ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

সবুজ এক পাহাড়ি গাঁও

Rate this item
(0 votes)

রাঙামাটি ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিয়ে যেতে হলো প্রায় তিন ঘণ্টা। গন্তব্য বিলাইছড়ির কাছকাছি আদিবাসীদের গ্রাম পাংখোয়া। এই পথটুকু যেতে যেতে কী যে অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ল, তা বর্ণনা করা কঠিন, শুধুই উপলব্ধি করা যায়। যতই ভেতরে যেতে থাকলাম, ততই দুই পাশের ছবি বদলে যেতে থাকল। ঘন থেকে ঘনতর হলো গাছগাছালি। বাড়িঘরের সংখ্যাও কমে যেতে যেতে একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল। বড় বড় গাছের শাখা দুই পাশ থেকে ঝুঁকে এসে মিশে গেছে নদীতে। দেখে মনে হলো বোধ হয় নৌকা নিয়ে আর এগোনো যাবে না। কিন্তু মাঝি ঠিকই পথ বের করে এগিয়ে গেল। কোনো কোনো জায়গায় পানি এতটাই স্বচ্ছ

যে পাশের পাহাড়ের, গাছগাছালির, বুনোফুলের ছায়া দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। আর আকাশের রং? সেও নীল ঝকঝকে। এই পথ দিয়ে যেতে যেতে বারবার গুনগুন করে গাইতে থাকলাম... ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে-যে আমার জন্মভূমি।’পানিপথটুকু পাড়ি দিতে গিয়ে নিরাপত্তা চৌকির অনুমতির প্রয়োজন হবে। সাধারণত নৌকার মাঝি বা স্থানীয় গাইড সেই অনুমতি সংগ্রহ করে থাকে। প্রায় দুই ঘণ্টা চলার পর আমরা দেখতে পেলাম পাহাড়ের গায়ে জনবসতির চিহ্ন। ছোট ছোট বাড়িঘর, ঘাটে নৌকা বাঁধা, পানি নিতে এসেছে কেউ কেউ, কেউ বা নাইতে নেমেছে। পাশ দিয়ে যাত্রী নিয়ে দু-একটি নৌকাও চলে যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। বিভিন্ন আদিবাসীর বাস এখানে। কিছু বাঙালিও বসতি গড়েছে এতটা গভীরে এসে। তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এখানকার অখণ্ড নিস্তব্ধতা। নির্জনতারও যে একটা শব্দ আছে, তা এখানে এলে অনুভব করা যায়। এমনকি নৌকার একটানা ইঞ্জিনের শব্দও এই নির্জনতা ভাঙতে পারেনি।পাংখোয়া আদিবাসীরা যে পাহাড়গুলোতে বসতি গড়েছে, ঠিক তার সামনে দিয়েই বয়ে চলেছে রিয়াংখং নদী। দূর থেকেই চোখে পড়বে পাংখোয়া শিশুদের জন্য স্কুল এবং কমিউনিটি ভবনটি। অতিথিরা যোগাযোগ করে এলে এখানেই থাকতে পারেন। অনেকেই এসে শুধু ঘুরে আবার রাঙামাটিতে ফিরে যান। এপথে স্পিডবোটও চলে। পথের দুই পাশের যে দৃশ্য, শুধু সেটা দেখার জন্যই এপথ ধরে যাওয়া যায় বহুদূর।পাংখোয়া আদিবাসীরা সংখ্যায় খুব কম এবং বেশ দুর্গম অঞ্চলে এদের বাস। খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী হলেও এরা জীবনযাপন করে সমাজে প্রচলিত নিজেদের রীতিনীতি অনুযায়ী। অবস্থাপন্ন না হলেও খুব আন্তরিক এদের ব্যবহার। বাড়িঘরগুলো সাজানো-গোছানো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। যাঁরা এখানে থাকতে চান, তাঁরা রাঙামাটিতে গ্রিনহিল নামে একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে গেলে পাংখোয়াদের গ্রামে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা পাবেন। ছোট ছোট চায়ের দোকানে পেয়ে যাবেন চায়ের সঙ্গে কিছু ‘টা’ও। তবে একটু চেষ্টা করলে আয়োজন করা যায় খাঁটি পাহাড়ি খাবারের। গ্রামটি নদীর পাশে হলেও পাহাড়ের ওপরে হওয়ায় এখানে পানির খুব কষ্ট।আমরা যেখানে ছিলাম তার একেবারে সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে টলটলে পাহাড়ি নদী রিয়াংখং। ঘন কালো রাতও যে এত সুন্দর হতে পারে, ওখানে না গেলে হয়তো কখনো বুঝতে পারতাম না। নিকষ কালো রাতে আকাশে তারার মেলা, খোলা প্রান্তর, বয়ে চলা নদীর শব্দ, পাশেই দাঁড়ানো আবছায়া পাহাড়, বসন্তের বাতাসে শীতের গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসছে দু-একটি নিশাচর প্রাণীর ডাক। আর এর মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি আমরা কয়েকজন মানুষ। কিন্তু কী আশ্চর্য, কারও মুখে কোনো কথা নেই।পরদিন এখান থেকে আরও ভেতরে গেলাম পাথরের পাহাড় দেখতে। উহ্ কী সুন্দর এখানকার প্রকৃতি! আরও সবুজ, আরও পাহাড়ি ফুল। শেষ বিকেলের রক্তিম আলোয় চারপাশটা উজ্জ্বল। কিন্তু এ কী, পানির নিচে জলজ উদ্ভিদগুলোও নৌকা থেকে দেখা যাচ্ছে! এর ভেতর মৌন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আমাদের পাথুরে পাহাড়। নিবিড় সবুজ আর নিস্তব্ধতার মধ্যে দুটি রাত কাটিয়ে আসতে চাইলে চলে যেতে পারেন সেই গ্রামটিতে।

 

 

 

Last modified on Sunday, 09 March 2014 21:24