ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 18:19

চাপে রাখবে জাতিসংঘ

Rate this item
(0 votes)

দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে প্রধান দলগুলোর মধ্যে সংলাপ অনুষ্ঠানের তাগিদ দেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যত এবার নেতৃত্ব দিচ্ছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব এবং বিশ্বশান্তি রক্ষায় অবদান এ দেশের ব্যাপারে জাতিসংঘকে ভূমিকা রাখতে উৎসাহী করছে। এ দেশের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও জাতিসংঘের এই চাপে রাখার কৌশলকে স্বাগত জানাচ্ছে।

কূটনৈতিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।দেশের প্রধান দলগুলোকে সংলাপ অনুষ্ঠানে রাজি করানোর উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সংলাপের তাগিদ দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে তাঁর প্রত্যাশার কথা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে জাতিসংঘ অব্যাহতভাবেই বাংলাদেশকে চাপে রাখবে।কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের উদ্যোগ নেন গত বছরই। তাঁর দূত হিসেবে এরই মধ্যে দুই দফা ঢাকা সফর করেছেন জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক বিভাগের প্রধান অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। সব শেষ গত ১০ থেকে ১৩ মে অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ঢাকা সফরকালে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন।এর আগে ৬ থেকে ৯ ডিসেম্বর ঢাকা সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে তারানকো বলেছিলেন, বাংলাদেশে জাতিসংঘের জোরালো উপস্থিতি রয়েছে। জাতিসংঘ এ দেশের জনগণকে সহযোগিতা দেওয়ার কাজ অব্যাহত রাখবে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকল্পের মাধ্যমে জাতিসংঘ বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনকে কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাবে।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত বছর ডিসেম্বর মাসে তারানকোর নেতৃত্বে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের ঢাকা সফরই ছিল নির্বাচন সামনে রেখে প্রথম বিদেশি মিশন। বাংলাদেশ সরকার এটাকে স্বাগত জানিয়েছিল।তারানকো তাঁর দুই দফা সফরকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের গভীর উদ্বেগের কথা জানান। তাঁর ওই উদ্বেগের কারণ সম্পর্কে ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশ নিয়ে উদ্বেগ জাতিসংঘ মহাসচিবের একার নয়। উদার, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতৃত্ব দেয়। বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি কমিটি ও সংস্থায় নির্বাচিত সদস্য। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের জোরালো ভূমিকা রয়েছে। তাই এ দেশ নিজেই অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতার মধ্যে পড়ুক, তা কেউ চায় না।সূত্র আরো জানায়, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভূমিকা অনন্য। বাংলাদেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে পুরো অঞ্চলে এর প্রভাব পড়বে। এক কথায় অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত বাংলাদেশের বোঝা বিশ্ব বইতে পারবে না। তা ছাড়া এক-এগারোর অনির্বাচিত সরকারের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে জাতিসংঘ মহাসচিব এবার আগেভাগেই উদ্যোগ নিয়েছিলেন।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, কোনো একটি সমাধান আসবে- এ বিষয়ে বিদেশি কূটনীতিকরা এখনো দৃঢ় আশাবাদী। পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে অক্টোবর মাসে। তিনি আরো বলেন, এক-এগারোর পূর্ববর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের দৌড়ঝাঁপ দেখা গেলেও এবার সে ধরনের উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে জাতিসংঘ। সংস্থার মহাসচিব বান কি মুন নিজেই বাংলাদেশের ব্যাপারে আগ্রহী।কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, এক-এগারোর পূর্ববর্তী সময়ে বিদেশি কূটনীতিকরা তাঁদের ভূমিকা নিয়ে নানাভাবে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছিলেন। পরে তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থন এবং এক-এগারোর সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা বিভিন্ন ফোরামে নাকচ করতে হয়েছে। যেহেতু জাতিসংঘের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাই এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মুখ্য ভূমিকা রাখাকেই নিরাপদ বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। তবে বিদেশি কূটনীতিকরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা কেবল সংলাপে বসতে রাজনীতিবিদদের উৎসাহী করতে পারেন। সমস্যা সমাধানে তাঁদের হাতে কোনো জাদুর কাঠি নেই। সমস্যার সমাধান করতে হবে এ দেশকেই।যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাবি্লউ মজিনা আশা প্রকাশ করে বলেছেন, দুই দলকে সংলাপে রাজি করানোর জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে। গতকাল শনিবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মজিনা এ আশা প্রকাশ করেন।মজিনা বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকেই পথ বের করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচন দেখতে চায়। এ কারণে দলগুলো অবশ্যই কোনো না কোনো পথ খুঁজে বের করবে।রাজনৈতিক সংকট নিরসনের লক্ষ্যে প্রধান দলগুলোকে আলোচনায় বসার জন্য গত সপ্তাহে নজিরবিহীনভাবে আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত লি জুন। জাতিসংঘ মহাসচিবসহ বিদেশি কূটনীতিকদের আহ্বানকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের প্রতিফলন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও বিশিষ্টজনরা।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'এটি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যখন নির্বাচন নিয়ে ঐকমত্যে পেঁৗছাতে পারছে না, তখন জাতিসংঘ মহাসচিব শান্তিপূর্ণ সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন। জাতিসংঘ তার সদস্য রাষ্ট্রের ব্যাপারে উদ্বেগ জানাতেই পারে।' তিনি বলেন, নির্বাচন শান্তিপূর্ণ না হলে এবং এতে সবাই অংশ না নিলে এর প্রভাব কী হবে তা নিয়ে জাতিসংঘের বাড়তি উদ্বেগ রয়েছে।চীনা রাষ্ট্রদূতের সংলাপের আহ্বান প্রসঙ্গে ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, চীনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। তিনি বলেন, তারা বোঝে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ব্যাহত হবে। তিনি আরো বলেন, জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনই নয়, এই বিশ্বায়নের যুগে যারা প্রকাশ্যে মতামত জানাচ্ছে না, তারাও উদ্বিগ্ন।ড. ইমতিয়াজ বলেন, 'এতে ভুল কিছু নেই। আমরা দোষী, কারণ আমাদের নিজেদের সমস্যা নিজেদেরই সমাধান করতে হবে। তবে আমি আশাবাদী, কোনো এক পর্যায়ে সমাধান আসবে। নইলে বিপজ্জনক পরিণতি অনিবার্য।'এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তাগিদ বা চাপ থেকে ফল আসবে না বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান। তিনি বলেন, 'অতীতে আমরা এ ধরনের চাপের কোনো ফল দেখিনি। ভবিষ্যতে যদি কোনো ফল দেখি, তাহলে খুশি হব।'