ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Saturday, 08 March 2014 04:57

যে আবিষ্কারকদের কেউ মনে রাখেনি

Rate this item
(0 votes)

রেডিও আবিষ্কারের কথা উঠলেই একটা কথা বাঙালি মাত্রই বলেন, 'আবিষ্কার করলেন জগদীশ চন্দ্র বসু, কৃতিত্ব পেলেন গুগলিয়েলমো মার্কনি!'আসলে এ রকম অনেক আবিষ্কারই আছে, যেগুলোর আবিষ্কারক হিসেবে বিশ্বজোড়া যারা খ্যাতিমান, কৃতিত্বটা কিন্তু তাদের নয়, অন্তত তাদের একার নয়।অথচ যে কারণেই হোক, পৃথিবীজুড়ে এক নামে সবাই চেনে তাদেরকে- অথচ সবচেয়ে বেশি বাহবা পাওয়ার কথা ছিল যাদের, তারা রয়ে গেছেন বিস্মৃতির অন্তরালে। দু-চারজন ছাড়া এখন আর কেউ তাদের নামও জানে না!চো ইয়ুন উই-এর কথা ধরুন। মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কারক হিসেবে আমরা সবাই জোহান্স গুটেনবার্গকে চিনলেও গুটেনবার্গ মুদ্রণযন্ত্র উদ্ভাবন করার দুইশ' বছর আগেই একটি মুদ্রণযন্ত্র তৈরি করেছিলেন চো ইয়ুন উই এবং তার তৈরি সেই যন্ত্রের সাহায্যে কোরিয়ানরা বেশ কয়েকটি বইও মুদ্রণ করেছিল।কিন্তু ইতিহাস চো ইয়ুন উইকে মনে না রেখে কেন মনে

রাখল গুটেনবার্গকে? কারণ চো যে অক্ষরগুলো তৈরি করেছিলেন সেগুলো ছিল চায়নিজ বর্ণমালার এবং সেগুলোর সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার।১৪৪০ সালে চীনা ভাষায় হাঙ্গুল বর্ণমালার সূত্রপাত ঘটার আগ পর্যন্ত মুদ্রণযন্ত্রে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় এমন কোনো লিখন পদ্ধতি চীনাদের ছিল না। ফলে নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে তৈরি করার কারণেই চো ইয়ুন উইয়ের মুদ্রণযন্ত্র চীনা ভাষার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি, জনপ্রিয়ও হয়নি।বলা যায়, এ কারণেই মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের কৃতিত্বটা পুরোপুরিই গেছে জোহান্স গুটেনবার্গের পকেটে।এবার আসুন কম্পিউটার প্রোগ্রামের কথায়। কেউ যদি বলেন পৃথিবীর প্রথম প্রোগ্রামার কে ছিলেন, তাহলে ইতিহাসের পাতায় বড়জোর সত্তর বা আশি বছর পেছনে যাব আমরা।এমনকি কেউ কেউ হয়তো খোঁজাখুঁজিটা শুরু করবে বিল গেটস বা স্টিভ জবসের সময় থেকে। অথচ অনেকেই জানেন না, পৃথিবীর প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রাম লেখা হয়েছিল আজ থেকে ১৭০ বছর আগে, ১৮৪৩ সালে! লিখেছিলেন কবি লর্ড বায়রনের মেয়ে অ্যাডা লাভলেস।তার আগের বছর অ্যাডার বন্ধু এবং কম্পিউটারের জনক চার্লস ব্যাবেজ তার ডিজাইন করা কম্পিউটার 'অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন'-এর ওপর একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই বক্তৃতার ওপর ভিত্তি করে অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনে ব্যবহারের জন্য নিজস্ব কিছু অ্যালগোরিদম তৈরি করেন অ্যাডা, যার মধ্যে একটি ছিল বার্নোলি নম্বর গণনা করার একটি অ্যালগোরিদম।কম্পিউটারের ঐতিহাসিকরা অ্যাডার তৈরি ওই অ্যালগোরিদমটাকেই বিশ্বের প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।অ্যাডা লাভলেস তবু মৃত্যুর বহু বছর পর হলেও সবার স্বীকৃতি পেয়েছেন, কিন্তু ক্লিমেন্ট অ্যাডারের ভাগ্যে জোটেনি তাও। বিমান বা উড়োজাহাজের উদ্ভাবক হিসেবে উইলবার ও অরভিল রাইট-এর কথাই জানি আমরা।কিন্তু তাদেরও তিন বছর আগে ক্লিমেন্ট অ্যাডার নামে এক ফরাসি 'ইওল' নামে একটি বিমানে সফলভাবে আকাশে উড্ডয়ন করেন। ১৮৯০ সালের ৯ অক্টোবর নিজের তৈরি বিমানে তিনি প্রায় ১৬৫ ফুট পথ ভ্রমণ করেন।তবে সমস্যা ছিল দুটি- তার এই ঘটনার সাক্ষী ছিল মাত্র একজন এবং বিমানটি মাটি থেকে মাত্র আট ইঞ্চি ওপরে উঠেছিল। এ ঘটনার কয়েক বছর পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সামনে একই ঘটনা ঘটাতে গিয়ে বাতাসের তীব্র তোড়ে বিমানটি দুর্ঘটনার মুখে পড়ে এবং বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা অ্যাডারকে গালিগালাজ করতে করতে চলে যান।কে জানে, ক্লিমেন্ট অ্যাডারের প্রথম বিমানযাত্রার সময় কোনো আলোকচিত্রী উপস্থিত থাকলে বিমান আবিষ্কারের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো!উদ্ভাবনের ইতিহাসে মার্কিন উদ্ভাবক টমাস আলভা এডিসন এক চিরস্মরণীয় নাম। বৈদ্যুতিক বাতি, ফোনোগ্রাফসহ অনেক আবিষ্কারের সঙ্গেই তার নাম জড়িত। একইভাবে সিনেমা বা চলচ্চিত্রের আবিষ্কারক হিসেবেও এডিসনের নামই বেশি উচ্চারিত হয়।তবে সত্য কথা হলো, চলচ্চিত্রের একক কোনো আবিষ্কারক নেই। আর একক কোনো আবিষ্কারকের কথা যদি বলতেই হয়, তাহলে এডিসন নয়, এ কৃতিত্বের সবচেয়ে বড় ভাগিদার হেনরি হায়েল নামে এক মার্কিনি।১৮৭০ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়া শহরের একাডেমী অব মিউজিকে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন হেনরি হায়েল। সেখানে ১৬০০ দর্শকের সামনে একটি পুরুষ ও একটি নারীর যৌথ নৃত্যের কয়েক সেকেন্ডের একটি চলমান চিত্র প্রদর্শন করেন তিনি। দৃশ্যটা মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলেও সেটি উপস্থিত দর্শকদের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। যে যন্ত্রের মাধ্যমে এ কাজটি করেন সেটিকে 'ফ্যাজমাট্রোপ' নাম দেন হায়েল। একবারই মাত্র যন্ত্রটির প্রদর্শনী করেন তিনি, তারপর বেমালুম ভুলে যান এটির কথা। মেতে ওঠেন অন্যসব আবিষ্কার নিয়ে।আর এ কারণেই চলচ্চিত্রের ইতিহাস হেনরি হায়েলকে সেভাবে মনে রাখেনি, যেভাবে রেখেছে টমাস আলভা এডিসনকে।

 

 

 

Last modified on Saturday, 08 March 2014 05:03