ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

দেয়াল-কবিতার শহরে

Rate this item
(0 votes)

লেইডেন এক আশ্চর্য মজার শহর। খুব বড় নয় শহরটা। বাংলাদেশের গড়পড়তা মফস্বল শহর থেকেও ছোট হবে। নেদারল্যান্ডসের মধ্যেও খুব ছোট। আর রাজধানী আমস্টারডাম বা হেগ, রটারডাম, উটরেক্ট বা মাস্ট্রিক্ট শহরের সামনে দাঁড়াবার মতো জৌলুসও নেই লেইডেনের। জাঁকজমক তো বটেই, আমস্টারডাম, হেগ কিংবা মাস্ট্রিক্ট শহরের আন্তর্জাতিক পরিচিতিও বেশি। তাই নেদারল্যান্ডস বলতেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে আমস্টারডাম-হেগের ছবি। এটা ঠিক, পর্যটকদের কাছে আমস্টারডাম একটা স্বর্গ যেন। শহরজুড়ে শিরা-উপশিরার মতো খাল, বোট রাইডিং, জাদুঘর থেকে শুরু করে রেডলাইট ডিস্ট্রিক্ট আর সেক্সশপগুলোও সারা দুনিয়ার পর্যটকদের কাছে বড় আমোদের জায়গা। সেই ছয় শতক থেকে বহু জাতি-ধর্ম-বর্ণের

মানুষের সমাগমে গড়ে উঠেছে আমস্টারডাম। কিন্তু আমস্টারডামের মতো কসমোপলিটন এবং শত কিলোমিটার খালের শহর দুনিয়ায় কম হলেও আছে, তবে লেইডেনের মতো শত কবিতার শহর দুনিয়ায় আর একটিও নেই।

জৌলুস আর আমোদ-প্রমোদের দিক থেকে ছোট শহর হলেও লেইডেনে যাঁরা থেকেছেন বা নেদারল্যান্ডসের যাঁরা নাগরিক, তাঁদের কাছে লেইডেন একটি গর্বের জায়গা। লেইডেনকে তাই নেদারল্যান্ডসবাসী সম্মান আর সমীহের চোখেই দেখেন। লেইডেন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শহর। মূলত সেখানকার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই শহরটি প্রসার লাভ করেছে। নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় এটি। প্রতিষ্ঠিত হয় ১৫৭৫ সালে। প্রতিষ্ঠাতা যুবরাজ উইলিয়াম অরেঞ্জ, স্পেনের সঙ্গে ৮০ বছরব্যাপী ডাচ বিদ্রোহের নেতা। স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার লড়াইয়ে লেইডেন নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকায় উইলিয়াম অরেঞ্জ এ শহরকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় উপহার দিয়েছিলেন। সে অর্থে লেইডেন নেদারল্যান্ডসের স্বাধীনতা আন্দোলনেরও প্রতীক।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময়কাল থেকেই লেইডেন শহর, নেদারল্যান্ডসের তো বটেই, পুরো ইউরোপের জ্ঞানচর্চার অন্যতম পাদপীঠ হয়ে ওঠে। ইউরোপের বিভিন্ন জায়গা থেকে পণ্ডিতেরা লেইডেন শহরে আসতেন জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চার জন্য। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ইউরোপের অন্যান্য দেশ যেমন-ফ্রান্স ও পর্তুগালে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যেসব পুস্তক প্রকাশ নিষিদ্ধ ছিল, সেগুলো অনায়াসেই দিনের আলো দেখতে পারত নেদারল্যান্ডসে। সপ্তদশ শতকে আমস্টারডামে পুস্তক প্রকাশনা শিল্পের যে উত্থান ঘটেছিল, তার প্রতিষ্ঠায়ও অন্যতম ভূমিকা রেখেছিল লেইডেন শহরের উদারনৈতিক জ্ঞানচর্চার পরিবেশ। সংগ্রহের দিক থেকে লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাগারের স্থান ইউরোপের প্রথম সারির পাঠাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ পাঠাগারে রয়েছে অষ্টাদশ শতক থেকে প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত বিপুল সংখ্যক পাণ্ডুলিপি গ্রন্থ, ছবি ও মানচিত্র। এ ছাড়া এশিয়া-অধ্যয়নের জন্য এখানে রয়েছে কের্ন আই নামে বড় একটি সংগ্রহশালা। বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও গিয়েছিলেন এ শহরে। লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের একটি ভাস্কর্য আছে।

লেইডেন শহরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর উত্সবমুখরতা। বছরের ১২ মাসে যেন ১৩ পার্বণ লেগে থাকে এখানে। সেপ্টেম্বর হচ্ছে উত্সব শুরুর মৌসুম। সেপ্টেম্বর লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশন শুরুর মাস হওয়ায় এ সময়ে শহরে অনেক তরুণ নবাগতকে দেখতে পাওয়া যায়। লেইডেনের মনোমুগ্ধকর খালগুলো তখন নানা রঙের নৌকায় অপরূপ রূপ ধারণ করে। শহরের পানশালাগুলোতে উত্সব চলে গভীর রাত পর্যন্ত। এরপর ৩ অক্টোবর, নেদারল্যান্ডসের স্বাধীনতা দিবস। ৩ অক্টোবর শুরু হয়ে সপ্তাহজুড়ে লেইডেনে চলে কার্নিভাল। সারা দিন-রাত উত্সবে মেতে থাকেন তরুণ, তরুণী ও বয়স্করা। অক্টোবর থেকে শীতের প্রকোপ বাড়তে থাকলে শহরটাও একটু ঝিমিয়ে আসে। আসন্ন বড়দিনের উত্সবকে কেন্দ্র করে পত্রপল্লবহীন গাছগুলোতে শোভা পেতে শুরু করে বর্ণিল মরিচবাতি। সেও এক দেখার মতো দৃশ্য।

তবে বসন্ত আসার সঙ্গে সঙ্গেই আবারও যেন পূর্ণোদ্যমে সতেজ হয়ে ওঠে লেইডেন। বিশ্ববিদ্যালয় লেক, হর্টাস বোটানিকাস আর পার্কের সবুজ ঘাসে বই আর পানীয় নিয়ে এক অন্য আমেজে সময় কাটায় সবাই। লেইডেন শহরজুড়ে প্রাধান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরই। যে জায়গায়ই যাবেন চোখে পড়বে তাদের মুখর উপস্থিতি। তবে শিক্ষার্থীরা শহরজুড়ে আনন্দ আর মজা করে বেড়ালেও কখনো দাপট দেখান না বা হুল্লোড় করেন না। শহরের সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁদের সম্মান অগাধ। তার প্রতিদানও শিক্ষার্থীরা পান লেইডেনের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্থানীয় নাগরিকেরা অনেক ভালোবাসে।
লেইডেন শহরের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর সাপ্তাহিক হাট। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মতোই এই শহরে প্রতি শনিবার সাপ্তাহিক হাট বসে। রাস্তার ধারে শাকসবজি, শীতের পোশাক, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে জামাকাপড় সবই পাওয়া যায় খুব কম দামে। হাটকে ঘিরে শহরের মানুষ সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করে। ছেলে, বুড়ো থেকে শুরু করে সবার যেন দিনের একটা সময় হাটে আসা চাইই।

সবকিছু ছাপিয়ে লেইডেন শহরের যে আয়োজন একে অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে তা হলো এর দেয়াল-কবিতা। শহরের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী ভবনের দেয়ালে ১০১টি কবিতা। দেয়ালে দেয়ালে রঙে লিখে ও খোদাই করে এই কবিতার প্রকল্প শুরু করেছিল ‘টেখেন ব্লিড’ নামে সাহিত্যপ্রেমী একটি দল। ১৯৯২ সালে বেসরকারি উদ্যোগে এ কাজ শুরু হয় রাশিয়ান কবি মারিনা তেসভেটজেভার একটা কবিতা খোদাইয়ের মাধ্যমে। আর এ দেয়াল-কবিতার কাজ শেষ হয় স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার প্রোফুন্দিস কবিতার মধ্য দিয়ে। দেয়ালে কবিতা লেখার পেছনে উদ্যোক্তাদের যুক্তি ছিল, এর মধ্যদিয়ে শহরে এমন আবহ তৈরি হয়, যা পথচারীদের মনে বিশেষ ভাবের সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় শহর হওয়ায় যুগে যুগে লেইডেনে আগমন ঘটছে গুরুত্বপূর্ণ লেখক, কবি, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক ও বিদ্বানদের। পিট পালজেন্স, জে সি ব্লুম, মার্টিন বিসহুভেল, ইয়ান ওলকারস, মার্টিন হার্ট ও আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো জগেসরা গুণীরা বাস করেছেন এ শহরে। বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃষ্টিশীল এই ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিতেই উদ্যোক্তারা দেয়াল-কবিতার এই প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় রচিত কবিতা সেই ভাষাতেই স্থান পেয়েছে শহরের ১০১টি দেয়ালে। প্রতিটি কবিতার নিচে ইংরেজি ও ডাচ অনুবাদ থাকায় দেশি-বিদেশি পর্যটকরাও সেগুলো পড়তে পারেন। এ অনন্য উদ্যোগের মধ্যদিয়ে লেইডেন এখন দেয়াল-কবিতার শহর।

 

 

 

Last modified on Sunday, 09 March 2014 21:19