ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

ফিলিপ দ্বীপের পেঙ্গুইন হন্টন

Rate this item
(0 votes)

দর্শকদের চোখ সতর্ক। কান খাড়া। ওদের আসার সময় আসন্ন।ফিলিপ আইল্যান্ডের সূর্য এদিকে ডুবি ডুবি। দু-একটা বাউণ্ডুলে গাঙচিল ছাড়া সৈকতে কেউ নেই। নীল সাগর থেকে ধেয়ে আসছে তীব্র ঠান্ডা বাতাস। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই দর্শকসারিতে অপেক্ষমাণ ‘বহু জাতিক’ ব্যাকুল দর্শকদের। নিরাপত্তা কর্মীদের চোখও সতর্ক। ওদের ছবি ওঠানো চলবে না কিছুতেই। আজ ওদের দেখা দেওয়ার সময় রাত আটটা ৪৫ মিনিট। অপেক্ষা, উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা! তবে কি আজ আর আসবে না ওরা?এর মধ্যেই আচমকা হর্ষধ্বনি। ‘দেখা গেছে দেখা গেছে’ পাশ থেকে আনন্দে চিৎকার করল বড় ভাই তারিকুল হাসান চৌধুরী। কই? কোথায়

ওরা? ওই যে সাগরের ঢেউ। ওখানে কালো মতন, এত্তটুকুন। হ্যাঁ হ্যাঁ। তাই তো। পেঙ্গুইন! পুেঙ্গুইন!! ওরা উঠে আসতে শুরু করেছে। দর্শকদের খুশি ততক্ষণে বাঁধ মানতে চাইছে না আর।হাজারও উৎসুক চাহনির সামনে প্রথম পেঙ্গুইনটি অবশেষে পা রাখল ভেজা বালুতে। সমারল্যান্ড সৈকতের শত দর্শক তার কাছে আসার অপেক্ষায়। কিন্তু না...দর্শক প্রত্যাশার চাপ সামলাতে না পেরেই সম্ভবত গুটগুট করে আবার পানিতে ফিরে গেল বাচ্চা পেঙ্গুইনটা। দর্শকসারিতে হতাশার রব উঠল। কিন্তু হতাশ হওয়ার কারণ নেই। একটু আগে ভিজিটর সেন্টারে প্রদর্শিত তথ্যচিত্রে আমরা জেনেছি, ফিলিপ আইল্যান্ডের এই সুবিখ্যাত খুদে পেঙ্গুইনের দল আসলে মাত্রাতিরিক্ত ভিতু। সাগর থেকে মৎস্য শিকার শেষে ওরা উঠে আসবেই শেষমেশ। দলবেঁধে ফিরবে বাসায়। তাদের এই দলবদ্ধ হন্টনের সৌন্দর্যই মূলত বহু বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে সাগরপাড়ের এই পেঙ্গুইন বসতিকে। যার নাম পেঙ্গুইন প্যারেড।
ফিলিপ আইল্যান্ড মেলবোর্ন থেকে ঘণ্টা খানেকের পথ। সূর্য ডোবার সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে পেঙ্গুইনদের উঠে আসার সময়ও থাকে পূর্বনির্ধারিত। সেই সময় হেরফের হওয়ার উদাহরণ বিরল।
স্টেডিয়াম কিংবা কনসার্টের মতোই পেঙ্গুইনদের যত কাছ থেকে দেখবেন, তার খরচাও তত বেশি। সময় ভেদে জনপ্রতি টিকিটের দাম হতে পারে বাংলাদেশি টাকায় ১৫০০ থেকে ৮০০০ টাকা পর্যন্ত।
দর্শকসারিতে আবারও উত্তেজনা। পুনরায় দেখা মিলেছে পেঙ্গুইনদের। এবারে সদলবলে। পেঙ্গুইনরা যেন ‘ভাই ভাই’। কেউ কাউকে ফেলে যাচ্ছে না। একজন দু পা সামনে এগিয়ে গেলে খুব সাবধানে ইতিউতি তাকায়। পেছনের জন্য অপেক্ষা করে।
ঘণ্টা খানেকের মধ্যে রাশি রাশি পেঙ্গুইনে ভরে গেল গোটা সমারল্যান্ড সৈকত। পেঙ্গুইনরা উঠতে শুরু করল ডাঙায়। দূর থেকে দেখা শেষ। এবার আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ। কাঠের পাটাতন ধরে আমরা এগোচ্ছি। ওই তো! পাটাতনের ঠিক নিচেই গুটিসুটি মেরে আছে দুটো পেঙ্গুইন। ডাকটা প্রায় মুরগির বাচ্চার মতোই লাগে শুনতে। আদতে আরও মিহি।
ফিলিপ আইল্যান্ডের এসব পেঙ্গুইনই পৃথিবীতে আকৃতিতে সবার চেয়ে ছোট। আর এই ক্ষুদ্রত্বই তাদের দর্শনীয় হয়ে ওঠার বড় কারণ। পেঙ্গুইন-গবেষকেরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন এই দ্বীপের পেঙ্গুইন বসতি আর বহু পুরোনো এই পেঙ্গুইন প্যারেড টিকিয়ে রাখতে।
পেঙ্গুইনদের এই বসতিতে সবকিছুই তাদের সুবিধা মাফিক চলে। সে কারণেই দ্বীপের কর্তারা ‘ছবি নয়, স্মৃতি জিইয়ে রাখুন’ নীতিতে বিশ্বাসী। ছবি তুললে পেঙ্গুইনরা বিরক্ত হয়। দর্শনার্থীদের জন্য আরও আছে কড়া সতর্কতা। রাতের বেলা গাড়ি স্টার্ট করার সময় সাবধান। গাড়ির নিচটা দেখে নিন। পাছে কোনো দলছুট পেঙ্গুইন গাড়ির নিচে পড়ে মারা যায়। পেঙ্গুইন দেখা শেষে ভিজিটর সেন্টার থেকে বেরিয়ে আসছি। ছবি তুলতে না পারায় মনটা খচখচ করছে।
এর মধ্যেই হঠাৎ বড় ভাবি সালমা শফিকের চিৎকার, ‘পেঙ্গুইন! পেঙ্গুইন!’। মারমার কাটকাট। এ যে অবিশ্বাস্য। সত্যিই সত্যিই একটা পেঙ্গুইন ‘ছবি তোলা নিষেধ’ এলাকা পেরিয়ে চলে এসেছে কার পার্কিংয়ে। সনি এক্সপেরিয়া বাগিয়ে ছুটলাম। ফটাফট ছবি ওঠালাম দলছুট পেঙ্গুইনটার। আমি আর আরও কয়েকজন। খুশিমনে ছবিগুলো দেখতে বসি। ছবি উঠেছে বটে! অন্ধকারে বেজায় ঝাপসা। ছাপানোর যোগ্য নয় মোটেও। যাক, ছবি যাক, স্মৃতিটুকু থাক।

 

 

 

Last modified on Sunday, 09 March 2014 20:02