ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

ইতিহাসে থাকবে ‘বলাকা’র ডানা

Rate this item
(0 votes)

‘ফেদেরিকো লোরকা মৃত এবং গত/কবরখানায় বুলেটের ক্ষত...আমি আজ রাতেই একটা ডিসি-টেনে উড়ে চলে যাব।’ স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের এ গীতি কবিতায় স্থান পেয়ে তা অমরত্বের খাতায় নাম লিখিয়েছে বহু আগেই। শেষ উড়ালের বহু আগেই এর কপালে জুটেছে ‘মৃত্যু ফাঁদ’ নামের কলঙ্ক। বছরের পর বছরের ব্যবহারে অক্লান্ত ‘কর্ম ঘোড়া’র স্বীকৃতিও ছিল সর্বজনবিদিত। আর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরেই ছিল এর শেষ ঠাঁই। বিমানের প্রতীক বলাকা নিয়েই গত সপ্তাহে যাত্রীবাহী শেষ উড়াল ছিল এর। কিন্তু দুনিয়া ম্যাকডনেল ডগলাস ডিসি-১০ বিমানের কোন ইতিহাস, কোন

ছবিটা মনে রাখবে?
১৯৭১ সালে প্রথমবারের মতো যাত্রীসেবায় ডানা মেলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই ডিসি-১০ আকাশপথ ভ্রমণে আধুনিকতা আনার কৃতিত্বের দাবিদার অল্প কয়েকটি আকাশ কপোতের একটি। কিন্তু নকশায় ভয়াবহ ত্রুটি থাকায় এর শুরুর ইতিহাস মারাত্মক সব দুর্ঘটনায় ভরা।

নকশার ত্রুটি, ভয়াবহ দুর্ঘটনা

আকাশযাত্রা শুরুর মাত্র তিন বছরের মাথাতেই ১৯৭৪ সালে প্যারিস থেকে উড্ডয়নের ১০ মিনিট পরই বিধ্বস্ত হয়ে যায় টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ডিসি-১০। যাত্রী ও ক্রু মিলিয়ে এ দুর্ঘটনায় নিহত হন ৩৪৬ জন। এরপর ১৯৭৯ সালের ২৫ মে শিকাগো যাওয়ার পথে আমেরিকান এয়ারলাইনসের একটি ডিসি-১০ দুর্ঘটনায় ২৭১ জন নিহত হন। এর ছয় দিন পরই যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় উড্ডয়ন কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার প্রশ্নে সাময়িকভাবে এর উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করে। এ সময়ই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ম্যাকডনেল ডগলাস ডিসি-১০-এর নকশার ত্রুটি বুঝতে পারে এবং তা সারানোর উদ্যোগ নেয়। বাইরের দিকে খোলে কার্গোর এমন একটা দরজা ঠিকমতো লাগত না বিধায় কেবিন অংশে বায়ুর চাপের সমস্যা থেকেই এ দুর্ঘটনাগুলো ঘটে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
নকশার এ ত্রুটি সারিয়ে আকাশে ফিরে আসার পরও ডিসি-১০ আরও বড় বড় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ছিনতাই এবং সন্ত্রাসীদের বোমার কবলেও পড়েছে এটা। ১৯৮৯ সালে ফ্রান্সের একটি ডিসি-১০ সাহারা মরুভূমিতে সন্ত্রাসবাদী হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে ১৭০ জন নিহত হন। সবগুলোতেই প্রাণহানি না ঘটলেও সব মিলিয়ে ডিসি-১০ বিমান মোট ৫৩টি ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।

কিন্তু গত সপ্তাহ পর্যন্তও নিরলসভাবে যাত্রীবহন করে গেছে। মালামাল পরিবহনেও বহুল ব্যবহূত হয়েছে ডিসি-১০। আর আকাশে উড়ন্ত চক্ষু হাসপাতাল হিসেবে ‘অরবিস’ একটি ডিসি-১০ বিমানই বেছে নিয়েছিল। ডিসি-১০-এর সঙ্গে সঙ্গেই আকাশ থেকেও বিদায় নিল ব্যয়বহুল তিন ইঞ্জিনের বিমান।

বলাকার ডানায় শেষ উড়াল
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসই সর্বশেষ বিমান সংস্থা হিসেবে এত দিন পর্যন্ত ডিসি-১০ ব্যবহার করে আসছিল। ‘বিমান’-এর প্রতীক উড়ন্ত বলাকা নিয়েই গত বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে শেষবারের মতো যাত্রী নিয়ে উড়াল দেয় এই আকাশ কপোত। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ বিমানের বহরে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছিল ডিসি-১০ বিমান।

৪৩ বছর আগে ১৯৭১ সালের ৫ অগাস্ট আমেরিকান এয়ারলাইনসের একটি ডিসি-১০ লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে শিকাগোর উদ্দেশে প্রথমবারের মতো যাত্রী নিয়ে আকাশে উড়েছিল। আর ২০১৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যাত্রী নিয়ে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামের উদ্দেশে শেষ উড়াল দেয় কোনো ডিসি-১০। ৩১৪ আসনের জেট বিমানটিতে এই বিদায়ি ফ্লাইটে যাত্রী ছিল মাত্র ২২ জন।

’আকাশ কপোতকে শেষ বিদায়

ডিসি-১০-এর বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গেই অবসর নেবে এর বেশ কয়েকজন ক্রুও। ছবি: বিবিসিবিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ডিসি-১০-এর শেষ ফ্লাইটে ভ্রমণ করতে যুক্তরাজ্য থেকে ঢাকায় উড়ে এসেছিলেন বিমান বিলাসী ব্রিটিশ নাগরিক গর্ডন স্ট্রেচ। ডিসি-১০ দুর্ঘটনার কবলে পড়ার বিষয়টিতে এতো বড় করে দেখতে নারাজ বলে উল্লেখ করে বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘সব ধরনের বিমানেই বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে।
ডিসি-১০-এর শেষ ফ্লাইটের ইতিহাস চাক্ষুষ করতে বার্মিংহাম বিমানবন্দরে বেশ কিছু সংখ্যক উত্সাহী মানুষ জড়ো হয়েছিলেন ২০ ফেব্রুয়ারি। তাদেরই একজন হংকং এর ২১ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নিকোলাস চিউ। তিনি এডিনবরা থেকে বার্মিংহামে আসেন বিমানের শেষ ডিসি-১০ ফ্লাইটটি দেখতে। নিকোলাস বলছিলেন, ‘এটাই শেষ ফ্লাইট, এটা ঐতিহাসিক। আর আমি হংকংয়ে এই বিমানটিকে অনেক দেখেছি। কয়েক বছর আগে আমি শেষবারের মতো এতে ভ্রমণ করেছিলাম এবং একে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ আমি হারাতে চাইনি।’
এদিকে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেভিন স্টিলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ডিসি-১০-এর অবসর উপলক্ষে সারা দুনিয়ার আকাশভ্রমণ-পিয়াসিদের কাছ থেকে বিপুল সাড়া পাওয়া গেছে। তাই ঢাকা-বার্মিংহাম ফ্লাইটের পর ২২, ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি বার্মিংহাম বিমানবন্দর থেকে দর্শনার্থীদের নিয়ে এক ঘণ্টার তিনটি ‘প্রমোদ উড়ালে’ যায় বিমানের ডিসি-১০।

জাদুঘরে ঠাঁই নাই, গন্তব্য ভাগাড়ে!

বিমানের শেষ যাত্রীবাহী ডিসি-১০ বার্মিংহামে অবতরণের পর যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল জাদুঘরে রেখে দেওয়ার জন্য। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে ‘মিউজিয়াম অব ফ্লাইট’-এ রেখে দেওয়া হবে শেষ এই ডিসি-১০টি। কিন্তু স্থান সংকুলান না হওয়ার কথা জানিয়ে জাদুঘরটি তা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। বিমান কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমকে জানিয়েছে, পরে যুক্তরাজ্যের ‘ব্রান্টিংথর্প অ্যারোড্রম’ জাদুঘরে তা রাখার বিষয়ে কথাবার্তা হয়। কিন্তু অবশেষে ওই জাদুঘরটিও জানায় জায়গার অভাবেই ঐতিহাসিক এই ডিসি-১০টি রাখতে পারছে না তারাও।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ২৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম থেকেই ঢাকায় ফিরে আসছে বিমানের এই ডিসি-১০। ঢাকায় একে সস্তায় ভেঙে ফেলা হবে এবং বিক্রি করে দেওয়া হবে এর কল-কবজা-লোহালক্কড়।

 এক নজরে ডিসি-১০-এর ইতিহাস

১৯৭১—আকাশপথ সেবায় যুক্ত হয় ডিসি-১০ বিমান।
১৯৭২—জুন মাসে ডেট্রয়েটের কাছে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয়। কার্গোর দরজায় ত্রুটির কারণে কেবিনে বায়ুর চাপের বিষয়টি ধরা পড়ে।
১৯৭৪—মার্চ মাসে টার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ডিসি-১০ প্যারিস থেকে উড্ডয়নের ১০ মিনিট পরই বিধ্বস্ত হয়। নিহত হন ৩৪৬ জন।
১৯৭৯—মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আমেরিকান এয়ারলাইনসের একটি ডিসি-১০ বিধ্বস্ত হয়ে ২৭১ জন নিহত হন।
১৯৭৯—জুনের ৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় উড্ডয়ন কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে ডিসি-১০-এর উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করে।
১৯৭৯—জুলাইয়ের ১৩ তারিখে নকশার কিছু ত্রুটি সারানোর পর আবার আকাশে ফিরে আসে ডিসি-১০।
১৯৯০—ম্যাকডনেল-ডগলাস ডিসি-১০-এর স্থলাভিষিক্ত করতে এমডি-১১ বিমান বাজারে ছাড়ে।
২০১৪—বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ডিসি-১০ বিমান বন্ধের ঘোষণা দেয়। ২০ ফেব্রুয়ারি এর শেষ ফ্লাইট ঢাকা থেকে বার্মিংহামে যায়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসই সর্বশেষ বাণিজ্যিকভাবে ডিসি-১০ ব্যবহার করছিল। ছবি: বিবিসিঅনেকেই মনে করেন বেশি যাত্রী নিয়ে আকাশপথে দূর যাত্রার ভ্রমণের পথ করে দিয়েছিল ডিসি-১০। নকশা ভেদে ২৫০ থেকে ৩৮০ জন যাত্রী নিয়ে ভ্রমণ করতে পারতো ডিসি-১০ বিমানগুলো। হালের উচ্চপ্রযুক্তির নকশায় নানা সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ফ্লাইটগুলোর সঙ্গে তুলনায় একে নিতান্তই সাবেকি মনে হলেও এর শুরুর ইতিহাসটা ছিল প্রায় বিপরীত। চার দশকেরও বেশি আগে আরামদায়ক যাত্রা এবং আকাশপথে বিলাসী ভ্রমণের আয়োজন নিয়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল ডিসি-১০। যেভাবেই হোক বাংলাদেশ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের নামটিও থেকে গেল ডিসি-১০-এর ইতিহাসের সঙ্গে। ‘বিমানে’র বহর থেকে আগেই মাটিতে থাকা আরেকটি ডিসি-১০-এর সঙ্গে শেষ উড়াল দেওয়া এই ডিসি-১০টিও ভেঙে ফেলা হবে শিগগির। আমরা এই ইতিহাসের এই স্মারক ধরে রাখতে না পারলেও এর ইতিহাস থেকে যাবে ‘বলাকা’র ডানাতেই।

 

 

 

Last modified on Monday, 10 March 2014 01:48