ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 18:25

জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন

Rate this item
(0 votes)

আর কত দিন বাঁচবে আমাদের বাংলাদেশ?

আর কত দিন বাঁচবে বাংলাদেশ? কত দিন আর টিকে থাকবে পৃথিবীর মানচিত্রে পলিমাটির ছোট্ট সবুজ দেশটি? রাজনৈতিক দাঙ্গা-হাঙ্গামা আর অবিরাম হরতালের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের বেঁচে থাকা নিয়ে যেখানে আমাদের মাথাব্যথা নেই, সেখানে দেশের বাঁচা-মরা নিয়ে ভাবনাকে বরং বাড়াবাড়িই মনে হতে পারে।



গত ১১ থেকে ২২ নভেম্বর পোলান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা পরিবেশসচিব শফিকুল ইসলাম পাটোয়ারী বাংলাদেশের বেঁচে থাকার আশঙ্কাকে অমূলক বলে উড়িয়ে দিলেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক বেঁচে থাকা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সম্মেলনে যে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন, তা এককথায় আঁতকে ওঠার মতো। জাতিসংঘের মতে, শিল্পোন্নত দেশের কারখানা থেকে উৎপাদিত হওয়া গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে চলেছে, যার ফলে বেড়ে চলছে হিংস্র ঘূর্ণিঝড়, উঁচু হচ্ছে সমুদ্রের জলের স্তর। আর এই জলের স্তর আরো বাড়লে দুর্ভাগা বাংলাদেশই হবে প্রথম শিকার। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, জলের স্তর বাড়লে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্ধেক তলিয়ে যাবে সমুদ্রে। আর একুশ শতকের শেষ নাগাদ হয়তো ডুবে যাবে সমগ্র বাংলাদেশ, কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারাবে, দেশহীন উদ্বাস্তু হবে বাংলাদেশিরা।

বিজ্ঞানীদের এসব সাবধানবাণী ও আশঙ্কা থেকে আঁচ করা যায়, কত বড় সংকটের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। অথচ এ নিয়ে একটুও আগ্রহ নেই সারা দেশে, কোথাও এতটুকু হাহাকার নেই। বরং খবরটা চেপে রাখার চেষ্টা চারদিকে। নির্বাচন আর হরতাল ছাড়া যেন বাংলাদেশে আর কোনো সমস্যাই নেই। বাইশ শতকে বাংলাদেশ নামে কোনো দেশ থাকবে না, বাঙালি হয়ে উঠবে রোহিঙ্গাদের মতো উদ্বাস্তু। দেশ থেকে দেশে দেশান্তরী হবে তারা- এ রকম একটি ভয়াবহ চিত্র বিজ্ঞানীরা তুলে ধরার পরও বাংলাদেশকে বাঁচানোর জন্য যেন কেউ নেই। সংবাদপত্রগুলো ঠিক সে রকম সরব নয়। সরকারেরও এ বিষয়ে বিশেষ ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। জনগণও এখন নিজের জীবন বাঁচানো ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারছে না। অথচ কত বড় মহাপ্রলয় আর অনিশ্চয়তা যে বাংলাদেশের কপালে লেখা হয়ে গেছে, সে বিষয়ে কারো যেন কিছু করার নেই। পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বাংলাদেশের বিলুপ্তির জন্য কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করার আর দরকার নেই- এ রকম আশঙ্কা আর বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণীর পরও বাংলাদেশের বিলুপ্তির আশঙ্কাকে বাংলাদেশ সরকারও যেন স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছে।

গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে বাংলাদেশ যে ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হচ্ছে, এ বিষয়ে বাংলাদেশের নিজের কোনো দোষ নেই; বরং সবচেয়ে বেশি দোষ শিল্পোন্নত দেশগুলোর। তাই জাতিসংঘ জলবায়ু তহবিল বাংলাদেশকে একটি বড় তহবিল দিচ্ছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবর থেকে দেখা যাচ্ছে, আমাদের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এই তহবিলকে উৎসবের উপলক্ষ হিসেবে নিয়েছে। তহবিলের এই টাকা নয়ছয় করে বিলিবণ্টনের একটি তালিকার কথা ইতিমধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

বিবিসি বলছে, সাগরের জল ২০৫০ সালের মধ্যে এক মিটার বাড়লে বাংলাদেশের তিন কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হবে। তলিয়ে যাবে বহু ফসলি জমি, সমুদ্র গ্রাস করে নেবে প্রচুর সমভূমি। এ ছাড়া যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে সেগুলো হচ্ছে- ১. ছয় ঋতু ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। গ্রীষ্ম আর বর্ষা দীর্ঘায়িত হবে। শরৎ ও বসন্ত একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ২. আষাঢ় ও শ্রাবণের বর্ষাকাল প্রলম্বিত হয়ে 'বন্যাকাল' নেমে আসবে। ৩. জলবায়ুর পরিবর্তনে বৃষ্টি-স্বভাবেও পরিবর্তন আসবে। ফলে ফসল উৎপাদন অনিয়মিত হয়ে পড়বে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ফসল উৎপাদন কমে যাবে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত। ৪. সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও খুলনার সমুদ্র উপকূল প্রথম ক্ষতির শিকার হবে। ৫. যদি পানির স্তর এক মিটার বাড়ে তাহলে সুন্দরবনের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। ৬. বাংলাদেশের মৎস্যশিল্প ভয়াবহ বিপন্ন হবে। ৭. ভূমি হারানো উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যা বাড়বে, যা দেশের আর্থসামাজিক কাঠামোয় এক বিরাট পারবর্তন আনবে। ৮. সমুদ্রসীমা বিস্তৃত হলে সুপেয় পানির সংকট দেখা দেবে। কিন্তু এসব বিষয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কোনো জনসচেতনতামূলক ভাবনার কথা আজও জানা যায়নি। দুর্যোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার কোনো প্রস্তুতি তাদের নেই। দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণে কিছু এনজিওকে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব দিয়েই বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে। অথচ ছোট দ্বীপদেশ মালদ্বীপও আমাদের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান শিকার হবে এবং তারা শুধু তাদের দেশের পরিবেশ রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে না, বরং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ফিজির পার্শ্ববর্তী একটি দ্বীপ কিনছে।

মানুষ নানাভাবে হতভাগ্য হতে পারে জীবনে। তবে যার দেশ নেই, সেই সবচেয়ে হতভাগ্য। উদ্বাস্তুরা শিকড়হীন, পরভূমে ভ্রাম্যমাণ। প্রতিটি মানুষের চাওয়া তার নিজের দেশ, যে দেশের জন্য বাঙালি ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে, অজস্র অশ্রুর বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে।

তাই এখনই সময় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন হওয়ার। যদি বাংলাদেশের ভৌগোলিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা এ মুহূর্তেই সচেতন না হই তাহলে বড় নির্মমতা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। হয়তো বঙ্গোপসাগরের নিচে মৃত ঝিনুকের মতো চিরকালের জন্য তলিয়ে যাবে বাংলাদেশ নামের দেশটি।