দ্রুত বিকাশের ধারাবাহিকতায় অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হয়ে উঠেছিল ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও লজিস্টিকস সাপোর্ট খাত। জন্মদিন, বিয়ে থেকে শুরু করে নানা করপোরেট আয়োজনেও নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠেছিল এ খাত। কিন্তু করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) থাবায় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও লজিস্টিকস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পড়েছে অস্তিত্বের সংকটে। টিকতে না পেরে ব্যবসা ছাড়ছেন সম্ভাবনাময় এ খাতের উদ্যোক্তারা।

বলা হচ্ছে, করোনাকালে অফিস ভাড়া, কর্মীদের বেতন ও আনুষঙ্গিক খরচে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ব্যবসা ছেড়েছেন এ খাতের অন্তত ৩০ শতাংশ উদ্যোক্তা। আর ২০ শতাংশ উদ্যোক্তা ছোট করেছেন ব্যবসায়ের পরিধি। প্রয়োজনীয় সহায়তা বা প্রণোদনা না পেলে এখাতের ঘুরে দাঁড়ানো বেশ কঠিনই হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত এক দশকে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ব্যবসার দ্রুত বিকাশ হয়েছে। মানুষ ঝামেলা এড়াতে বিয়ে, জন্মদিন থেকে শুরু করে ট্রেড শো, করপোরেট বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়ে দেয় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্মগুলোকে। দেশি-বিদেশি কোম্পানি, এনজিও, সরকারি পণ্য ও সেবার ব্র্যান্ডিং, প্রদর্শনী, সেমিনার ইত্যাদি আয়োজনে বড় নির্ভরতা হতে থাকে প্রতিষ্ঠানগুলো। বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে শুধু ঢাকাতেই গড়ে ওঠে এমন প্রায় ৪০০ প্রতিষ্ঠান।

তবে গত বছরের মার্চে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলে সব ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। সংক্রমণ ঠেকাতে ভিডিও কনফারেন্সেই করপোরেট ইভেন্ট ও কনফারেন্স আয়োজন হতে থাকে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষেও অনেক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, তার অধিকাংশই হয়নি মহামারির কারণে। এছাড়া এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে শো-প্রদর্শনীগুলো। বিয়ে, গায়ে হলুদ, জন্মদিনের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানও হচ্ছে সীমিত আকারে, ঘরোয়া পরিবেশে।

এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গড়ে প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকার কাজ হয় ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে। গত এক বছরে ৫০০ কোটি টাকার কাজও হয়নি। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে হয়েছে মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির আয়োজন ঘিরে। এ দুটি উৎসব ঘিরে অনেক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। ইভেমন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাই অনেক আগে থেকে সরঞ্জামাদি যোগাড়ের পাশাপাশি নানান প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু সেসব অনুষ্ঠানের বেশিরভাগই হয়নি।

ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং অন্তর শোবিজের চেয়ারম্যান স্বপন চৌধুরী বলেন, ‘করোনায় আমরা অনেক বেশি সাফারার (ভুক্তভোগী)। বন্ধ থাকলেও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু হলেও রিটার্ন আসে। কিন্তু আমাদের তো ইভেন্ট না করলে টাকা নেই। দীর্ঘদিন ধরেই সব ইভেন্ট বন্ধ। সেক্ষেত্রে আমরাও প্রণোদনার দাবিদার।’

তিনি বলেন, ‘বলা হয়েছে প্রণোদনা সবাই পাবে, কিন্তু আমরা প্রণোদনার কাছেও যেতে পারিনি। আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এই সেক্টর আসলে প্রণোদনার সুযোগটা পাবে না। কারণ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট বা শোবিজে লোন দেয়ার প্রচলনই চালু হয়নি। এটা ব্যাংকও বোঝে না। বলে যে, এটা কী প্রতিষ্ঠান?’

jagonews24

স্বপন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের ট্রেড লাইসেন্স করতে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়। ৫০ হাজার টাকা লাগে ট্রেড লাইসেন্স করতে আবার নবায়ন করতে লাগে ৩৫ হাজার। আমাদের অনেক খরচ, কিন্তু সরকারি সুযোগ পাই কম।’

এখাতে পেশাদারিত্ব গড়ে ওঠেনি উল্লেখ করে স্বপন চৌধুরী বলেন, ‘প্রফেশনালজিম গড়ে ওঠেনি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে। ইভেন্ট করিয়ে অনেকেই টাকা দিতে চান না। করোনাকালে কাজ হারিয়ে অনেকেই এই ব্যবসা ছেড়েছেন। আবার অনেকেই ভালোবেসে এই সেক্টর থেকে সরতে চাচ্ছেন না।’

করোনার প্রকোপ ঠেকাতে সরকার গত বছরের ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। স্থবিরতা নেমে আসে জনজীবন ও অর্থনীতিতে। ৬৬ দিনের লকডাউনের পর ধীরে ধীরে সবকিছু খুলে দেয়া হলেও কাজ পায়নি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। এখন যেসব অনুষ্ঠান করা হচ্ছে, তার প্রায় সবই হচ্ছে ভার্চুয়ালি। এর মধ্যে চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে আঘাত হানা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এই খাতকে ফেলেছে গভীর সংকটে।

ব্লুজ ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র ম্যানেজার মো. আসিফ বলেন, ‘ইভেন্ট না থাকায় ছোট-খাটো অনেক প্রতিষ্ঠান হারিয়ে গেছে। গত বছর করোনার প্রকোপের পর আমরা হাতেগোনা দুই-একটি কাজ পেয়েছি।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘গত বছর মুজিববর্ষে আমাদের অনেক কাজ পাওয়ার কথা ছিল। এ বছর স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি হিসেবে অনেক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। প্রস্তুতি হিসেবে বিদেশ থেকে আমরা অত্যাধুনিক যন্ত্র নিয়ে এসেছি। কিন্তু করোনার কারণে সব থমকে আছে। আমরা মোটা অংকের টাকা বিনিয়োগ করে লোকসান গুনছি।’

গ্রেটেড মার্কেটিং সার্ভিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সারোয়ার মোর্শেদ আজম বলেন, ‘বছরে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার কাজ হয়। তবে গত বছর ৫০০ কোটি টাকার কাজও হয়নি। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। বড় প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও তারা কর্মী ছাঁটাই করে দিয়েছে।’

বিভিন্ন ইভেন্টে লাইট, সাউন্ড সিস্টেমসহ আনুষঙ্গিক জিনিস সরবরাহ করে, এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে ছয় হাজারের বেশি। এসব লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠানও রয়েছে অস্তিত্ব সংকটে। গত বছরের পর চলতি বছরও করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেছে এসব প্রতিষ্ঠান।

ইভেন্ট লজিস্টিকস সাপোর্ট ফোরাম অব বাংলাদেশের সদস্য সচিব এবং সাউন্ড অ্যান্ড ভিশনের কর্ণধার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক ব্যবসায়ী হারিয়ে গেছেন। ঢাকায় অফিস ছেড়ে দিয়ে অনেকে গ্রামে চলে গেছেন। কিছু ব্যবসায়ী একত্রিত হয়ে ঘর ভাড়া করে সেখানে মালপত্র রেখে গ্রামে চলে গেছেন কিংবা অল্পদামে বিক্রি করে দিয়ে ব্যবসা ছেড়েছেন।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ উদ্যোক্তা এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। তারা অন্য চাকরি করছেন, কিংবা গ্রামে গিয়ে কিছু করার চেষ্টা করছেন। আমাদের লজিস্টিকসের সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ জড়িত। করোনার কারণে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেড় থেকে ২০০ লোক কাজ করেন। আমার ছোট প্রতিষ্ঠানেই পার্মানেন্ট কর্মচারী ছিলেন ২০ জন। কন্ট্রাক্টে ২০-২৫ কাজ করতেন। সেখানে এখন আমার মাত্র সাতজন কর্মী আছেন। বেশি লোক রেখে লাভ কী? বেতন দিতে পারবো না, কাজ নেই-আয় নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর শেষের দিকে কিছু অনুষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর টাকা হাতে আসেনি। করোনার দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা দিতে চাচ্ছে না।’

লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান বিজেপ্রোর কর্ণধার শামীম আহমেদ বলেন, ‘করোনার কারণে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ উদ্যোক্তা বিজনেস ডাইভারসিফিকেশন করছেন। অনেকে সাইড বিজনেস বা অন্য কিছু করছেন। প্রায় অর্ধেক ব্যবসায়ী অন্য ব্যবসায়ের চিন্তা করছেন। আমাদের কর্মী বাহিনী ছিল, তারা এটা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে রাইড শেয়ারিং বা প্রোডাক্ট ডেলিভারিতে যুক্ত হয়ে গেছেন। এটা আমাদের অনেক বড় ক্ষতি।’

তিনি আরও বলেন, ‘রমজান মাসে আমাদের ইফতারের কিছু ইভেন্ট থাকে। তবে করোনার কারণে সব কিছু বন্ধ হয়ে আছে। গত বছর কিছু কাজ আমরা পেয়েছিলাম। করোনা পরিস্থিতি ভালো হলে আমরা আবার কাজ পাবো বলে আশা করি।’