ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

কুকুর ও মানুষের যোগসূত্র আবেগে

Rate this item
(0 votes)

প্রাণীকুলের মধ্যে কুকুরের সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক সুদূর অতীত থেকেই বহমান। বিশ্বস্ত ও অনুগত হিসেবে কুকুরের যেমন সুখ্যাতি আছে, তেমনি পোষা কুকুরের প্রতি মানুষের ভালোবাসার নজিরও অনেক। আর অনেকেই বলেন যে, পোষা কুকুরটি তাঁকে খুব ভালোই বোঝেন। কুকুরের মস্তিষ্কের ‘এমআরআই স্ক্যান’ করে পরিচালিত নতুন এক গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা বলছেন, পোষা কুকুরের মালিকদের এ দাবির বৈজ্ঞানিক সত্যতা

আছে। বিবিসি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন, কারও কণ্ঠস্বর শুনে মানুষের মস্তিষ্ক যেভাবে প্রতিক্রিয়া করে, কুকুরের মস্তিষ্কও প্রায় একই রকম প্রতিক্রিয়া করে। বিশেষত আবেগ অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ থাকে এমন শব্দে—হাসি, কান্না বা চিত্কার শুনে মানুষের মস্তিষ্ক আর কুকুরের মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়াও হয় প্রায় একই রকম।

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘কারেন্ট বায়োলজি’তে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে হাঙ্গেরির ইয়োতোভাস লোরনার্ড ইউনিভার্সিটির অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের গবেষকেরা জানিয়েছেন, সম্ভবত এটাই মানুষের সঙ্গে কুকুরের আবেগীয় সম্পর্কের যোগসূত্র। গবেষণাপত্রটির প্রধান লেখক আত্তিলা অ্যানডিক্স জানিয়েছেন, ‘আমরা মনে করছি আবেগের তথ্যাদি প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষেত্রে কুকুর ও মানুষের মস্তিষ্ক একই রকম পদ্ধতি অনুসরণ করে।’

এ গবেষণার জন্য ১১টি পোষা কুকুরকে প্রশিক্ষণ দেন বিজ্ঞানীরা। বেশ কিছুদিন ধরে বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনা দিয়ে কুকুরগুলোকে এমআরআই স্ক্যানিংয়ের জন্য প্রস্তুত করা হয়। ১২টি সেশনে প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণের পর স্ক্যানার কক্ষে আরও সাতটি সেশনে কুকুরগুলোকে অভ্যস্ত করানো হয়। এভাবে লাগাতর প্রশিক্ষণের পরই কুকুরগুলো প্রায় ৮ মিনিট পর্যন্ত নড়াচড়া না করে স্ক্যানার যন্ত্রের ভেতরে শুয়ে থাকতে সক্ষম হয়। আর এই গবেষণায় তুলনা করার জন্য ২২ জন মানুষও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ওই একই এমআরআই স্ক্যানার মেশিনে নিজেদের মস্তিষ্ক পরীক্ষার সুযোগ দিয়ে সহায়তা করেন বিজ্ঞানীদের।এমআরআই স্ক্যান পরীক্ষায় অংশ নেয় এইসব পোষা কুকুর। ছবি: বিবিসি।

পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী মানুষ ও কুকুরগুলোকে বিভিন্ন ধরনের ২০০ শব্দ শোনানো হয়। গাড়ির হর্ন এবং হুইসেলের শব্দের মতো নানা পরিবেশের বিভিন্ন শব্দ এবং মানুষ ও কুকুরের কণ্ঠস্বরও শোনানো হয়। তবে মানুষের হাসি-কান্নাসহ নানা আবেগীয় শব্দ শোনানো হলেও কোনো কথাবার্তা শোনানো হয়নি এই পরীক্ষায়।

গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, মানুষের শব্দ শুনে মানুষ ও কুকুরের মস্তিষ্কের প্রায় একই রকম একটি স্থান সক্রিয় হয়ে ওঠে। উভয়েরই মস্তিষ্কের একেবারে সামনের দিককার (টেমপোরাল লোব) একেবারে সামনের অংশে (টেমপোরাল পোল) প্রতিক্রিয়া শুরু হয় এমন শব্দে। বিষয়টি ব্যাখ্যা করে আত্তিলা অ্যানডিক্স বলেন, ‘আমরা জানি যে, অন্য যেকোনো শব্দের চেয়ে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনলে মানুষের মস্তিষ্কের একটি বিশেষ এলাকা সচকিত হয়ে ওঠে। আর আমরা দেখতে পেয়েছি যে, মানুষের কণ্ঠ শুনে কুকুরের মস্তিষ্কের যে অংশে সক্রিয়তা শুরু হয়, তার অবস্থানও মানুষের মস্তিষ্কের ওই বিশেষ এলাকার মতোই। আসল কথা হচ্ছে, কুকুরের মস্তিষ্কে এমন একটি এলাকার অবস্থান খুঁজে পাওয়াটাই ছিল বিস্ময়কর। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে এই প্রথমবারের মতো এটা লক্ষ করা গেল।’

মানুষের কণ্ঠের মতোই আবেগ-অনুভূতিময় শব্দ—হাসি, কান্না ও চিত্কার চেঁচামেচি এবং কুকুরের উত্তেজিত চিত্কারের শব্দেও মস্তিষ্কের একই রকম বিশেষ জায়গায় (প্রাইমারি অডিটরি কর্টেক্স) সক্রিয়তা তৈরি হয় মানুষ ও কুকুরের। হাঙ্গেরির এই গবেষক দলটির প্রধান বলেন, এটা সবারই জানা ছিল যে, কুকুরেরা তার মালিকের আবেগ অনুভূতি বুঝতে পারে এবং পোষা কুকুরের প্রতি নিবেদিত মানুষেরাও কুকুরের আবেগের প্রতি সচেতন থাকেন। এ গবেষণা থেকে এটা বোঝার পথ তৈরি হচ্ছে যে, বিষয়টা কীভাবে ঘটে।

গবেষণাটি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক সোফি স্কট বলেছেন, ‘স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে এমন কিছু খুঁজে পাওয়াটা খুব একটা আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছু না। তবে কুকুরের মধ্যে এটার প্রভাব দেখতে পারাটা খুবই দারুণ।’

অধ্যাপক স্কট আরও জানান, কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুরেরা মানুষের কথাবার্তার অনেক শব্দই বোঝে এবং অনেক ক্ষেত্রে একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে মানুষের অভিপ্রায় এবং আপাত লক্ষ্যও টের পায়। তাই শুধু কণ্ঠস্বর বা অন্য শব্দ নয়, কথাবার্তার বিষয়ে কুকুরে প্রতিক্রিয়া কী হয়, তা নিয়ে পরীক্ষা করতে পারলে বিষয়টি চমকপ্রদ হতে পারে।

 

 

 

 

Last modified on Monday, 10 March 2014 01:49