ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Wednesday, 19 March 2014 20:45

আকাশ ছুঁয়ে স্বপ্নের বসবাস, জার্নি টু দার্জিলিং

Rate this item
(0 votes)

এটি সমতলভুমি থেকে প্রায় ৫ হাজার ফুট উপরে। যেদিকে তাকাই শুধু পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে সারি সারি চা গাছ। দুর থেকে দেখে মনে হয় আফ্রিকানদের মাথা। কারন ওদের মাথার চুলগুলো যেমন সিঁথি করে বিনুনি করা হয়, ঠিক তেমন। দুপাশে সবুজ চা বাগান ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমাদের গাড়ি এগিয়ে যেতে লাগল সামনে। সবুজ স্বপ্নরা আমাদের হাতছানি দেয়। ওরা ডেকে ডেকে বলে ওগো বাঙালী মেয়ে, একটিবার ফিরে তাকাও। দেখ, তোমার সবুজ শ্যামলী শাড়ি আমার পরনেও আছে। একটিবার তাকিয়ে দেখ, পছন্দ হয়? মিষ্টি হাসিতে অস্পষ্ট শব্দে বলি, খুব হয়। প্রকৃতি আমার আজীবনের বন্ধু। তোমাদের নিয়েই স্বপ্ন সাজাই নদীর কিনারায়। মনে মনে ওদের নিমন্ত্রণ করি, তোমরা যেও আমার বাংলায়…..। সেখানে সবুজে ঘেরা বাড়িগুলোতে স্বপ্নের জন্ম হয় প্রতিনিয়ত। তোমাদের ভাল লাগবে। আর দেখবে, সেখানে সরল সহজ মানুষগুলো প্রকৃতির কোলে লালিত হয়। কখনো প্রকৃতির আদরে আত্মহারা হয়। আবার প্রকৃতির রোষানলে জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়। তবুও তারা বেঁচে থাকে, স্বপ্নের জন্ম হবে বলে।

আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল ওদের ছেড়ে আসতে। তবু চলে যাচ্ছি, যেতে হচ্ছে। গাড়ি পৌঁছে গেল মিরিখ। প্রকৃতি কতটা সবুজ হলে মানুষের মন কাড়তে পারে, তা এখানে না আসলে বোঝা যায় না। এখানে কিছুক্ষণ থেকে, দুপুরের খাবার খাব। তাই ভাল রেষ্টুরেন্ট খুঁজতে লাগলাম। যাহোক অনেকদিন পর এখানে রুইমাছ, ডাল, আলুমটর দিয়ে ভাত খেলাম। পাহাড়ে প্রচুর মুসম্বি ফল পাওয়া যায়। তাই বিট লবণসহ একগ্লাস জুস খেতে ভুল করলাম না। বিশাল জায়গা পড়ে আছে। লেকে প্রচুর মাছ দেখা যাচ্ছে। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে দুদণ্ড শান্তি পাবার আশায়। সত্যি জায়গাটি শান্তির জায়গা। আগে লেকে বোটিং-এর ব্যবস্থা ছিল। জানতে পারলাম, কয়েকমাস আগে এখানে বোটিং করতে গিয়ে একটি ছেলে মারা গেছে। তাই কর্তৃপক্ষ আপাতত বোটিং বন্ধ করে দিয়েছেন।

মিরিখ ছেড়ে আমরা চলে যাচ্ছি শিলিগুঁড়ি। রাস্তার মধ্যে আমার মাথা ঘুরছে। কিছুই ভাল লাগছে না। জার্নি করার সময় সাধারনত বমিনাশক ট্যাবলেট খেয়ে নেই। কিন্ত আজ তা মনে ছিল না। তাই বুঝতে বাকি নেই কি অঘটন ঘটতে যাচ্ছে। কিছুদূর যাবার পর ড্রাইভারকে বললাম গাড়ি থামাতে। রাস্তার একপাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখল। গাড়ির গ্লাস নামিয়ে বসে রইলাম। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হল। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি আমার মুখে পড়ছে। ক্লান্ত হয়ে গা এলিয়ে দিলাম পেছনে। চোখ বন্ধ করে সময় গুণতে লাগলাম কখন শিলিগুঁড়ি পৌঁছাব। গাড়ি এসে থামল শিলিগুড়ি আমাদের গন্তব্যে। আমরা নেমে গেলাম ভাড়া মিটিয়ে। রুমে গিয়ে প্রথমেই ফ্রেশ হয়ে নিলাম। বিকালের দিকে চিন্তা করলাম এখানকার বিখ্যাত কি খাওয়া যায়?

রিক্সায় চেপে সামনে এগিয়ে গেলাম। রিক্সাওয়ালাকে বললাম এখানে বিখ্যাত কী আছে? তিনি বললেন বিখ্যাত খাবার খেতে হলে যেতে হবে রেষ্টুরেন্টে। তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন ‘খানা খাজানা’ রেষ্টুরেন্টে। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। ছোট ছোট ছাতার নিচে টেবিল চেয়ার বিছানো আছে। আমরা সুবিধা মতো বসে পড়লাম। একটি ছেলে এসে মেনু ধরিয়ে দিল। আমরা ভেজিটেবল পাকোড়ার অর্ডার দিলাম। ছেলেটি চলে গেল। অনেক বড় স্পেসে অনেকগুলো ছাতা ছড়ানো আছে। তার নিচে অনেক মানুষ নানা কাজে ব্যস্ত। কেউ খাবার খাচেছ, কেউ খেলছে, কেউ নিছক গল্প করছে। আমাদের পাশে একটি টেবিলে কয়েকজন ছেলে বসে বড় বাদশাহী হুক্কা খাচেছ। মনে মনে চিন্তা করলাম এগুলো দিয়ে কি খাচ্ছে? আমাদের খাবার নিয়ে এলো। ছেলেটি বাঙালী জেনে তার কাছে হুক্কার গল্প জিজ্ঞাসা করলাম। ছেলেটি জানাল, এ হুক্কার কল্কিতে স্টবেরি, আপেল, নাসপাতির টুকরা দেয়া হয়। এক বিশেষ পদ্ধতিতে এগুলোকে ভাপে দেয়া হয়। বড় আকৃতির নলের সাহায্যে ফ্রুটস ফ্লেভার নেয় মুখ দিয়ে।

আমার মেয়ে কখনো ট্রেনে চড়েনি। তাই সিদ্ধান্ত হলো আগামীকাল আমরা ট্রেনে করে কোথাও ঘুরতে যাব। আমরা শিলিগুঁড়ি রেলজংশনে গেলাম। অনুসন্ধানকেন্দ্রে এক ভদ্রলোকের কাছে জিজ্ঞেস করলাম ট্রেনে করে ৪/৫ ঘন্টার মধ্যে আপ-ডাউন করা যায় এমন জায়গা আছে? তিনি বললেন, আছে তবে লোকাল ট্রেনে যেতে হবে। কাছের স্টেশনে অগ্রিম টিকিট বা রিজার্ভ টিকিট হয় না। আমাদের মনটা খারাপ হয়ে গেল। কি আর করা! মনখারাপ করে ফিরে এলাম। পরদিন মার্কেটিং করতে গেলাম বিধান মার্কেটে। এটি শিলিগুঁড়ির সবচাইতে হোলসেলার বড় মার্কেট। এখানে জলপাইগুড়ি, কোচবিহার থেকে মানুষ আসে মার্কেটিং করতে। আমরাও গেলাম বিধান মার্কেটে কেনাকাটা করতে। বেশ ভাল এখানকার জিনিসপত্র। দামও তুলনামুলক সস্তা। পছন্দমতো অনেক কিছু কেনা হলো। একটি দোকানে লেহেঙ্গা কেনার জন্য যাওয়া হলো।

আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি জেনে তিনি বললেন, আমাদের এসব লেহেঙ্গা বাংলাদেশের বসুন্ধরা মার্কেটে ও রাজশাহীতে যায়। অনেক আতিথেয়তা করল আমাদের। অন্য একটি দোকানে গিয়ে আমার মেয়ে একটি বাংলাদেশি পাঁচ টাকার কয়েন বের করে খেলছিল। ওটা ওর প্যন্টের পকেটে ছিল। ওর হাতে কয়েনটি দেখে দোকানি বলল, কয়েনটা একটু দাও তো। আমার মেয়ে তাঁর হাতে দিয়ে দিল। তিনি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলেন, তারপর বললেন এখানে বঙ্গবন্ধু সেতুর ছবিটা দেখলাম। জানতে পারলাম তাঁর বাড়ি সিরাজগঞ্জ। আমি তাকে কয়েনটি গিফট করলাম। তিনি আমাকে ভারতীয় পাঁচ টাকা দিতে চেয়েছিলেন। আমি বললাম তাই কি হয়? এটা বাংলাদেশের তরফ থেকে আপনাকে স্মৃতিউপহার দেয়া হলো। তিনি কয়েনটি পেয়ে এত খুশি হলেন যে ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

সকাল থেকে সব জিনিসপত্র গুছানো হচ্ছে। আজ আমরা চলে যাব। আমার মেয়ে আসবে না বাংলাদেশে। ও বলছে আমরা কেন থেকে যাচ্ছি না? আমি বললাম এটা আমাদের দেশ নয়। এটা অন্যের দেশ। এখানে বেশিদিন থাকলে পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। ও বলল, কেন ধরে নিয়ে যাবে? আমরা কি কোনো অন্যায় করেছি? চোখের দেখা কোনো অন্যায় নয়। একদিন ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হয়ে গেল। সেদিন অনেক স্ত্রী ঘুম থেকে উঠে দেখে তার স্বামী অন্য দেশে বাস করছে। সেদিন থেকে দুটি দেশের সীমান্তে কাটাতারের বেড়া পড়ল। শুরু হলো সীমান্ত পাহারা, দেশ রক্ষার নিরন্তর চেষ্টা। আমাদের ব্রেকফাস্ট শেষ করে বাসকাউন্টারে অপেক্ষা করছি। ১২ টা ছাড়িয়ে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। আমরা হালকা কিছু খাবার খেয়ে নিলাম এখান থেকে। বাস আসতে বেলা ২ টা বেজে গেল। আকাশ মেঘলা। বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে আসা সব যাত্রী নেমে গেল ভারতে। আমরা সেই বাসে উঠে বসলাম বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে।

আমাদের বাস চলছে ভারতের সীমান্তের দিকে। অনেক পথ, অনেক মানুুষ সব কেবল পেছনে পড়ে রইল। দুপাশে মাঠ আর মাঠ। কোথাও আখ চাষ করেছে, কোথাও চা বাগান। সমতল ভূমিতে অনেক ঘরবাড়ি, অনেক নাম না জানা ফসল। আমরা এসব কিছু পেছনে ফেলে ছুটছি সামনে, কেবলই সামনে। আমাদের সামনের সীট থেকে হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম। তাকিয়ে দেখি এক ভদ্রলোকের কোলে একটি শিশু শুয়ে আছে। তিনি তার চোখে মুখে পানির ঝাপটা দেয়ার চেষ্টা করছে। আমি এগিয়ে গেলাম তার কাছে। শিশুটি সেন্সলেস হয়েছে। গাড়ির কন্ট্রাক্টরকে বলে আপাতত গাড়ি থামানো হলো। শিশুটিকে নিয়ে রাস্তায় নামা হলো। আমি তার হাত-পা ম্যাসেস করতে করতে শিশুটি কেঁদে উঠল। শিশুটির বাবা মা তামিল। তারা যাচ্ছেন বাংলাদেশে। এ দম্পতির সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল মিরিখ। তখন কথা হয়নি, কিন্তু চোখের দেখা হয়েছিল। তারা বাংলাভাষা খুব একটা বোঝে না। কথা বলে তামিল ভাষায়। এতবড় বাসে তারা আমাকে আপন মনে করল। তিনি আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন – তুমি আমাদের সাহায্য করো। আমি শিশুটির গায়ে হাত দিয়ে দেখি অনেক জ্বর উঠেছে। সেন্সলেসের কারণ জানতে চাইলে তারা জানাল, গত রাতে জ্বর হয়েছে শিশুটির।

কটি রুমাল ভিজিয়ে আমি তার গা মুছে দিলাম। শিশুটি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠল। বাসের অনেকেই পরামর্শ দিল তারা যেন নেমে যায়। শিশুটিকে হসপিটালে ভর্তি করে সুস্থ করে পরবর্তী দিন যেন আসে। আমি মনে সাহস রেখে বললাম কিছু হবে না গাড়ি চালান। কিছুক্ষণ পর পর আমি তার খোঁজ নিলাম। যা হোক শিশুটির আর কোনো অসুবিধা হলো না। আবার চলতে চলতে গাড়িতে বিকট শব্দে সবাই চিৎকার দিয়ে উঠল। গাড়ি থেমে গেল। জানতে পারলাম পেছনের টায়ার বাষ্ট হয়েছে। কি আর করা আবারও অপেক্ষার পালা। সেখানে প্রায় আধাঘন্টা দেরি হলো। দিনের সূর্য গড়িয়ে পশ্চিমের দিগন্তে মিলিয়ে গেল। গোধূলীর শেষ আলোয় আরো একবার চোখ মেলে দেখলাম ভারতের সৌন্দর্য। আমরা পৌঁছে গেলাম ভারতসীমান্ত চ্যাংড়াবান্ধা। কাস্টমসের সব ফর্মালিটি শেষ করে আমরা আবার বাংলার মাটিকে স্পর্শ করলাম। বাস চলতে লাগল বাংলাদেশের চিরচেনা সেই পথ ধরে। রাত গভীর হতে লাগল। আমার মনে হতে লাগল এইতো আমার সেই শ্যামলী মা। যার কোলে লালিত হয়েছি এতটি বছর। তাকে ছেড়ে পৃথিবীর কোথাও গিয়ে স্বস্তি নেই। এই বাংলা আমার পরিচয়, আমার অস্তিত্ত্ব।