ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

‘মানচিত্রের পরপারে মানুষের মুখচ্ছবি’

Rate this item
(0 votes)

মানচিত্র আর সীমানার বেড়াজালে মানুষের পরিচয় নির্দিষ্ট হয় বটে, কিন্তু জীবন সেখানেই থেমে থাকে না। তবু অনেকেই অস্তিত্ব রক্ষায় বাধ্য হন হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে সীমানা পেরোতে। কিন্তু সীমানা পেরোলেই কি সব সময় বদলে যায় জীবনের সংগ্রাম। ইতিহাস তা বলছে না। সাম্প্রতিক দুনিয়ায় এখন তেমনি সীমানা পেরোনো মানুষের নাম ‘রোহিঙ্গা’। মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হওয়া এই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অন্যতম আশ্রয়স্থল বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশ ছাড়াও মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, যুক্তরাজ্যসহ নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে তারা। দেশে দেশে রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু জীবনের সংগ্রাম আর তাদের

হাসি-কান্নার ছবি নিয়ে আগামীকাল একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়।

আলোকচিত্রী সাইফুল হক অমি বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ওপর কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে চলেছেন। রাজনৈতিক এবং জাতিগত সহিংসতায় নিজ দেশ মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়া এসব মানুষের জীবনের গল্প আর অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম ফুটে উঠেছে তাঁর ছবিতে। তিনটি দেশে রোহিঙ্গাদের ওপর এই আলোকচিত্রীর নির্বাচিত ৩০টি ছবি নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে এ প্রদর্শনীর। ‘দ্য ডিজওনড অ্যান্ড দ্য ডিনাইড’ শিরোনামে ‘দুনিয়াজুড়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের’ ছবি নিয়ে ধানমন্ডির ঢাকা আর্ট সেন্টারে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হবে আগামীকাল সোমবার। 

তৈয়্যবা বেগম নিজের মেয়েকে ওর সত্বাবার যৌনবিকৃতি থেকে বাঁচাতে বহু চেষ্টা করেছেন। ১২ বছর বয়সী মেয়েটিকে ধর্ষণের কয়েকটি চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে প্রতিশোধ নেন আবুল খায়ের নামে তৈয়্যবার দ্বিতীয় স্বামী। তৈয়্যবাকে ছুরিকাঘাত করেন খায়ের। শরীরে সাতটি আঘাত নিয়ে এই ছবি তোলার কিছুদিন পরই ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যান তৈয়্যবা। আলোকচিত্র: সাইফুল হক অমি।প্রদর্শনীর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সংকট ও জীবন বাস্তবতার নানা দিক নিয়ে চারজন নির্ধারিত আলোচকের একটি ‘উন্মুক্ত আলোচনাও’ অনুষ্ঠিত হবে উদ্বোধনী দিনে। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে ঢাকা আর্ট সেন্টারের মিলনায়তনে এ আলোচনায় অংশ নেবেন ‘দ্য ইকুয়্যাল রাইটস ট্রাস্ট’-এর দিমিত্রিনা পেত্রোভা, পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের সদস্য অধ্যাপক স্বপন আদনান, বাংলাদেশে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক কমিশনের (ইউএনএইচসিআর) প্রতিনিধি স্টিনা লুংডেল এবং আলোকচিত্রী সাইফুল হক অমি।

প্রদর্শনী সম্পর্কে আলোকচিত্রী সাইফুল হক অমি বলেন, ‘আসলে মানচিত্র মানুষের পরিচয় নির্দিষ্ট করে বটে কিন্তু সারা দুনিয়ায় মানুষের অভিন্ন অনেক সংকট আছে। আবার এই রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক মানচিত্রও অনেক সংকটের জন্ম দেয়। ফলে আমরা যখন মানুষের সংকটকে একটা মানচিত্রের সীমারেখায় চিন্তা করি, তখন তার পুরো চেহারা আমরা দেখতে পাই না। মানচিত্রের পরপারে মানুষের মুখের ছবিটা ধরতে চেষ্টা করেছি এই প্রদর্শনীর ছবিগুলোতে।’

অমি আরও বলেন, ‘বিশেষত রোহিঙ্গাদের প্রশ্নে আমি এটা বলতে চাই যে, জাতি-রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। একই সঙ্গে নৃতাত্ত্বিক ও জাতিগত বা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে ভয় পাওয়া, বৈচিত্র্যকে ধারণ করতে না পারা এমন সংকটের সৃষ্টি করেছে।’

রোহিঙ্গাদের নিয়ে কেন কাজ করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে এই আলোকচিত্রী বলেন, ‘প্রথমত আমি মনে করি এটা আমার সময়ে ঘটতে থাকা দুনিয়ার খুবই বড় একটা মানবিক সংকট। জাতিসংঘ বলছে, বর্তমান সময়ে দুনিয়ার সবচেয়ে নিপীড়িত মানুষ রোহিঙ্গারা। আর আমি মনে করি এটা কোনোভাবেই শুধু রোহিঙ্গাদের একার সংকট নয়, এটা আমাদের সবার সংকট। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গারা নিজেরা অবশ্যই এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার, কিন্তু তারপরও এই সংকটের বড় শিকার আমার দেশ বাংলাদেশ। তাই আমি দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয় নিয়ে কাজ করছি এবং সংকটটা বোঝার চেষ্টা করছি, ছবি তুলছি এবং নানান দেশে সেই ছবি দেখাচ্ছি।’

যুক্তরাজ্যভিত্তিক উন্নয়ন সংস্থা দ্য ইকুয়্যাল রাইটস ট্রাস্ট এবং থাইল্যান্ডের মাহিদল ইউনিভার্সিটি যৌথভাবে এই আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনার আয়োজন করেছে। আলোচনাসভাটি আয়োজনে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
ধানমন্ডির ৭/এ সড়কের ৬০ নম্বর বাড়িতে ঢাকা আর্ট সেন্টারে ২৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টায় তিন দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীর উদ্বোধন হবে, চলবে ওই দিন রাত নয়টা পর্যন্ত। ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি বেলা তিনটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

যুক্তরাজ্যের ব্রাডফোর্ডে এক রোহিঙ্গা নারীর সঙ্গে এক বাংলাদেশির বিয়ে। বাংলাদেশি পুরুষটি সেখানে অবৈধ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন বলে জানা যায়। এই রোহিঙ্গা নারীকে বিয়ের মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাসের একটি আইনি বৈধতা পান। তবে, এই বিয়ে টিকবে কি না, তা নিয়ে খুবই সংশয় দেখা গিয়েছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে। আলোকচিত্র: সাইফুল হক অমি।

এক নজরে সাইফুল হক অমি

১৯৮০ সালের ১৫ এপ্রিল ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই স্নাতক আলোকচিত্র বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন রাজধানীর ‘পাঠশালা’-সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট থেকে। পরে একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘদিন।

২০০৬ সালে আলোকচিত্রে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরুর বছরই ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ‘অল রোডস’ পুরস্কার লাভ করেন মেধাবী এই আলোকচিত্রী। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। তাঁর পাওয়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার ও গ্রান্টসের মধ্যে রয়েছে ২০১০ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটোর ‘জুপস সোয়ার্ট মাস্টার ক্লাস’। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ শুরুর পরপরই এজন্য ২০১০ ও ২০১১ সালে পরপর দুবার দুনিয়াখ্যাত আলোকচিত্র সংস্থা ম্যাগনামের ‘ম্যাগনাম ফাউন্ডেশন ইমার্জেন্সি ফান্ড’ জেতেন তিনি।

ইতিমধ্যেই দেশে-বিদেশে বহু প্রতিষ্ঠানে আলোকচিত্র নিয়ে পাঠদান করেছেন এবং কর্মশালা করিয়েছেন এই আলোকচিত্রী। অতিথি শিক্ষক হিসেবে পড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস, ডেনিশ স্কুল অব ফটোজার্নালিজম এবং পাকিস্তানের বিকন হাউসে। তাঁর কাজের প্রদর্শনী হয়েছে পৃথিবীর ২৩টি দেশে।

ছাত্রজীবন থেকেই সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত উদ্যমী এই সংগঠক ২০১২ সালে খ্যাতনামা দুই তরুণ আলোকচিত্রী এন্ড্রু বিরাজ ও দ্বীন মোহাম্মদ শিবলীকে সঙ্গে নিয়ে আলোকচিত্র শিক্ষার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘কাউন্টার ফটো’ গড়ে তোলার কাজে হাত দেন। এখন ঢাকার মিরপুর ও উত্তরায় দুটি ক্যাম্পাস পরিচালনাকারী কাউন্টার ফটোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল হক অমি। এ ছাড়া ‘কাউন্টার ফটো’ নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেন তিনি।

 

 

 

Last modified on Monday, 10 March 2014 01:49