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতারা কথার যে উত্তাপ ছড়াচ্ছেন তাতে শঙ্কিত সাধারণ মানুষ।

ঢাকায় সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হবে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ। দলটির লক্ষ্য কয়েক লাখ নেতাকর্মীর জমায়েত। এর আগে ‘১০ ডিসেম্বরের পর দেশ চলবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের কথায়!’ ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানের এমন বক্তব্যে তোলপাড় শুরু হয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। এর মধ্যেই বিভাগীয় সমাবেশের স্থান নিয়ে বিএনপি ও সরকার মুখোমুখি অবস্থানে। দুই পক্ষই কঠোর অবস্থানে। রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে সরকার চাইছে তাদের ঠিক করে দেওয়া স্থান সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ করুক বিএনপি। তবে নয়াপল্টনে সমাবেশের ব্যাপারে অনড়} দলটি, যা পরিস্থিতি ক্রমে আরও ঘোলাটে করে তুলছে।

আরও পড়ুন >> খেলা হবে, রাজপথসহ পাড়া-মহল্লায়ও প্রস্তুত থাকতে হবে: কাদের

সমাবেশের জন্য অনুমতি চাইলে সাধারণত জনসভার কয়েক ঘণ্টা আগে বিএনপিকে অনুমতি দেওয়া হয়। এবার ১১ দিন আগেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সরকার সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু নয়াপল্টনে সমাবেশ করার বিষয়ে এখনো অনড় বিএনপি। যদি শেষ পর্যন্ত তারা অনড় থাকে তাহলে সরকারের কঠোর বাধার মুখে পড়তে হবে স্বাভাবিকভাবেই।

আরও পড়ুন >>> তরুণদের দুর্বার আন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতন ঘটবে: ফখরুল

১০ ডিসেম্বর নিয়ে যত গুঞ্জন
>> ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশে খালেদা জিয়া যোগ দেবেন।

>>বিএনপি রাজধানী দখল করে সরকারের পতন ঘটাবে।

>> বিএনপির কর্মসূচি সরকার হেফাজতে ইসলামের শাপলা চত্বরের কর্মসূচির মতো দমন করবে।

>> প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের রাজধানীতে উপস্থিতিতে তৃতীয়পক্ষ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

>>পশ্চিমা বিশ্ব আওয়ামী লীগ সরকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বিশ্বস্ত বন্ধু ভারতও আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আগামী ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। এই দিনে আমেরিকা বিভিন্ন দেশ ব্যক্তি-সংস্থার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার তালিকা প্রকাশ করে। এবারের নিষেধাজ্ঞা তালিকায় বাংলাদেশি এমপি-মন্ত্রী, ব্যবসায়ী-আমলাদের তালিকা দীর্ঘ হবে। প্রশাসন পেশাদার আচরণ করবে। ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ প্রতিষ্ঠা পাবে।

>> পশ্চিমা বিশ্ব বিএনপির জন্য কাজ করবে না, তারা মূলত আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে নিজেদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয় নিয়ে দেন-দরবার করার জন্য তারা চাপ দিচ্ছে।

>> দুই রাজনৈতিক দলের সমঝোতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন হবে।

বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর নেতারা যা বলছেন

বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম আজাদ  বলেন, এটা আমাদের ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ কর্মসূচি। আমরা দুই মাস আগে কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। তারপরে ছাত্রলীগ, মহানগর আওয়ামী লীগ তাদের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। সরকার সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে। এর দায়ভার সরকারকে নিতে হবে। সরকারের এসব আচরণ জনগণ ভালোভাবে নিচ্ছে না।

আরও পড়ুন >>> বিএনপির ‘ডেডলাইন ১০ ডিসেম্বর’ ঘিরে প্রস্তুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

১০ ডিসেম্বর সম্পর্কে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গানি বলেন, সরকারের শক্ত অবস্থান পরিস্থিতি ঘোলাটে করেছে। পত্রিকায় দেখলাম প্রধানমন্ত্রী যশোর থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছেন। উনি করতে পারলে বিএনপি কেন পারবে না? তাদের অধিকার নেই? আমার মনে হয় আওয়ামী লীগের আগামী কাউন্সিল ঘিরে কিছু নেতা নিজেকে তুলে ধরার জন্য চেষ্টা করছেন। বিএনপির বিরুদ্ধে গরম গরম বক্তৃতা দিয়ে নিজেকে সোচ্চার দেখিয়ে তাদের ত্যাগ প্রমাণের চেষ্টা করছেন।

তিনি বলেন, ১০ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে এতকিছু তো বলার প্রয়োজন নেই। আর সত্যি সত্যি যদি তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য থাকে তারা অন্য পরিকল্পনা করছে, সেটা তো আপনার বক্তৃতা দিয়ে মোকাবিলা করা যাবে না। সেটা খুঁজে বের করেন। বিএনপি রাজনৈতিক দল, তারা কী করতে পারে? বিএনপি বলছে ১০ তারিখ বিভাগীয় সমাবেশে তারা আন্দোলনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবে। সেটা আমরা দেখি কী হয়, কিন্তু সেটা কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ পাল্টাপাল্টি যেভাবে সমাবেশ করছে তাতে মনে হচ্ছে ডিসেম্বর মাস ঢাকা অচলের মাস।

‘সব পক্ষের কাছে কেন যেন মনে হচ্ছে যে নির্বাচন জানুয়ারি মাসে হচ্ছে। ১০ তারিখ কী হতে পারে? বিএনপি একটি সমাবেশ করবে। শেষ পর্যায়ে তারা সরকারকে হুঁশিয়ারি, পদত্যাগের আল্টিমেটাম দিতে পারে, তারা নিজস্ব যে আন্দোলন গড়ে তুলতে চাচ্ছে তার রোডম্যাপ ঘোষণা করতে পারে।’

আরও পড়ুন >>> নেতাকর্মীদের ১০ দিন আগে ঢাকায় থাকার বার্তা, বাধা দিলে ‘লড়াই’

১০ তারিখ ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এভাবে দুটি দল যদি তাদের নেতাকর্মীদের একে অপরের মুখোমুখি করিয়ে দেয়, সংঘাত বাঁধতেই পারে। সেরকম একটা সংঘাত দেশ ও রাজনীতির জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে বলে মনে করি না। ১০ তারিখ ঘিরে যদি সবাই মোড়ে মোড়ে লাঠিসোঁটা নিয়ে বসে পড়ে তাহলে সবাই হেরে যাবে।

তিনি বলেন, এক বছর ধরে শুনে আসছি বর্তমান সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলোর যে কারণেই হোক ব্যালেন্স নেই। আন্তর্জাতিক বন্ধু যারা রয়েছেন তারা অসন্তুষ্ট। এই অসন্তুষ্টির কারণে বাংলাদেশে পরিবর্তন এলে তারা খুব বেশি নাকচ করবেন না। কারণ আমার শত্রুকে তুমি শত্রু না মনে করলে তুমি আমার মিত্র না।

বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের চেয়ারম্যান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো নয়। স্বাধীনতার ৫০-৫২ বছর পর আমাদের এরকম হওয়া উচিত নয়। প্রত্যেক দিন যে আমরা বলছি- খেলা হবে, খেলা হবে। মানুষ তো তাতে শঙ্কিত হচ্ছে। মানুষের ওপর মানসিক চাপ পড়ছে। একটা দেশ তার জনগণের প্রতি চাপ সৃষ্টি করতে পারে না।

ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এনডিপি চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা  বলেন, একজন সমাবেশ করবে আর একজন বাধা দেবে- আমরা সংবিধান মানি কি না সেটা এখন প্রশ্ন। আমি সংঘাতের আশঙ্কা করছি, সন্তোষজনক কিছু দেখছি না।

গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জুনায়েদ সাকি বলেন, আওয়ামী লীগ বিভিন্নভাবে বাধার মাধ্যমে বিরোধীদলের শান্তিপূর্ণ সমাবেশকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসব উপেক্ষা করে বিএনপির সমাবেশে ব্যাপক জনসমাগম দেখে সরকার ভীত। তারা রাজনৈতিক সমাবেশ ভন্ডুল করার জন্য কৌশল নিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।