ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

সালাউদ্দিন এবং অন্যরা

Rate this item
(0 votes)

ধরা যাক কাজী সালাউদ্দিন ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি নন। তিনি সাধারণ সম্পাদক কিংবা সহ-সভাপতি। সভাপতি জাতীয় সংসদের .... আসনের সাংসদ এবং .... মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ত। দেশের ফুটবল মাঠে দর্শক হয় না দেখে সালাউদ্দিনের মন খুব খারাপ। তার খেলোয়াড়ী জীবনে দেখেছেন আবাহনীর ম্যাচ মানে গ্যালারিভর্তি মানুষের উল্লাস, শুরুর বাঁশির আগে তার জুতার ফিতা বাঁধার একটা অভ্যাস ছিল, সেটা দেখেও দর্শকরা লাফাত। আর এখন!

ভেবে ভেবে ফুটবল জমানোর জন্য তার মাথায় একটা চিন্তা এল। এত দারুণ পরিকল্পনা যে তিনি পারলে লাফিয়ে ওঠেন। সুপার কাপ নামের বিশাল প্রাইজমানির একটা টুর্নামেন্ট হবে, খেলোয়াড়দের জন্য থাকবে আকর্ষণীয় সব পুরষ্কার, দর্শকদের জন্যও লোভনীয় কিছু থাকবে। তিনি পরিকল্পনাটা প্রস্তুত করেই ছুটলেন ফেডারেশন সভাপতির কাছে। কিন্তু সভাপতিকে পাওয়া যায় না। তার আরও অনেক কাজ আছে। তার এলাকায় একটা টেন্ডার ছিনতাই নিয়ে খুব ঝামেলা হচ্ছে, জানালেন আগামী সপ্তাহের আগে ফুটবল নিয়ে কথা বলার সময়ই তার নেই।

পরের সপ্তাহে পরিকল্পনাটা তিনি শুনলেন। শুনে বিস্মিত, ফুটবল টুর্নামেন্টে এক কোটি টাকা প্রাইজ! এই টাকায় কত সেতু-কালভার্ট করা যায়! টাকা ছাড় করা যাচ্ছে না বলে তার এলাকায়ই একটা সেতু হচ্ছে না।
তিনি শুকনো মুখে বললেন, এত টাকা আপনি নষ্ট করবেন!
নষ্ট মানে! দর্শক তো মাঠে ফেরাতে হবে।

তা হবে। কিন্তু এত টাকার শ্রাদ্ধ করে!

সালাউদ্দিন অপ্রস্তুত হয়ে বলেন, কিন্তু এমন কোনো বড় পরিকল্পনা ছাড়া আর কোনো উপায় তো নেই।

সভাপতি একটু ভেবে বলেন, আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি পরিকল্পনাটা রেখে যান। আমি একটু ভাবি।

সালাউদ্দিন তার পরিকল্পনাটা রেখে আসেন। আর অপেক্ষা করেন। ফেডারেশন সভাপতি সপ্তাহ খানেক পরে একদিন এলেন, বাফুফে কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিং-এ, নিশ্চয়ই এই বিষয়ে একটা সিদ্ধান্ত জানাবেন তিনি, কিন্তু আশ্চর্য সভাপতি এই প্রসঙ্গেই আসেন না। সালাউদ্দিন নিজে থেকেই বললেন, আপনি কি আমার সুপার কাপের পরিকল্পনাটা দেখেছিলেন!
কোনটা যেন?

ঐ যে একটা জমজমাট টুর্নামেন্ট হবে। ফুটবল আবার জমজমাট হবে।

ও। ঐ কোটি টাকার ব্যাপারটা।

পুরো দেখিনি। ভাবছি। আরও ভাবতে হবে। বুঝতেই তো পারছেন দরিদ্র দেশ, এখানে ফুটবলের পেছনে এত টাকা ব্যয়। তাছাড়া ফুটবলের এখন ফিল্ডও ভালো না। দেখি কী করা যায়।

সালাউদ্দিন আরও অপেক্ষা করেন। বছর শেষ হয়। তার অপেক্ষা শেষ হয় না। এর মধ্যে মাথায় আরও আরও সব পরিকল্পনা আসে। কিন্তু এবার আর প্রস্তাব তৈরিতেই তার মন সায় দেয় না। সভাপতির কাছে যেতে হবে। তার নির্বাচনী এলাকা থেকে আসা যুবনেতা-ছাত্র নেতাদের সঙ্গে তাকে ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করতে হবে। ডাক কখন আসবে সেই অপেক্ষা।

অপেক্ষা আর অবহেলায় তার উৎসাহের সমাপ্তি ঘটে। একসময় তিনিও ঝাঁকের কৈ হয়ে যান। যারা নতুন চিন্তার বদলে পুরনো কথা বলেই কেমন দিব্যি চালাচ্ছে। 'ফুটবল মানুষের প্রাণের খেলা। একে মানুষের মন থেকে মুছে দেয়া যাবে না।' 'অতীতের কমিটিগুলো কিছুই করেনি। আমরা কিছুদিনের মধ্যেই ঝাঁপিয়ে পড়ব।''

নামটা সালাউদ্দিন না হলে গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু সালাউদ্দিন যেহেতু কাজেই এখানেই থেমে থাকা যাচ্ছে না। কারণ এরকম একটা সমস্যায় পড়ে বাস্তবের সালাউদ্দিন ফুটবল ফেডারেশন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে ঘোষণা করেন, ''সভাপতি না হলে ফুটবলের জন্য কিছু করা সম্ভব নয়। কাজেই সভাপতি পদের জন্য নির্বাচন করব।'' তা তিনি নির্বাচন করলেন। আশ্চর্য ব্যাপার সেই নির্বাচনে কোথায় সাবেক ফুটবলাররা তার পক্ষে ঐকবদ্ধ হয়ে নামবেন, তার জায়গায় দেখা গেল তাদের সিংহভাগ বিরোধী পক্ষে। এবং তারা একজনকে সালাউদ্দিনের বিপক্ষে সভাপতি হিসেবে দাঁড় করালেন। তার মূল যোগ্যতা হলো তিনি কোনো একটা সাফ গেমসের 'সিরিমনিস কমিটির (এমন কমিটি যে আছে এটাই সম্ভবত বাংলাদেশের বেশিরভাগ লোক জানে না)' প্রধান ছিলেন। রাজনৈতিক কিছু যোগ-বিয়োগ, আরোপিত কিছু যোগ্যতার প্রদর্শনী চলল। কিন্তু সাধারণ কাউন্সিলররা তাতে বিভ্রান্ত হননি। সেই কাউন্সিলররা, যাদেরকে সাধারণ হিসেবে আমরা স্বার্থান্বেষী বলে জানি, যারা টাকা বা সুবিধার বিনিময়ে ভোট বিক্রি করে বলে অভিযোগ। অথচ তারাই তৈরি করে দিল বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সেরা কমিটি। সালাউদ্দিনের সাফল্যের সুবাদে তাদেরকে আরেকবার অভিনন্দন জানানো যাক। এবং একইসঙ্গে সালাউদ্দিন-বিরোধীদের একটু নিন্দাও করা যাক। দল-মতের উর্ধ্বে উঠে সালাউদ্দিনকে জেতানো উচিত এটা তো আর সবার চেয়ে তার চিরচেনা ফুটবলারদের সবচেয়ে বেশি বোঝা উচিত ছিল। অথচ কিনা তারাই বিরোধী পক্ষে!

ফুটবল কেন হারিয়ে যাচ্ছে এই বিষয় নিয়ে গভীর অনুসন্ধানী রিপোর্টের জন্য আদ্দিষ্ট হয়েছিলাম একবার। এর-ওর সঙ্গে কথা বললাম। এবং শেষে গেলাম ফেডারেশনের মনোনীত সভাপতির কাছে। গিয়ে দেখলাম সবচেয়ে হাস্যকর কথা তিনিই বলছেন। তার বিশ্বাস, 'গঙ্গা-পদ্মা' কাপ নামের একটা টুর্নামেন্ট আয়োজন করলেই নাকি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তা সেই গঙ্গার জায়গায় গঙ্গা রয়ে গেছে, পদ্মার জায়গায় পদ্মা, কিন্তু তিনি জায়গা হারিয়েছেন। তার আগে আরও হারিয়ে দিয়ে গেছেন ফুটবলকে।

ক্রিকেটের এক মনোনীত সভাপতি একবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ব্যাংক লিগ নিয়ে। কারণ ব্যাংক লিগ হলে নাকি আর টাকা-পয়সার অভাব থাকবে না কোনো! সেটা ২০০৪ সালের ঘটনা, তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো সমস্যায় নেই, তা হলে টাকার দরকারটা কী! প্রশ্নের পর প্রশ্নে বোঝা গেল তিনি পাকিস্তানে 'ব্যাংক লিগ' হয় বলে শুনেছেন, কাজেই এটার আয়োজন করতে হবে। ভদ্রলোকের ছিল অগাধ পাকিস্তানপ্রীতি। বিশ্বাস করতেন শহীদ আফ্রিদী বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার। লারা-টেন্ডুলকারের যুগেও সাঈদ আনোয়ার বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান। আরও অদ্ভুত সব পাকিস্তানমুখী ধারণা!

এত ভূমিকা আর ভনিতার একটা কারণ অবশ্যই সালাউদ্দিন। একমাত্র কারণ কিন্তু নয়। সালাউদ্দিন সূত্রে আমরা নিশ্চিত হলাম যে কোনো ফেডারেশন বা বোর্ডে দরকার এমন একজন প্রধান যার কাছে সেই খেলাটার উন্নতিই হবে মুখ্য বিষয়। সেরকম লোক আসার উপায়টা কী! অবশ্যই নির্বাচন। ফুটবলে ফিফার চাপে বাধ্য হয়ে সালাউদ্দিনকে পাওয়্ াগেছে, এখন অন্য ফেডারেশনে প্রাণসঞ্চারী 'সালাউদ্দিনদের' আনতে হলে সভাপতি পদেও নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচনে অযোগ্য লোকও চলে আসতে পারে, এটা যেমন ইতিহাসের কথা তেমনি এটাও ইতিহাস যে শেষপর্যন্ত সফল এবং দূরদর্শী নেতারাও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই সৃষ্টি। নির্বাচন না হলে সালাউদ্দিন কোনোদিনই সভাপতি হতেন না, যেমন নির্বাচন না হলে ক্রিকেটে মাহবুব আনাম-গাজী আশরাফ লিপু কিংবা অন্য কোনো যোগ্য সংগঠকের এই সুযোগ নেই। সম্পাদক-উপ সম্পাদক থেকে তারা নানান পরিকল্পনা করবেন হয়ত, কিন্তু সেগুলো হারাবে ফাইলের ভীড়ে, সময়ের ফেরে, সভাপতির কর্মব্যস্ততায়।

সরকারের মন্ত্রী বা সাংসদ বা অন্য কোনো পদাধিকারীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই, তারা যোগ্যতার জোরেই এসব পদে আসীন হন। কিন্তু তাদের কাছে ফেডারেশনটা থাকে দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ বিষয়। একজন সাংসদের প্রধান কাজ কাগজে-কলমে আইন প্রণয়ন করা, বাস্তবে নিজের এলাকার ভোটারদের খুশি রাখা। ফেডারেশনকে দেয়ার সময় তার কই! তাছাড়া তারা এই জায়গাটাকে ঠিক নিজের পারফরম্যান্স দেখানোর জায়গাও মনে করেন না। সাবের হোসেন চৌধুরী ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হিসেবে ভীষণ সফল ছিলেন। পরের নির্বাচনে তো এর ভিত্তিতে আর জিততে পারেননি। কাজেই তারা এটাকে পদাধিকারবলে প্রাপ্ত একটা চেয়ার ধরে নিয়ে মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেই দায়িত্ব শেষ করেন। আর ফেডারেশন চলতে থাকে লাইনে বসানো মালগাড়ির মতো। ফুটবল মাঠ দর্শকশূন্য হয়। ক্রিকেট এক গন্ডিতে আটকে থাকে।

দিন-বদলের গানের জোরেই এই সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এবং তারপর চাটুকার শ্রেণী রাতের আঁধারের গল্পের মধ্যেও এমন দিন-বদল ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে ব্যাপারটা এখন প্রায় হাস্যকর। তবু বলি, এই আওয়ামী লীগ সরকারই ক্রীড়াঙ্গনে নির্বাচন দিয়ে যোগ্য সংগঠকদের ফেডারেশনে আনার ব্যবস্থা করেছিল। বাকি রয়ে গিয়েছিল সভাপতির পদটা। এখন এটাকে নিজেদের অসমাপ্ত কাজ মনে করে সভাপতি পদেও নির্বাচনের ব্যবস্থাটা করে ফেললে ক্রীড়াঙ্গনের দিন-বদল বোধহয় হয়েই যাবে।

অন্যান্য খাতে দিন-বদল প্রায় এভারেস্ট জয়ের মতো ব্যাপার। ক্রীড়াঙ্গনে কত সামান্য কাজ। সাফল্যের এমন লুটিয়ে থাকা সুযোগ পায়ে ঠেলতে আছে!

Last modified on Monday, 10 March 2014 16:24