ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

‘ওই আকাশটাকে দেখো, টিভি দেখো না’

Rate this item
(0 votes)

ভরসন্ধ্যাতেই শিশুর বায়না টেলিভিশনে কার্টুন দেখবে, মায়ের কড়া নির্দেশ, স্কুলের ‘বাড়ির কাজ’ শেষ করে তারপর টিভি দেখা। এই ফাঁকে মা হয়তো দেখে নিচ্ছেন প্রিয় সিরিয়াল। তারপর কেবলই হয়তো সন্তান টেলিভিশনের সামনে বসেছে, এরই মধ্যে বাইরে থেকে ফিরে বাবা টিভির সামনে, একের পর এক চ্যানেল পাল্টে সংবাদ দেখা। শিশুকে বোঝানো হচ্ছে, কার্টুন পরে দেখো ‘সংবাদটা শেষ হোক বাবা’।পরিবারে টেলিভিশন দেখা নিয়ে এ দৃশ্য নতুন কিছু নয়। বাড়ির তিন সদস্যের চাহিদা আর পছন্দও তিন ধরনের। টেলিভিশন মাত্র একটি। রাতের এই সময়টাতেই সুযোগ হয় সবার

একসঙ্গে টেলিভিশন দেখার। প্রত্যেক সদস্যের জন্য আলাদা আলাদা সময় ও অনুষ্ঠান মেলানোও কঠিন। আবার যদি সবাই একসঙ্গে বসে একই অনুষ্ঠান দেখে, সেখানেও অনেক সময় নানা বিড়ম্বনা। আধুনিক জীবনে অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা টেলিভিশন তাহলে কীভাবে শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য সহায়ক হতে পারে? মা-বাবা হিসেবে আপনার ভূমিকাই বা কী হবে? তা নিয়ে কথাবার্তা গবেষণার অন্ত নেই যেন।
নাগালের বাইরে
ঘরের টেলিভিশনটি যেহেতু শিশুর নাগালের বাইরে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য চেষ্টা করতে হবে টিভি আলাদা রুমে রাখার। কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে পারলে ভালো হয়, যাতে শিশুটি অনুধাবন করে এটি সব সময় চালু করার যন্ত্র নয়। অনেকেই খাবার টেবিলে বসলেও টিভি চালু রাখেন। দেখার তেমন কিছু না থাকলে টেলিভিশন বন্ধই রাখুন। একাধারে টেলিভিশন চলতে থাকলে শিশুটি দেখুক আর না-ই দেখুক, তার মানসিক বিকাশে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দৈনন্দিন অভ্যাসে দেখা দিতে পারে নানা অস্বাভাবিকতা। মনোযোগের অভাব, দিনের বেলায় নিদ্রাচ্ছন্ন ভাব, রাতে দেরিতে ঘুমানোর সমস্যা, এমনকি খাওয়ার ব্যাপারেও আসতে পারে অনীহা।
আসক্তিতেই সমস্যা
টিভি দেখতে না দিলে বাচ্চা খেতেই চায় না। এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। এভাবেই শিশুর এই অভ্যাস একসময় নির্ভরতা বা আসক্তির পর্যায়ে চলে যায়। এ আসক্তি হতে পারে বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান বা চ্যানেলের প্রতি। অনেক সময় বাচ্চারা গান ও নাচের তালে হেলেদুলে খায়। যে কারণেই হোক, আসক্তির বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আট বছরের নিচের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে কোনোক্রমেই টেলিভিশন দেখার পরিমাণ দিনে দুই ঘণ্টার বেশি হওয়া উচিত নয়।
সজাগ থাকুন, কথা বলুন
শিশুটি টিভিতে কী দেখছে বা কতক্ষণ দেখছে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। যতটা সম্ভব তার সঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখতে হবে। সে কী পছন্দ করে, কেন করে, তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তাকে বলতে দিতে হবে। তাহলে শিশু উপলব্ধি করবে ছোট হলেও তার মতামতকে বড়রা গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে তার বিশ্লেষণ ক্ষমতাও বাড়বে। টিভিতে একটা কিছু দেখার পর কী ভালো লাগল, তা জানতে চান? কেন ভালো লাগল, তা বলতে বলুন। এভাবে শিশুর সঙ্গে অনুষ্ঠান নিয়ে সহজভাবে কথা বলতে হবে। শিক্ষণীয় বিষয়গুলো ধরিয়ে দিতে হবে। তা না হলে হয়তো বিজ্ঞাপনের ধারণা বা কোনো অনুষ্ঠানের কাহিনির নেতিবাচক দিকটিই দাগ ফেলে দেবে শিশুর কোমল মনে। সংবাদে সহিংসতার প্রতিবেদন, সিনেমার ভয়াবহ দৃশ্য, মারধর বা সিরিয়ালের সাংসারিক মারপ্যাঁচ সন্তানের মানসিকতা ও ভাবনার জগেক গভীরভাবে আলোড়িত করতে পারে। তাই এসব অনুষ্ঠান দেখা থেকে শিশুতে বিরত রাখার চেষ্টা করুন।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট’ তাদের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যেসব শিশু নিয়মিত সংঘর্ষ, সহিংসতা বা ভয়ংকর দৃশ্য দেখে, তাদের মধ্যে তিন ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়—অন্যকে ব্যথা দেওয়ার ব্যাপারে অনুভূতি কমে যাওয়া, চারিদিকের পরিবেশ নিয়ে এক ধরনের শঙ্কা সৃষ্টি হওয়া এবং আক্রমণাত্মক মনোভাব তৈরি হওয়া।
শিশুর বিনোদনের জগৎ
শিশুবিষয়ক বিখ্যাত সাময়িকী ‘পেডিয়াট্রিকস’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, শিশুরা নির্মল আনন্দের কোনো অনুষ্ঠান দেখলে তাদের ব্যবহার ভালো হয়। আমাদের দেশের টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা বাড়লেও শিশুদের জন্য অনুষ্ঠান একবারে হাতে গোনা। বাংলাদেশ টেলিভিশনের সিসিমপুর, মনের কথা, আর কিছু বিদেশি কার্টুনই ভরসা। সেজন্য বিভিন্ন আঙ্গিকে সাজাতে হবে শিশুদের বিনোদনের জগত্।
শিশুকে শুধু বললে হবে না যে, ‘ওই আকাশটাকে দেখো, টিভি দেখো না।’ টেলিভিশনের ওপর শিশুর নির্ভরতা কমাতে শিশুর বিনোদনে আনতে হবে বৈচিত্র্য। তাকে নানা ধরনের খেলায়, কাজে মনোনিবেশ করার সুযোগ করে দিতে হবে। যাতে সে ধীরে ধীরে নিজের একটা বিনোদনের জগত্ তৈরি করে নিতে পারে। সময় সুযোগ করে বাইরে বেড়ানোর অভ্যাস তৈরি করতে হবে। এতে যেমন টেলিভিশন-নির্ভরতা কমবে, তেমনি বাইরের প্রকৃত জগত্ সম্পর্কেও শিশুরা ধারণা পাবে, কৌতূহলী হয়ে উঠবে।