এই সেদিন টাঙ্গাইল সদরসহ বেশ কয়েকটি পৌরসভার নির্বাচন হলো। তার আগে হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি ভোট। পৌরসভায় কাউন্সিলর পদ না থাকলে ভোটের যে অবস্থা তাতে কেন্দ্রে লোক পাওয়া যেত না। নির্বাচনে খুন-খারাবি হয়নি সত্য, কিন্তু ভোটে কোনো উৎসাহ ছিল না। টাঙ্গাইল পৌরসভায় আবার মিরনের প্রার্থী হওয়ার কথা ছিল। মিরনের প্রতিই আমার সমর্থন। কিন্তু তার ভাইস্তা সোহেল, সেও এক বিরাট প্রার্থী। চাচা-ভাইস্তার ঠেলাঠেলিতে শেষ পর্যন্ত সিরাজুল হক আলমগীর মনোনয়ন পায়। ১৯৬৭-’৬৮ এর দিকে সিরাজুল হক আলমগীর ছাত্রলীগে আসে। ওকে ছাত্রলীগে এনেছিল মূলত স্বগোত্রীয়দের হাতে নির্মমভাবে নিহত ফারুক আহমেদের ঘনিষ্ঠ শিষ্য দিঘুলিয়ার মতি। মতি অত্যন্ত কর্মঠ কর্মী। ছোটখাটো মানুষ হলেও অত ভালো কর্মী সচরাচর পাওয়া যায় না। মতি-স্মৃতি ছিল মানিকজোড়। কিন্তু স্মৃতির চাইতে মতির প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক বেশি। কথার ফানুস ওড়াত না। কথার চেয়ে কাজ বেশি করত। সেই মতি একদিন আলমগীরকে ছাত্রলীগের অফিসে এনে হাজির। আলমগীর অনেক জায়গায়ই বলে, ‘আমাকে বঙ্গবীর রাজনীতিতে এনেছিলেন।’ আসলে আমি আনিনি, আমার সহকর্মীরা এনেছিল। আমার সঙ্গেই কাজ করেছে। মতি-স্মৃতি মুক্তিযুদ্ধে ছিল। আগস্টের পরে স্মৃতি ছিটকে পড়ে আত্মীয়স্বজনের চাপে হানাদারদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তার পরেরটুকু বলতে চাই না। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সিরাজুল হক আলমগীর দোয়া চাইতে এসেছিল। বলেছিলাম, আমি বদদোয়া করতে শিখিনি। সবার প্রতি আমার দোয়া আছে। বিএনপি প্রার্থী মওলানা ভাসানীর নাতি শামসুল হকের ছেলে মাহমুদুল হক সানু এসেছিল। বলেছিলাম, ভোট হলে তুমি জিতবে। আলমগীরকেও বলেছিলাম, প্রকৃত ভোট হলে আওয়ামী লীগের জেতার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু তুমি জিতবে। টাঙ্গাইলে নৌকার প্রার্থী সিরাজুল হক আলমগীর যথার্থই জিতেছে এবং এটা খুবই সত্য, টাঙ্গাইলের সবকটা পৌরসভা নির্বাচনে যে কজন প্রার্থী জিতেছে তারা অনেকে নিজেরাই ভোট দিয়েছে। ভোটে ছোটখাটো ত্রুটি থাকবে। স্বাভাবিক ত্রুটি নিয়ে কোনো কথা নেই। কথা অস্বাভাবিক সবকিছু নিয়ে। কয়েকদিন আগে ধনবাড়ী পৌরসভার নির্বাচন হয়েছে। সেখানে আমার প্রিয় মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের প্রার্থী হেরেছে, জিতেছে বিদ্রোহী প্রার্থী। আওয়ামী লীগ মনোনীত মন্ত্রীর প্রার্থী বেশ কর্মঠ, ভালো মানুষ। যে জিতেছে সেও ভালো মানুষ। সেখানে ভোট হয়নি এটা বলা যাবে না। ভোটাররা ভোট দিয়েছে, ভোটেই নির্বাচিত হয়েছে। তারপর টাঙ্গাইলে একসঙ্গে পাঁচটি পৌরসভার নির্বাচনে পাঁচটিতেই আওয়ামী লীগ জয়ী হয়েছে। অবাধ নির্বাচন হলে পাঁচটিতেই আওয়ামী লীগ হয়তো হারত। নির্বাচন সম্পর্কে মানুষের মারাত্মক অনীহা। তবু কিছু মানুষ ভোট দিয়েছে। তাতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা সবাই জিতেছে। বিশেষ করে টাঙ্গাইলে বিএনপির প্রার্থী গা করেনি। নির্বাচনে যে চেষ্টা করা দরকার সে চেষ্টা তারা করেনি। শুধু টাঙ্গাইলে কেন কোনোখানেই তেমনটা করেনি। সখীপুরে আবু হানিফ আজাদ নির্বাচিত হয়েছে। আবু হানিফ আজাদ প্রথম কাতারের মুক্তিযোদ্ধা। কাদেরিয়া বাহিনীতে যখন ৪০ জন ছিল তখনো আবু হানিফ আজাদ। মাঝে ইতালিতে কয়েক বছর কাটিয়েছে। নির্বাচনের আগে করোনায় আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে ছিল। আমার অনেক কর্মী শিষ্য রাজনৈতিক কারণে অনেক সময় ভয়ে মুখ দেখায় না। কিন্তু আবু হানিফ আজাদ তাদের মধ্যে পড়ে না। তার মান্য-গণ্য-ভদ্রতা-শালীনতা আগের মতই আছে। বিএনপি থেকে দাঁড়িয়ে ছিল নাসির। নাসির নির্বাচন করতে চায়নি। কিন্তু বিখ্যাত নেতা আহমদ আজম তাকে দাঁড় করিয়ে ছিল। দোয়া চাইতে এসেছিল। বলেছিলাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী ছানোয়ার এসেছিল। সে দোয়া চেয়েছে। তার ধারণা মানুষ ভোট দিতে পারলে সে জিতবে। কিন্তু নাসিরের ধারণা ভোট হলে সে জিতবে। ছানোয়ার হবে ৩ নম্বর। সঙ্গে এও বলেছিল, ছানোয়ারের এখন আর আগের মতো জনপ্রিয়তা নেই। হতেও পারে। কারণ ছানোয়ার কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম। সরাসরি ভোটে নির্বাচিত সখীপুর পৌরসভার প্রথম মেয়র, পাঁচ বছরের জায়গায় একটানা ১০ বছর। তারপর ছানোয়ারের রং বদলের শেষ নেই। সে বিএনপি করেছে, আবার সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগে যোগ দেবে। এ রকম নানা রঙে নিজেকে রাঙিয়েছে। ছানোয়ার বলেছিল, বিএনপি ৫০০-এর বেশি ভোট পাবে না। সত্যিই কিন্তু তাই হয়েছে। বিএনপি ৫১২ ভোট পেয়েছে। হানিফ পেয়েছে ৭ হাজার ৮৩৩ ভোট, নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী ছানোয়ার পেয়েছে ৭ হাজার ৫৪৪ ভোট। তাতে তো বলতেই হয় সখীপুরে ভোটাভুটি হয়েছে। কিন্তু অনেকে বলছে, বিকাল ৪টার পর নৌকা ছাড়া অন্য মার্কায় কেউ ভোট দিতে পারেনি। নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হোক। নির্বাচনে কেন লুটতরাজ হবে? লুটতরাজ করে চোর-ডাকাত। রাজনীতিকরা দেশ চালাবে, তারা চোর-ডাকাত হবে কেন?

নির্বাচনের দিন টাঙ্গাইলে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটেছে। মনে হয় রাত ৯টা-সাড়ে ৯টা হবে চারদিক কেঁপে উঠেছিল, ‘এমপির গালে গালে জুতা মারো তালে তালে’। অনেকক্ষণ বুঝতে পারছিলাম না কী বলছে বিক্ষোভকারীরা। পরে বুঝলাম এমপির গালে গালে জুতা মারো তালে তালে। টাঙ্গাইলে এমপি নয়জন। কার গালের কথা বলছে ঠাওর করতে পারিনি। পরদিন সকালে খোঁজখবর নিয়ে জানলাম এক এমপির কথা। যার বাবা ছিলেন টাঙ্গাইলের শ্রেষ্ঠ রাজাকার বল্লার রাজ্জাক আনসারীর তামাকের দোকানের কয়াল। স্বাধীনতার পর টাকান্ডপয়সা হওয়ায় আওয়ামী লীগ বনে যান। তিনি পৌরসভা মেয়রের নির্বাচন করেছিলেন। তখন সিল মেরে ভোট নেওয়া যেত না। তাই জিততে পারেনি। তার ছেলে কোনো দিন এমপি হবে আমরা যারা রাজনীতি করতাম তারা কেউ ভাবিনি। সে এখন টাঙ্গাইলের একজন এমপি। যেখানে হুজুর মওলানা ভাসানী, জননেতা শামসুল হক, জননেতা আবদুল মান্নান নির্বাচিত হতেন। তার কেন্দ্রে তার মনোনীত কাউন্সিলর আর নৌকার প্রার্থী ছাড়া কাউকে ভোট দিতে দেয়নি। এজেন্টসহ সবাইকে বের করে দিয়েছে। নিজেরা সারা দিন ভোট দিয়েছে। তারই প্রতিবাদে রাতে সেই অভাবনীয় মিছিল। টাঙ্গাইল শহরে গত এক যুগে দিনেও অত বড় বিক্ষোভ মিছিল হয়নি যেটা সব পরাজিত প্রার্থী করেছে ‘এমপির ফলাফল মানি না, মানি না’। যা হোক এখন কিছু বললে কেউ শুনবে না। সবাইকে ঘোড়া রোগে পেয়েছে। এ রোগ সারার আগে কেউ কোনো কথা শুনবে না। তাই আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছি। ভোট চুরি করে গদিতে বসে কী শান্তি কোনো দিন বুঝতে পারিনি, এখনো বুঝি না। যে কদিন থাকব বুঝতেও চাই না।

গতকাল সারা দিনও মিছিল, মিটিং, সংবাদ সম্মেলন হয়েছে ভোট চুরি নিয়ে। বিশেষ করে দিঘুলিয়া কেন্দ্রে নৌকার মেয়র ও এমপির প্রার্থী আনোয়ার সাদাৎ তানাকা ছাড়া কাউকে ভোট দিতে দেয়নি। একটা কেন্দ্রের সব ভোট যদি নির্দিষ্ট প্রার্থী পায় তাহলে সেটাকে নির্বাচন বলে? আরও অনেক প্রার্থী সম্পর্কে প্রতিবাদ এসেছে, প্রতিবাদ চলছে। যা হোক বিরক্ত হয়ে আওয়ামী লীগের অনেক লোকও রাস্তায় নেমেছে এটা শুভলক্ষণ। মানুষ বুক ভরে শ্বাস নিতে না পারলে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সমাজব্যবস্থাও অসুস্থ নির্বল হয় যদি কেউ কোনো উচ্চবাচ্য করতে না পরে। চট্টগ্রামে একটা সিটি করপোরেশনে ভোট হলো। সেখানে যদিও খুন-খারাবি হয়েছে, ভোট যে খুব ভালো হয়েছে তা বলা যায় না। করোনার এ দুর্মূল্যের বাজারে সরকার অথবা সরকারি দল অতটা জনপ্রিয় হয়েছে তা বলি কী করে। বিরোধী প্রার্থী ৫০-৬০ হাজার, সরকারি প্রার্থী ৪-৫ লাখ এমন ভোটের ব্যবধান আশা করা যায়? কখনো না। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হলে সেটা সরকারেরই লাভ। এত পৌরসভা-ইউনিয়ন পরিষদ দখল করলে একসময় বিরক্ত হয়ে মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে পড়বে তখন কী হবে? এসব নিচের স্তরের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে মানুষের সরাসরি যোগাযোগ। সেখানে অযোগ্য অদক্ষদের কর্মকান্ডে মূল নেতা ও সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ আরও ক্ষুব্ধ হবে। নির্বাচন কমিশনের এই যে মারাত্মক ব্যর্থতা সবই কি সরকারের জন্য, সবই কি সরকারের চাপে? তা কিন্তু নয়। সত্যিকারেই নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ। বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মাথা পচা। তা না হলে কেন বলতে যাবে, ‘নির্বাচন সম্পর্কে আমেরিকার আমাদের কাছে শেখা উচিত। আমরা ৫ মিনিটে ফল দিতে পারি। আমেরিকা সাত দিনেও পারে না।’ কই, চট্টগ্রামের ফল তো ৫ মিনিটে হলো না। সারারাত লেগেছে। তাহলে এমন অদ্ভুত কথা বলে লাভ কী? বরং লোক হাসানো। নির্বাচন কমিশনের কথায় লোক হাসে। ক্ষতি কিন্তু হয় সরকারের। জনপ্রিয়তা নষ্ট হয় শেখ হাসিনার। কেউ বুঝতে চায় না এই যা সান্ত্বনা। চট্টগ্রাম নির্বাচনে দেড়-দুই শ কেন্দ্রে ২০-২৫ ভোট পড়েছে। কিছু কেন্দ্রে একটা ভোটও পড়েনি। এসব বিবেচনায় আনতে হবে না? নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে হলে মানুষের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। সে আগ্রহই যে কেমন যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। রোগী মরে গেলে ডাক্তার ডেকে লাভ নেই। গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে কান্নাকাটি করে লাভ হবে না। তাই সময় থাকতে একটু ভেবে দেখতে বলছি। টাঙ্গাইলের নির্বাচন ভালো হয়নি, মধুপুরে তো একেবারেই নয়। তবে টাঙ্গাইলে সিরাজুল হক আলমগীর যথার্থ জিতেছে। কারণ এখানে বিএনপি জিতবার জন্য নির্বাচন করেনি, তালিকায় নাম রাখার জন্য করেছে। তবে সখীপুরে সারা দিন ভালো ভোট হয়েছে। কিন্তু ৪টার পর সীমানার মধ্যে যারা ছিল তাদের দিয়ে উল্টাপাল্টা করেছে বলে শোনা যায়। তবে আমি খুশি বহুদিন পরে টাঙ্গাইলে যথার্থ শক্তিশালী বিক্ষোভ দেখলাম। ভালো লাগল। এই তীব্র শীতে অত রাতে অত মানুষের বিক্ষোভ ব্যাপারটা ফেলনা নয়। ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

গত পর্বে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে লিখেছিলাম। অনেকে সাধুবাদ দিয়েছে, কেউ কেউ আবার বাঁকা চোখে দেখার চেষ্টা করেছে। যা লিখেছি হৃদয় থেকে লিখেছি, আত্মিক তাগিদে লিখেছি। আমি জানি, আওয়ামী লীগেও কিছু লোক ওবায়দুল কাদেরকে ক্ষমতাহীন করতে চায়। তারা যদি তাদের যোগ্যতায় করতে পারত কিছু বলার ছিল না। যোগ্যতার চাইতে মোসাহেবিই বেশি। আমি সে নিয়ে ভাবি না, আমার ভাবার কথাও না। আমি ভাবী ওবায়দুল কাদেরের একসময়ের ত্যাগ-তিতিক্ষা নিয়ে। কারও ত্যাগ-তিতিক্ষা কেউ ঝেড়ে ফেলতে চাইলে আমি কখনো তার সঙ্গে একমত হইনি। পরম শত্রুরও ভালোকে ভালো বলতে আমি শিখেছি। আল্লাহ আমাকে সে শিক্ষা দিয়েছেন। প্রিয় ওবায়দুল কাদের কিছুদিন আগে দারুণ অসুস্থ হয়েছিলেন। অনেকে তো তার জন্য ‘ইন্না লিল্লাহ’ পড়েছিলেন। আমি জানি কারও মৃত্যু সংবাদ প্রচার হলে তার আয়ু বাড়ে। যেমন বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদের অবশ্যই বাড়বে। বর্তমান জমানায় অনেকেই ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে সমালোচনা করে। সমালোচনা কোনো দোষের নয়। কারও ওপর মানুষের বিরক্ত হওয়াও খারাপ কিছু নয়। তবে তার মাপের ত্যাগী নেতা আওয়ামী লীগে খুব একটা বেশি নেই। যারা বড়, যারা মহান, প্রকৃতই ত্যাগী তাদের তো সাত সাগর দূরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। জাতীয় নেতাদের অবহেলা করা শুধু নেতাদের ক্ষতি নয়, দেশ ও জাতির ক্ষতি। সেটা যা হওয়ার হয়ে গেছে। প্রিয় ওবায়দুল কাদের সুস্থ থাকুন, সম্মানে থাকুন এটাই কাম্য।-বাংলাদেশ প্রতিদিন।