ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 18:16

বাংলাদেশের পেছানো দেখতে চায় না জাতিসংঘ

Rate this item
(0 votes)

অভাবনীয় যে অর্জনগুলোর জন্য বাংলাদেশকে নিয়ে জাতিসংঘ গর্ব করে সেগুলোকে আজ ঝুঁকিতে ফেলেছে চলমান রাজনৈতিক অনৈক্য। দীর্ঘ মেয়াদে অস্থিতিশীলতায় এ দেশের অগ্রযাত্রা যেমন ঝুঁকিতে পড়তে পারে, তেমনি বাড়তে পারে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশিদের নাক গলানোর প্রবণতাও। চলমান অস্থিরতার মধ্যে সংকট নিরসনের অনুরোধ নিয়ে আজ শুক্রবার ঢাকায় আসছেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, তারানকোর সফরে তিনটি ইস্যু বিশেষ গুরুত্ব পাবে। এগুলো হলো- সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর। গত ডিসেম্বর ও মে মাসে দুই দফায় ঢাকা সফর করেছেন তারানকো। রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে তিনি সফল হবেন কি না তা নিয়ে আছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে সন্দেহ। তাদের মতে, সমস্যা সমাধান করতে হবে বাংলাদেশকেই। এ সফরের মধ্য দিয়ে তারানকো বাংলাদেশ সরকার, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান জানতে পারবেন। সফর শেষে নিউ ইয়র্কে ফিরে জাতিসংঘ মহাসচিবকে তিনি তা অবহিত করবেন।



তারানকোর সফর সম্পর্কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের সফর অন্য যেকোনো দেশের প্রতিনিধির সফরের তুলনায় বৈধ। কারণ কোনো দেশের নির্বাচন নিয়ে বাইরে থেকে বৈধভাবে কথা বলার অধিকার কেবল বৃহৎ পরিসরে জাতিসংঘ ও তুলনামূলক ক্ষুদ্র পরিসরে কমনওয়েলথেরই আছে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের কাঠামোতে সদস্য দেশগুলোর গণতন্ত্র, মানবাধিকার পরিস্থিতি দেখার সুযোগ আছে। ভোট দেওয়ার সুযোগ পাওয়া জনগণের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। সমবেত হওয়ার সুযোগ পাওয়াও মানবাধিকার। অন্যদিকে কমনওলেথেরও মূল দৃষ্টি মানবাধিকারের দিকে। এর বাইরে অন্য কেউ যদি অন্য কোনো দেশের নির্বাচন নিয়ে কথা বলে বা দিকনির্দেশনা দেয়, তবে তা সত্যিকার অর্থেই অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ।

ওই কূটনীতিক বলেন, 'শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপে এত সমস্যার পরও বাংলাদেশ সেখানে কিছু বলতে যায়নি। ভারতের কোনো ব্যাপারেও বাংলাদেশ কখনো নাক গলায়নি। আমাদের অবস্থান যে বিশ্বে এত জোরালো, আমাদের যে এত শক্তি-ক্ষমতা আছে, তা আমরা ভুলে যাই।' তিনি বলেন, 'শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কাউকে কথা বলতে দিচ্ছে না। ভারতও তা-ই করছে। অনেক কিছু হারানোর ঝুঁকি থাকার পরও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কদিন পরপরই যুক্তরাষ্ট্রকে ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে সতর্ক করছে। সর্বোপরি বাংলাদেশের প্রতিবেশীদের কেউই তাদের সার্বভৌম ইস্যুতে এক চুল ছাড় দিচ্ছে না। তাহলে এ দেশ কেন বিদেশিদের নসিহত প্রত্যাশা করবে?' তিনি আরো বলেন, 'আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া দুর্বল। তাই বিদেশি কেউ এসে তাদের পরামর্শ দিতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ বসে বসে দেখে যে বিদেশিরা এসে আমাদের সমস্যা সমাধান করে।'

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, অন্য যেকোনো সফরের বিবেচনায় তারানকোর বাংলাদেশ সফরের বৈধ কারণ আছে। তিনি জাতিসংঘের রাজনীতি বিভাগের প্রধান। জাতিসংঘের ওই বিভাগের ক্ষমতা আছে সদস্য কোনো দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার। এখন দেখার বিষয়, তিনি এ সফর থেকে কী অর্জন করতে পারবেন? কারণ এর আগে তিনি আরো দুইবার এসেছেন। কোনোবারই রাজনৈতিক সংকট কাটেনি।

বাংলাদেশ নিয়ে জাতিসংঘের এত আগ্রহের কারণ জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশে এসেছেন। ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের অভাবনীয় অগ্রগতিগুলো নিজ চোখে দেখা। তাঁর সঙ্গে মেলিন্ডা গেটসসহ একটি প্রতিনিধিদল এসেছিল। স্বাস্থ্য খাতে এ দেশের যে অগ্রগতি, তা না দেখে তারা বিশ্বাস করতে পারেনি। তাদের কাছে বিস্ময় ছিল, যে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী ও সম্পদ সীমিত সে দেশ কিভাবে এত কিছু করে?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যার সক্ষমতা জাতিসংঘ মহাসচিব নিজ চোখে দেখে গেছেন। অবশ্যই এ দেশ ও দেশের অর্জনের প্রতি তাঁর যথেষ্ট শ্রদ্ধাবোধ আছে। জাতিসংঘ বাংলাদেশের অর্জনগুলোকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চায়। তিনি বলেন, জাতিসংঘের ৬৮তম সাধারণ পরিষদের শীর্ষ পর্যায়ের সম্মেলনের সময় পাঁচটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে। এর চারটিতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, জাতিসংঘ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে এ দেশের অর্জনগুলোকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের অগ্রগতিকে জাতিসংঘ প্রচার করে।

জানা গেছে, জাতিসংঘকেও প্রমাণ করতে হয় যে একটি দেশে তার বিনিয়োগের ফল কী আসছে। উন্নয়নের দিক দিয়ে বাংলাদেশকে জাতিসংঘ ইতিমধ্যে সেরা 'পারফর্মার' হিসেবে স্থান দিয়েছে। জাতিসংঘেরও বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে যে এ উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশ ব্যর্থ হলে জাতিসংঘের এত দিনের যে প্রচেষ্টা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। বলা হবে, জাতিসংঘ মডেল হিসেবে ভুল দেশকে নির্বাচন করেছে।

ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাতিসংঘ মহাসচিব স্বাভাবিকভাবেই চান বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত থাকুক। কারণ জাতিসংঘ যখন একটি দেশকে ব্র্যান্ডিং করছে তখন সেই দেশ যদি অগ্রগতির ধারা থেকে বিচ্যুত হয়, তখন সেটি তাদেরও ব্যর্থতা হিসেবে ধরা হবে। তাঁরা বলেন, জাতিসংঘ জানে যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা থাকলে বাংলাদেশ তার অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে পারবে না। এখন বাংলাদেশেরই প্রমাণ করা উচিত, বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি কেবলই একটি রাজনৈতিক রূপান্তরপ্রক্রিয়া। অতীতে এ দেশ অনেকবার এমন সংকটে পড়লেও নিজেরাই কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে। নয়তো বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে- এমন ধারণা পেলে বিদেশিরা সবাই দৌড়ে আসার সুযোগ পাবে। জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের (ন্যাম) সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ অন্য কারো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর বিপক্ষে। রাজনৈতিক অনৈক্যের সুযোগে বিদেশিরা যদি এখন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে আসে, তবে এ দেশের কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে। এর পাশাপাশি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কে চিড় ধরার মাধ্যমে ওই দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে নতুন মাত্রা দেখা দেবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, জাতিসংঘ যদি কোনো পরামর্শ দিতে চায়, তা বাংলাদেশের শোনা উচিত। বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের অবশ্যই জাতিসংঘের ছাতার মধ্যে থাকা উচিত। কারণ বিশ্বে বাংলাদেশকে প্রথম যে ব্র্যান্ডিং এনে দিয়েছে তা হলো, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন। এরপর তৈরি পোশাক, নারীর ক্ষমতায়নের ব্র্যান্ডিং হয়েছে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে আবদুল মোমেন কালের কণ্ঠকে বলেন, 'জাতিসংঘ কেবল অনুরোধ করতে পারে। বাংলাদেশকেই তার সমস্যার সমাধান করতে হবে।'

জানা গেছে, তারানকোর চার দিনের আনুষ্ঠানিক সফর শুরু হবে আগামীকাল শনিবার থেকে। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি ঢাকায় পৌঁছবেন। ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক নিল ওয়াকার গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, আগামী ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদীয় নির্বাচনের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি ও সংলাপে উৎসাহিত করতে তারানকোর এ সফর। তিনি সরকার, বিরোধী দল, জাতীয় সংসদ, সুধীসমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। গত মে মাসে তাঁর সফরের ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশে আসছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আগামীকাল সকালে তারানকো নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করা ছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার সঙ্গেও এদিন তাঁর সাক্ষাতের কথা রয়েছে। ১০ নভেম্বর ঢাকা ছাড়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য নিরসনের লক্ষ্যে আলোচনায় উৎসাহ জোগাবেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাতিসংঘ চায় সবার অংশগ্রহণে বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক। নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দৃশ্যত তেমন সমস্যা নেই। সমস্যা হলো সহিংসতা। এর কারণ রাজনৈতিক ঐক্য না থাকা। আগের দুই দফা সফরে তারানকো কিছু করতেন পারেননি। এবার নাটকীয় কিছু হবে বলে তারা মনে করে না। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা তাঁদের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি সংঘাত-সহিংসতা থামানো ও নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধানে আন্তরিক বলে অঙ্গীকার করতে পারেন। এতে জাতিসংঘের উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।