ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

পড়া চাই নানা বই

Rate this item
(0 votes)

লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে। কিন্তু সেটা কি কেবল পাঠ্যবই পড়লেই হবে? পাঠ্যবইয়ের বাইরেও চাই বহুমাত্রিক পড়াশোনা। আর সেটা হতে পারে বাংলা বা ইংরেজিসহ যেকোনো ভাষার বই যেকোনো বিষয়ে। আসলে এ যুগে সমাজে টিকে থাকার অন্যতম উপায় হলো তথ্য বা ইনফরমেশনকে নিজের মুষ্টিগত করে ফেলা। যে যত বেশি পড়ে, সে তত বেশি জানে।
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী আমাদের দেশে ছেলেমেয়েরা তাদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে বই পড়ার তেমন সুযোগ পায় না বললেই চলে। প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়, স্কুলের সময়ের বাইরে গৃহশিক্ষকের হ্যাপা

সামলিয়ে বাড়তি পাঠের জন্য সময় নেই। কিন্তু একুশ শতক পাঠ্যবইয়ের শিক্ষাকে বাস্তবজীবনের জ্ঞানের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলে। এই সমন্বয়টা অনেকখানি পোক্ত হয়, যখন আমরা পাঠ্যবইয়ের বাইরের শিক্ষাকে আমলে নিই। আসলে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই ছেলেমেয়েদের মনে একটা নতুন জগতের দরজা খুলে দেয়।
পাঠ্যবইয়ের বাইরে পড়ার অনভ্যাসের চিত্র আমাদের দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেকখানি একই রকম। তবে বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমের অবস্থাটা একটু ভিন্ন। কারণ, ইংরেজি ভাষাটা তাদের দখলে থাকলেও বাংলা ভাষায় তারা অনর্গল পড়তে বা লিখতে পারে না। সে ক্ষেত্রে বাংলা ভাষায় লেখা বইগুলো তাদের তেমন পড়া হয়ে ওঠে না! তার পরও এ কথা সত্য যে ইংরেজি ভাষার বইও ছেলেমেয়েরা নিয়মিত পড়ে না। ঢাকা শহরের স্বনামধন্য স্কুলের একজন শিক্ষক মন্তব্য করেছেন, স্কুলের পড়াশোনার এত চাপ, ছুটি ছাড়া বাইরের বই পড়ার আসলে তেমন সুযোগ নেই। তাই এ অবস্থার পরিবর্তনে অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
বই পড়াটা আসলে অভ্যাসের বিষয়। ছোটবেলা থেকেই ছেলেমেয়েদের হাতে বই তুলে দিতে পারলে অভ্যাসটা তৈরি হয় খুব সহজেই। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের বইমেলায় নিয়ে যেতে পারেন। নিয়ে যেতে পারেন বিভিন্ন পাঠাগারে। আমার মনে আছে, ছেলেবেলায় একটা রচনা লেখা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করানোর জন্য আমার মা আমাকে পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়ে গিয়েছিলেন, তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। আমার মনে আছে, নির্ধারিত বিষয়ে লেখার জন্য কত বই যে ঘেঁটেছি! এর ফলে যেটা হয়েছে, বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে, একই বিষয়ে অনেক জানায় হয়েছিলাম তৃষিত। কিন্তু এমন অনুধাবন অবশ্য সময়ের ব্যাপার। এক দিনের বইমেলায় যাত্রা আর কালেভদ্রে পাঠাগারে ঢুঁ মারাটা অভ্যাস তৈরির জন্য এক আকাশকুসুম ভাবনা। তাই চাই পাঠের নিয়মিত চর্চা। এ ক্ষেত্রে স্কুলের শিক্ষকেরাও একটা বড় রকমের অবদান রাখতে পারেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে চিনি, যিনি তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স শেষে ছেলেমেয়েদের ফলাফল দেখে বই উপহার দিয়ে থাকেন। এমনটা স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরা তাঁদের নিজ প্রতিষ্ঠানের ছেলেমেয়েদের জন্য করতে পারেন। এ ছাড়া তাঁরা তাদের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়া কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্যও উৎসাহিত করতে পারেন। আর ক্লাসে পড়ানোর সময় বিভিন্ন বইয়ের উদ্ধৃতি দেওয়াটাও ভালো প্রভাব পড়বে। বাস্তবজীবনের প্রেক্ষাপট সামনে রেখে পড়ালে পাঠের বিষয়গুলো আরও উপজীব্য হয়ে ওঠে, এই ধারণাটাও শিক্ষকদের মধ্যে তৈরি হওয়া চাই। শিক্ষা মানেই যে সনদপত্র নয়, শিক্ষা মানে একটা সুন্দর জীবন, যে জীবন পরিচালনায় কখনোই কেবল পাঠ্যবই এককভাবে আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, এই বোধটাকে জাগ্রত করতে হবে।
আসলে সামাজিক দায়টা আমাদের সবার। বাড়িতে অভিভাবক আর স্কুলে শিক্ষক—এই দুইয়ের চেষ্টার সম্মিলন না ঘটলে পাঠ্যবইয়ের বাইরে পাঠের অভ্যাস তৈরিটা স্বপ্ন হয়েই রয়ে যাবে। তাই সবাই চলুন বই পড়ি, দেশ গড়ি। আর একুশ শতকের চাহিদার আদলে নিজেদের গড়ে তুলি বহুমাত্রিক রূপে।