ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

মেঘে মেঘে এক বেলা

Rate this item
(0 votes)

সত্যিই তো আকাশ ফুঁড়ে উঠছি! কেব্ল কারের ছোট্ট খোপের ক্ষুদ্র জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ছে মেঘ। মনে তখন ঘুরছে কত উপমা, কত গান, কত কবিতা। ‘নীল আকাশে কে ভাসালো সাদা মেঘের ভেলা...’ মনে করেই বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশে নীল নেই। মনে হলো, এ তো মেঘবালিকা। থোকা থোকা মেঘ উড়ে উড়ে যাচ্ছে বালিকার উচ্ছলতায়। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির ঝাঁটও লাগছে মাঝে মাঝে। যেন যাচ্ছি মেঘদূতের কাছে। কেব্ল কারটা বুঝি তিনিই পাঠিয়েছেন।আমরা উঠছি। মেঘ ফুঁড়ে। গন্তব্য আমাদের গেনটিং হাইল্যান্ডস। সহযাত্রী শেখ মামুন হঠাৎ বলল, নিচে তাকান। তাকিয়ে দেখি গাঢ় সবুজ। ছোট, বড়, বিশাল নানা আকারের

বৃক্ষরাজি। মনে পড়ে গেল বান্দরবানের কথা।ছয় হাজার ফুট উঁচুতে গেনটিং হাইল্যান্ডসের অবস্থান। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের কাছেই। মামুনদের বাসা কুয়ালালামপুর থেকে একটু তফাতে ওয়াংসা মাজু। প্রথম দিনই মামুন বলেছিল, ‘গেনটিংয়ে চলেন, ভালো লাগবে।’ ৩ জানুয়ারি আমরা দুজন সকালের দিকেই বেরোলাম। এ দেশে কাল, মানে মৌসুম মোটামুটি একটাই—সামার। তবে বৃষ্টি নামে যেকোনো সময়। ওয়াংসা মাজু থেকে ট্রেনে গোমবাক। সেখান থেকেই একবারে কাটা হলো বাস আর কেব্ল কারের টিকিট। দুজনের জন্য ১৮ রিঙ্গিত। বাসে করে পাহাড় বেয়ে উঠতে হবে গেনটিংয়ের বেসক্যাম্পে। সেখান থেকে কেব্ল কারে উড্ডয়ন। আমরা দাঁড়ালাম স্কাইওয়ে নামের এই কেব্ল কারের ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্মে। লাইন ধরে নেমে আসছে কেব্ল কার, সারবেঁধে মানুষ উঠছে। প্রতিটি যাত্রীর ছবিও তোলা হচ্ছে। অভিজ্ঞ মামুন জানাল, ‘গেনটিংয়ে নামলেই এ ছবির প্রিন্ট দেবে আপনাকে। কিছু রিঙ্গিত নেবে তার বিনিময়ে।’
বাংলাদেশের নন্দন পার্কের কেব্ল কার ছাড়া এ যানে চড়ার অভিজ্ঞতা আর নেই। তাই মুগ্ধ নয়নে দেখতে থাকি রংবেরঙের কেব্ল কার। রশি বেয়ে চলন্ত খোপের ঊর্ধ্বগমন শুরু হলো। আর আমরা ঠান্ডার ছোঁয়া পেতে থাকলাম। কুয়ালালামপুরে গরম, তাই পোশাক তেমনই ছিল। এই উচ্চতায় মেঘের মধ্যে এসে শীত শীত লাগল বেশ।
গেনটিং হাইল্যান্ডস মালয়েশিয়ার একটা পর্যটনকেন্দ্র। ১৯৬৫ সাল থেকে চালু হয়েছে এটি। পাহাং ও সেলাংগর অঙ্গরাজ্যের সীমানায় তিতিওয়াংসা পাহাড়ের ওপর এই পর্যটনকেন্দ্র। এ কেন্দ্র গড়ে তুলেছে গেনটিং গ্রুপ। এখন গেনটিংয়ের আড়ালে পাহাড়ের নামটাই চাপা পড়ে গেছে।
কেব্ল কারে উড্ডয়ন শেষ হলো। পেরিয়ে এলাম ৩ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার। দূর থেকেই দেখলাম, একটা উঁচু দালানের চূড়ায় ৬০০০ লেখা। এর মানে ছয় হাজার ফুট উচ্চতা। আর এ দালানসহ আরেকটি দালান মিলে হলো রিসোর্ট হোটেল অ্যান্ড গেনটিং হোটেল। এ দুটোর পাশে আরও দুটো দালান। সে দুটো গায়ে রংধনুর সাত রং—ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড হোটেল। রঙিলা এ হোটেলে আছে পাঁচ হাজার কক্ষ। নিচের তিন-চার তলাজুড়ে মার্কেট। ছোটদের থিম পার্ক, রেস্তোরাঁ—কী নেই এতে। ক্যাসিনোও আছে পর্যটকদের জন্য। আরামের জন্য পরেছিলাম স্লিপার, সেটাই হলো কাল। স্লিপার পরা থাকায় ক্যাসিনোতে ঢোকার অধিকার মিলল না। কী আর করা। ফার্স্টওয়ার্ল্ড থেকে বেরিয়ে এলাম রিসোর্ট হোটেলে। এখানেও নিচের কয়েক তলাজুড়ে মার্কেট, রেস্তোরাঁসহ নানা কিছু। এ দুই হোটেলে পেছনে পাহাড়ের ঢালে দেখা গেল বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। আগে একটা থিম পার্ক ছিল এখানটায়। সেটা ভেঙে নতুন আঙ্গিকে নতুন পার্কের নির্মাণকাজ চলছে।
ফেরার পালা। ‘কেব্ল কার কিন্তু এবার খাড়া নামবে। ভয় ভয় লাগে। নাকি বাসে যাবেন?’ মামুনের প্রশ্ন আমার প্রতি। উঠেছি যখন, তখন নামবও রশি ধরে।
নামার সময়ও আমরা বেছে নিলাম কেব্ল কার। মেঘদূত তো আমাদের জন্য সেই ব্যবস্থা করেই রেখেছেন। আবারও মেঘ ফুঁড়ে চলা, নেমে আসা—নিচে তাকিয়ে দেখা বান্দরবানের মতো সবুজ অরণ্যের অপূর্ব তৈলচিত্র।