ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 17:51

মারিওর উৎসব, লাতিন আমেরিকার উৎসব

Rate this item
(0 votes)

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর স্বাধীনতার দ্বিশতবার্ষিকী উদ্যাপনের বছরে হিস্পানি কোনো কবি পাবেন এ বছরের নোবেল_এমনটাই আশা ছিল। ১৪ বছর আগে শেষবারের মতো কোনো কবিকে এ পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের সময় তো উপন্যাসের সময়, উপন্যাসের দিগ্বিজয়ী অভিযানকে আরো একবার স্যালুট করে সুইডিশ একাডেমী আবারও বেছে নিল একজন ঔপন্যাসিককে। তিনি হলেন পেরুর নাগরিক ৭৪ বছর বয়সী মারিও বার্গাস য়োসা...


পোর কে নো মে এস্ক্রিবেস্? তে দেহো মি নুমেরে দে তেলেফোনো (চাইলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো, তোমাকে আমার ফোন নম্বর দিচ্ছি)। ৭ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৪টায় কম্পিউটারের সামনে বসা, ইউটিউবে নোবেল ঘোষণা দেখব সরাসরি। কথা ছিল বন্ধু আশরাফুল আলম বাবুল ভাইয়ের অফিসে বসে একসঙ্গে দেখার। কিন্তু বৃষ্টি এসে সে ইচ্ছায় বাদ সাধল। অগত্যা যে যার ডেরায় বসে দেখার অপেক্ষা। দুই-তিন দিন ধরেই আলাপ-আলোচনা হচ্ছিল সম্ভাব্য নোবেলজয়ীর নাম নিয়ে। ঠিক বিকেল ৫টায় সুইডিশ একাডেমীর বিখ্যাত সাদা দরজাটা ভেতর থেকে খুলে তাদের সেক্রেটারি পিটার অ্যাঙ্গলুন্ড বেরিয়ে এসে যখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে ঘোষণাপত্রটি পড়লেন, তখন আমার মনে পড়ে গেল, ১৩-১৪ বছর আগেকার সেই সন্ধ্যার কথা, যেদিন লন্ডন নগরীর টেমস্ নদীর পাড়ের রয়্যাল ফেস্টিভ্যাল হলে মারিও বার্গাস য়োসার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল। মিনিট পাঁচেক আলাপের পর তিনি বইতে স্বাক্ষর করতে করতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। গোয়েন্দা মতো এক কোণে দাঁড়িয়েছিলাম অনেকক্ষণ, কখন তিনি বের হন হল থেকে। সে সন্ধ্যায় উপন্যাস বিষয়ে বক্তৃতা দিতে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরো দুই খ্যাতিমান: উনবের্তো একো ও সালমান রুশদি। যা হোক, শেষ পর্যন্ত একটা সময়ে সুপুরুষ মারিও তাঁর স্ত্রী পাত্রিসিয়াসহ বের হয়ে বাইরে রাখা গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। আর কেউ ছিল না। আমি দুরু দুরু বক্ষে এগিয়ে গিয়ে পের্দোনা, সেনঞর বলে তাঁদেরকে থামিয়ে নিজের পরিচয় দিলাম। তিনি মিলিটারি একাডেমীতে পড়াশোনা করেছেন, আমিও ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। যোগসূত্রটা এখানে। তাঁর প্রথম উপন্যাস লা সিউদার্দ ইলোস্ পেররোস (শহর ও কুকুর) পেরুর লেওন্সিও মিলিটারি একাডেমীর এক দল ক্যাডেটের কিছু ঘটনাবলিকে উপজীব্য করে, যেটা পড়লে আমার মতো যেকোনো ক্যাডেটই কিছুটা হলেও নস্টালজিয়ায় ভুগবেন। ওই সাক্ষাতে তাঁকে জানিয়েছিলাম, তাঁর এ উপন্যাসটি বাংলায় অনুবাদের বাসনা। তখন তিনি যোগাযোগ করতে বলেছিলেন। ফোনে মাঝে একবার কথাও হয়েছিল। এর পরের সাক্ষাৎ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে, আমার গুরু হুয়ান আন্তোনিও মাসোলিবের আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং তিনি ঠিক ঠিক চিনেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছবি না তোলার আক্ষেপটা সারা জীবন থাকবে। উলি্লখিত ঢাউস আকারের উপন্যাসটি কিছুটা অনুবাদও করেছিলাম, কিন্তু এরপর সময় চলে গেছে, শেষ করা হয়নি।

নোবেল মারিও

লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর স্বাধীনতার দ্বিশতবার্ষিকী উদ্যাপনের বছরে (২০০ বছর আগে স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সিমোন বেলিবার, সাল মার্তিন প্রমুখ নেতার নেতৃত্বে স্বাধীনতা লাভ করে) হিস্পানি কোনো কবি পাবেন এ বছরের নোবেল_এমনটাই আশা ছিল। ১৪ বছর আগে শেষবারের মতো কোনো কবিকে এ পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের সময় তো উপন্যাসের সময়, উপন্যাসের দিগ্বিজয়ী অভিযানকে আরো একবার স্যালুট করে সুইডিশ একাডেমী আবারও বেছে নিল একজন ঔপন্যাসিককে। তিনি হলেন ৭৪ বছর বয়স্ক পেরুর মারিও বার্গাস য়োসা। যাক। সুইডিশ একাডেমী এলফ্রিদে ইয়েলিনেক, দারিও ফো কিংবা থ্রার্টা মুল্যারের মতো অজানা-অচেনা তেমন কাউকে আর এবার বিবেচনায় আনেনি। এটা সুখের কথা। গত ১৫-২০ বছরে বহুবারই মারিও বার্গাস য়োসার নাম আলোচনায় ঘুরেফিরে এসেছে সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ী হিসেবে। সত্যিকারের দাবিদার ছিলেন এবং পেলেনও। মজার বিষয়, এ বছর তাঁর নাম কিন্তু আলোচনায় একেবারে ছিল না বললেই চলে। স্বয়ং মারিও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। প্রায় প্রতিবছরই অক্টোবরের শুরুতে তাঁকে সাংবাদিকরা নোবেল নিয়ে প্রশ্ন করতেন। এ বছর কেউই করেননি। মারিও নোবেল নিয়ে ভাবনা বাদ দিয়েছেন বেশ আগেই। তাঁর ডানপন্থী রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণার জন্য তিনি সুইডিশ একাডেমীর বিরাগভাজন হবেন না_এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু সুইডিশ একাডেমীর সিদ্ধান্তগুলো কোনো যুক্তি দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।
বর্তমানে মারিও নিউইয়র্কে রয়েছেন, প্রিস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে বোর্হেস এবং অন্যদের ওপর একটি কোর্সে পাঠদানে ব্যস্ত। নিউইয়র্কে তাঁর ফ্ল্যাটে ভোর সাড়ে ৫টায় একটা ফোন বেজে ওঠে, তাঁর স্ত্রী গিয়ে ধরেন। ভেবেছিলেন কোনো দুঃসংবাদ। না, সুইডিশ একাডেমীর সেক্রেটারি জেনারেল। মারিও পড়ছিলেন আলেহো কার্পেন্তিয়েরের অতি চমৎকার উপন্যাস 'এল রেইনো দে এস্ত মুন্দো' (এই মর্ত্যের রাজত্ব), পড়ছিলেন আর নোট নিচ্ছিলেন কোর্সের জন্য। ফোন হাতে এগিয়ে আসেন তাঁর স্ত্রী। সুইডিশ একাডেমীর সেক্রেটারি জেনারেল ফোনটা কেটে দিয়ে আবার পাঁচ মিনিট পর করলেন। তাঁরা দুজন ভাবলেন, কেউ মজা করছে। সিদ্ধান্ত নিলেন, একেবারে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দুই ছেলে আর মেয়েকে কিছু জানাবেন না। ১৫ মিনিট পর ঘোষণাটা দেওয়া হলো। শুরু হলো উৎসব। মারিওকে ঘিরে।
নোবেল কমিটির এই সিদ্ধান্ত সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এক লেখককেই শুধু সম্মানিত করল না, উপরন্তু নোবেল কমিটি নিজেও সম্মানিত হলো তাঁকে পুরস্কৃত করে। লাতিন আমেরিকায় উৎসব হচ্ছে। মারিও নিজেই বলেছেন, 'এ পুরস্কার কেবল আমার জন্যই নয়, অপূর্ব স্প্যানিশ ভাষা এবং লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের জন্যও বটে। স্প্যানিশ আজকের পৃথিবীতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সৃজনশীল একটি ভাষা।' সবাই জানেন মারিও লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের তথাকথিত, অতি আলোচিত 'বুম' প্রজন্মের অন্যতম লেখক। গার্সিয়া মার্কেসের তো জগৎজোড়া খ্যাতি। মারিও ছাড়া এই মুহূর্তে ওই অঞ্চল থেকে ঔপন্যাসিক-লেখক হিসেবে নোবেলের যোগ্য দাবিদার ছিলেন কার্লোস ফুয়েন্তেস। এঁরা তিনজনই 'বুম'-এর বিখ্যাত লেখকত্রয়ী। ১৯৮২ সালে কলম্বিয়ার গার্সিয়া মার্কেস নোবেলে ভূষিত হওয়ার পর থেকেই মারিও ও ফুয়েন্তেস নোবেল জিতবেন_এমন আশা ব্যক্ত হয়ে আসছে ২৭ বছর ধরে। মাঝে ১৯৯০ সালে পেয়েছিলেন মেহিকান কবি, প্রাবন্ধিক ওক্তাবিও পাস্। মারিও হলেন লাতিন আমেরিকান সাহিত্যভুবনের ষষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, যিনি নোবেল জিতলেন। বাকিরা হলেন গুয়াতেমালার মিগেল আনহেল আস্তুরিয়াস, চিলির গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল ও পাবলো নেরুদা, কলম্বিয়ার গার্সিয়া মার্কেস এবং মেহিকোর ওক্তাবিও পাস্। ২০ বছর পর কোনো স্প্যানিশভাষী লেখককে পুরস্কারটা দেওয়া হলো। আর না বললেই নয়, মেহিকোর হুয়ান রুলফো এবং আর্হেন্তিনার কিংবদন্তি হোর্হে লুইস বোর্হসকে সুইডিশ একাডেমী উপেক্ষা করে বড় ভুল করেছে। মারিওর নোবেলপ্রাপ্তি স্প্যানিশভাষী লাতিন আমেরিকান সাহিত্যের শক্তিমত্তারই পরিচায়ক।
পেরুর দক্ষিণে ঐতিহাসিক ইনকা অঞ্চল আইয়াকুচোর এক পুরনো ট্যুরিস্ট হোটেলে বছর কয়েক আগে কয়েক বন্ধুসহ আড্ডা দিচ্ছিলেন মারিও। বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন পেরুর লেখক আলোনসো কুয়েতো। তাঁর জবানিতে জানা যায়, হঠাৎ এক গণৎকার এসে সেখানে উপস্থিত হন। তারপর কোকোর পাতা ছিটাতে ছিটাতে একপর্যায়ে মারিওকে বলেন যে তিনি নোবেল জিতবেন কিন্তু কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে। পেরুর প্রতিটি মানুষ রীতিমতো গর্বিত। লেখক আলোনসো কুয়েতো বলেন, 'এক বিশাল ব্যাপার, ন্যায্য সিদ্ধান্ত। মারিও লেখালেখির প্রতিটি শাখায় উৎকর্ষ দেখিয়েছেন। মারিও এক মহৎ মানুষ এবং এত বছরে এত এত পুরস্কারের পরও সে এতটুকু বদলে যায়নি।' সম্প্রতি পাবলো নেরুদা কবিতা পুরস্কারে ভূষিত পেরুর কবি আন্তোনিও সিস্নেরোস মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, 'মারিওর পুরস্কার পাওয়াটা এমন যে, মনে হচ্ছে পেরুর প্রতিটি লোক যেন পুরস্কারটি ছুঁয়েছেন। আমাদের সবার মধ্যেই মারিও আছেন। মারিও একজন অসাধারণ এবং একই সঙ্গে জটিল মানুষ; তাঁর উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ চরিত্রগুলোর মতোই। জীবনের সত্তরটা বছর ধরে কোনো রকম আপস না করেই একই রকমভাবে তাঁর স্বতন্ত্র সত্যের পথে অবিরাম হেঁটে যাওয়া লোকের সংখ্যা এখনকার সময়ে বিরল। এঁদেরই একজন মারিও বার্গাস য়োসা।' গার্সিয়া মার্কেস-এর হাতেগড়া সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ফুন্দাসিওন নুয়েবো পেরিওদিস্মো ইবেরো-আমেরিকানোর (এফএনপিআই) নির্বাহী প্রধান হাইমে আবেইয়ো জানিয়েছেন, যে ফাউন্ডেশন, যার সদর দপ্তর কলম্বিয়ার ক্যারিবীয় শহর কার্তাহেনা দে ইন্দিয়াস-এ, মারিও বার্গাস য়োসার নোবেলপ্রাপ্তির খবরকে স্বাগত জানায় এবং একই সঙ্গে বলতে চায় যে বার্গাস য়োসা একজন মহৎ সাংবাদিক। উল্লেখ্য, গার্সিয়া মার্কেস এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। এক সময়কার এই দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ১৯৭৬ সালে এক ব্যক্তিগত ঝামেলার পর থেকে ৩৪ বছর ধরে কেউ কারো মুখোমুখি হননি। অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মের অন্যতম সেরা লাতিন আমেরিকান লেখক পেরুর সান্তিয়াগো রোনকানালিওলো তাঁর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছেন, তাঁর স্বদেশি মারিও বার্গাস য়োসা এমন একজন বুদ্ধিজীবী, যিনি তাঁর সাহিত্যকর্ম ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে নোবেলের যোগ্য দাবিদার ছিলেন অনেক আগে থেকেই এবং এটা খুশির ব্যাপার যে শেষ পর্যন্ত তিনি এটা পেলেন। স্পেনের স্বনামধন্য লেখক হাবিয়ের মারিয়াস জানিয়েছেন, 'মারিও বার্গাস য়োসাকে নোবেলে ভূষিত করার পর অন্তত এই বছর কেউই এই পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক তুলবেন না আশা করি। বিতর্কের কোনো সুযোগই নেই। গত কয়েক বছরে তো আমরা এমন কাউকে কাউকে দিতে দেখেছি যে আমরা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। আমার প্রচণ্ড আনন্দ হচ্ছে, আমি ভীষণ খুশি যে এ বছরের নোবেল ঘোষণায় কোনো অস্বচ্ছতা আর রইল না।' মারিও বার্গাস য়োসা স্প্যানিশ রয়েল একাডেমীর সদস্য, হাবিয়ের মারিয়াসও সদস্য। মারিয়াস-এর কাছে মারিও হলেন বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক, যিনি তাঁর অতি প্রিয় ভিক্তর হুগো ও গুস্তাভ ফ্ল্যাবয়ার-এর মতো এত এত বিশাল কাজ করেছেন যে বলার মতো নয়। পেরুর তরুণ প্রজন্মের অপর বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক ফের্নান্দো ইওয়াসাকি জানিয়েছেন, স্প্যানিশ ভাষার জন্য এ এক আনন্দের ঘটনা, মারিও বার্গাস য়োসাকে বাছতে গিয়ে নোবেল কমিটি ন্যায্য কাজটিই করেছে, যা অনেক দিন ধরেই প্রত্যাশিত ছিল।

কোন শ্রেণীর লেখক বার্গাস য়োসা?

অনেকেই প্রশ্নটা করছেন। লাতিন আমেরিকা নিয়ে আমাদের এখানে যথেষ্ট আগ্রহ। কারণ অনেক : চে, কুবা বিপ্লব, ফিদেল, সমাজতন্ত্র, ভাবাবেগ, সামরিক দুঃশাসন, গার্সিয়া মার্কেস ইত্যাদি ইত্যাদি। এখানে ভাবাদর্শ ও ফিকশনের সম্পর্কের ব্যাপারটা এসে যায় এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে। তাঁকে নোবেল দেওয়ার নায্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। কেউ তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে একমত না হতে পারেন, কিন্তু ঔপন্যাসিক ও লেখক হিসেবে তাঁকে এতটুকু ছোট করে দেখার জো নেই। লাতিন আমেরিকা বিশাল, বিস্তৃত এবং বহুমুখী তার সংস্কৃতি ও বাস্তবতার রূপ। গার্সিয়া মার্কেস সেই বাস্তবতার একটি রূপ, যেখানে তিনি পাঠককে বাস্তবতা ছাড়িয়ে আরেক বাস্তবতায় নিয়ে যান। তাঁর রচনা লাতিন আমেরিকার একটা সময়কে ধরে। অন্যদিকে বার্গাস য়োসা একেবারেই বাস্তবতার ভিন্ন মেরুতে বাস করেন, নিখাদ বাস্তবতা বলতে আমরা যা বুঝি, তা-ই প্রতিফলিত হয় তাঁর রচনায়, যা লাতিন আমেরিকার সাম্প্রতিক দুই-তিন দশকের বাস্তবতাকে তুলে ধরে; যদিও উপন্যাসের পটভূমি হয়তো আরো দূর অতীতে। অনেকে লাতিন আমেরিকান উপন্যাসের সঙ্গে ম্যাজিক রিয়ালিজমকে গুলিয়ে ফেলেন। সেটা উচিত নয়। এক সাক্ষাৎকারে মারিও বার্গাস য়োসা বলেছিলেন_'নো সোই উন পাহারো এপিকাল' (আমি কোনো ট্রপিক্যাল পাখি নই)। এ বক্তব্য থেকে অনেকটুকুই পরিষ্কার হবে। তাঁর লেখনী নিখাদ বাস্তবতার ভূমিতে গ্রোথিত, তাঁর শৈলী কথাবার্তানির্ভর, প্রচুর খিস্তি-খৈউড় থাকে, বুনন একটু জটিলই বলতে হয়, যেখানে তিনি বহুস্বরের সমাবেশ ঘটান একই তালে এবং কাহিনীটা সাধারণত বলে যান সমান্তরালে।

জীবনের জোয়ার-ভাটার ঢেউ ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে যাওয়া এক লেখক

কৈশোর। মারিও বার্গাস য়োসা লুকিয়ে লুকিয়ে নেরুদার কাব্যগ্রন্থ বেইস্তে পোয়েমাস দে আমার ই উনা কানসিওন দেসেসা পরাদা (বিশটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান) পড়েন। মা লুকিয়ে রাখেন, এত বাচ্চা বয়সে এসব পড়ার দরকার নেই। কিন্তু কিশোর মারিও গোঁ ধরে নেরুদার রোমান্টিক কাব্যগুলো পড়ে ফেলেন। ঘটনাটা দক্ষিণ পেরুর আরেকিপার, যেখানে তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালে। পেরুর বহু নামকরা বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের জন্ম এই শহরেই। আজ বার্গাস য়োসা এই শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। এই জন্মস্থানের জন্য বুকভরা গর্ব তাঁর, যদিও তিনি ১৯৯৩ সাল থেকে স্পেনের নাগরিক এবং বর্তমানে আছেন নিউইয়র্কে, যেখানে ক্লাস নিচ্ছেন।
তাঁর জন্মের আগেই মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তিনি কেবল মায়ের স্নেহেই বড় হন; আর মা তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর বাবা বেঁচে নেই। এই বিশ্বাস নিয়ে কিছুটা বড় হয়ে স্কুলে মাধ্যমিক পড়ার সময় মারিও জানতে পারেন, তাঁর বাবা জীবিত এবং তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। তাঁর বাবা তাঁদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন এবং একপর্যায়ে ছেলেকে লা সাইয়ে স্কুল পালিয়ে জোর করে দুই বছরের জন্য লিমার লেওন্সিও প্রাদো মিলিটারি স্কুলে ভর্তি করান। দুই বছরের ওই অভিজ্ঞতা বৃথা যায়নি, যা পাঠকরা ১৯৬২ সালে প্রকাশিত লা সিউদাদ ইলোস্ পের্রোস্ (শহর ও কুকুর) উপন্যাসটি পড়লেই বুঝবেন এবং এই রকম চরম পারিবারিক অব্যবস্থার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করার বাস্তবটা কাহিনী হয়ে ওঠে ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ 'লোস্ কাচোররোস'-এ (এযাবৎ প্রকাশিত লেখকের একমাত্র গল্পগ্রন্থ, যা তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থও বটে)।
কিন্তু তাঁর বাবার কড়া শাসন, নিষেধাজ্ঞা ও হস্তক্ষেপের বেড়ি থেকে বের হতে পারেন না। ১৯৫৩ সালে তিনি লিমার সান মার্কোস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বাবার কড়া নিষেধাজ্ঞা কিন্তু এবার আর বাঁধতে পারল না মারিওকে। বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে জলপাই সবুজ রঙের পোশাক পরবে, হবে সামরিক অফিসার। কিন্তু ছেলের ইচ্ছা অন্য রকম। এর ভেতর মারিও আরো ঝামেলা পাকিয়ে ফেলেন, যখন তিনি তাঁর মামির ছোট বোন জুলিয়াকে বিয়ে করে বসেন। অগত্যা বাড়ি থেকে পলায়ন। পকেটে টাকা-পয়সা নেই, বাঁচবে কী করে? শুরু হলো লেখালেখি আর অন্য কাজ। তাঁর চেয়ে বয়সে দশ বছরের বড় জুলিয়া আন্টিকে নিয়ে তাঁর সেই বৈবাহিক জীবন খুব বেশিদিন না টিকলেও এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনে সাহিত্য ঢুকে পড়ল বা সাহিত্যের মধ্যে তাঁর জীবন ঢুকে পড়ে। ওই সময় বিভিন্ন জায়গায় সাত-সাতটি ভিন্ন কাজ করতেন, যার মধ্যে ছিল রেডিওর খবর লেখা, বইপত্র ফাইল করা এবং এক কবরস্থানে কবরগুলোর গায়ে লেখা নামধাম ঠিকঠাক করা। দুরূহ জীবন। লিমার বিশ্ববিদ্যালয়ে কমিউনিস্ট পার্টির এক সংগঠন কাউইদের সদস্য হন। সরকারের নেকনজরে ছিলেন তাঁরা। বার্গাস য়োসা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা জমায়েতের মধ্য দিয়ে অনেককে নিয়ে প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। আকাশ-বাতাসে তখন বিপ্লবের বারুদগন্ধ। বার্গাস য়োসাও ঝাঁপ দেন সেই ডামাডোলে, সেই ১৭-১৮ বছর বয়সে।
১৯৫৯ সালে কুবা বিপ্লবের বছর অন্য সব লাতিন আমেরিকান লেখকের মতো চলে যান ইউরোপে। এক বৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা করেন মাদ্রিদের কোমপ্লুতেনসে বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং মার্কেসের উপর গবেষণা করে পিএইডিতে ভূষিত হন। এরপর ওখান থেকে যান স্বপ্নের প্যারিস নগরীতে। প্যারিসেই পরিচয় হয় অক্তাবিও পাস, হুুলিও কোর্তাসার, কার্লোস ফুয়েন্তেস, গার্সিয়া মার্কেস প্রমুখ লাতিন আমেরিকান লেখকের সঙ্গে যাঁরা নির্বাসনে ছিলেন। তিনি যে শুধুই পেরুর নন, তিনি যে লাতিন আমেরিকানও_অস্তিত্বের এই দিকটি তাঁর কাছে উদ্ভাসিত হয় তখন, ওই প্যারিসে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী জুলিয়া। তত দিনে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নাটক লা উইদা দেল ইনকা (ইনকার পলায়ন) এবং গল্পগ্রন্থটি, যা প্যারিসে তাঁর সঙ্গে ছিল। জুলিয়া আন্টির সঙ্গে তাঁর জীবনের ওই পর্বের অভিজ্ঞতাপুষ্ট উপন্যাস 'লা তিয়া জুলিয়াই এল এসক্রিবিদোর' (জুলিয়া আন্টি এবং লেখক) বের হয় ১৯৭৭ সালে। জুলিয়া আন্টি বিচ্ছেদের পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে লেখেন লোকে, বার্গিতাস নো দিহো (যে কথা বার্গাস বলেনি), যা বের হয় ১৯৮৩ সালে।
মূলত ১৯৬২ সালে প্রকাশিত চমৎকার উপন্যাস 'লা সিউদাদ ই লোস্ পেররোস্' (শহর ও কুকুর) দিয়েই দিগ্বি্বজয়ের শুরু। বইটি সে বছরই স্পেনের বিবলিওতেকা সেবে পুরস্কার জিতে নেয়। বার্গাস য়োসা তখন প্যারিসে। 'লা মোরাদা দেল এরোয়ে' (নায়কের বসতবাড়ি) নামক উপন্যাসের খসড়া রচনায় ব্যস্ত। দেশ থেকে দূরে স্বেচ্ছায় ইউরোপে নির্বাসনে দিন কাটাচ্ছিলেন। উল্লেখ্য, পেরুর কোনো সরকার কোনো দিনই তাঁর ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। এরই মধ্যে বার্সেলোনার অন্যতম প্রধান স্প্যানিশভাষী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সেইঙ্ বাররাল-এর অন্যতম কর্ণধার কার্লোস বাররাল-এর সঙ্গে দেখা। এরপর পাণ্ডুলিপি দেওয়ার সুযোগ। কার্লোস বাররাল তখনকার স্পেনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার 'বিবলিওতেকা ব্রেবে'র জন্য উপন্যাসটি পাঠান। মিলিটারি স্কুলে আতঙ্কগ্রস্ত ও ভীতসন্ত্রস্ত এক দল উঠতি বয়সের বালকের কাহিনীটি সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম পুরস্কার জিতে নেয়। ব্যস! বাজিমাত! কোনো লাতিন আমেরিকান লেখকের এই প্রথম ওই পুরস্কার জেতা। বুম ঘটনা! শুরু হয় বুম লেখকদের রাজত্ব। ১৯৬৭ সালে গার্সিয়া মার্কেস-এর 'সিয়েন আনিওস দে সোলেদাদ' (নিঃসঙ্গতার ১০০ বছর) এবং ১৯৬৩ সালে হুলিও কোর্তাসার-এর 'রাইয়ুএলা' (এক্কাদোক্কা) উপন্যাসগুলোর মধ্য দিয়ে যে রাজত্ব ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে দুই দশক ধরে লাতিন আমেরিকায়।
গেল শতাব্দীর সত্তরের দশকে এসে দুই-দুইটি অত্যন্ত চমৎকার উপন্যাস_'লা কাসা বের্দে' (সবুজ বাড়ি) ও 'কোনবের্সাসিওন এন লা কাতেদ্রাল' (কাতেন্দ্রাল বারে কথোপকথন) লিখে মারিও বার্গাস য়োসা পরিণত হন তাঁর সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখকে। এরপর ক্রমেই এগিয়েছেন বহুমুখিতায়। লিখেছেন কমেডিনির্ভর উপন্যাস, লিখেছেন কামজ প্রেমের উপন্যাস, লিখেছেন 'লা গেররা এনএল ফিন দেল মুন্দোর' (পৃথিবীর শেষ প্রান্তে যুদ্ধ) মতো অনবদ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস, লিখেছেন ডিটেকটিভ উপন্যাস 'কিয়েন মাতো আ পালোমিনো মোলেরো?' (পালোমিনো মোলেরোকে খুন করল কে?); লিখেছেন অজস্র গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা গ্রন্থ; যার মধ্যে রয়েছে গার্সিয়া মার্কেস-এর ওপর থিসিস গ্রন্থ ইস্তোরিয়া দে উন দেইসিদিও এবং ফ্ল্যাবেয়ার-এর মাদাম বোভারি নিয়ে একটি ঢাউস আলোচনা গ্রন্থ। লিখেছেন কলাম রিপোর্টার্জ। অজস্র লেখা, বলে শেষ করার মতো নয়।
১৯৯০ সালে ফ্রেন্তে দেমোক্রাতিকো নামের রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে প্রেসিডেন্ট পদে আলবার্তো ফুজিমোরির বিরুদ্ধে নির্বাচন করেন। নির্বাচনে হেরে যান। এতে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেরুর ক্ষতিটা কতটুকু হয়েছে জানি না, কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের জন্য বিশাল লাভ হয়েছে।
তিনি জয়ী হলে হয়তো আমরা এক মহৎ লেখককে হারাতাম। হয়তো আমরা পেতাম না 'লা ফিয়েস্তা দেল চিবো'র (ছাগ উৎসব) মতো অনন্য রাজনৈতিক উপন্যাস, যা লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ডজনেরও বেশি উপন্যাস, বেশ কিছু প্রবন্ধগ্রন্থ এবং রিপোর্টার্জভিত্তিক লেখালেখির মধ্য দিয়ে গত অর্ধশতাব্দীর মতো সময় ধরে মারিও বার্গাস য়োসা সাম্প্রতিক ও সমকালীন লাতিন আমেরিকান ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক যুদ্ধগুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন, যেখানে তাঁর শেষতম বিষয় হলো_ব্যক্তির স্বাধীনতা।
তাঁর প্রিয় সঁ ব্লাঁ কলম দিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নির্বিঘ্নে লিখে যাবেন_এমনটাই আশা আমাদের সবার। বৃহস্পতিবার নোবেলের ঘোষণা হলো। সোমবার সকাল থেকেই তিনি আবার কাজে ফিরে গেছেন প্রিসটন বিশ্ববিদ্যালয়ে, শ্রেণীকক্ষে। নোবেল ও তাঁর লেখালেখির অভ্যাস বা রুটিন বদলাতে পারবে না_এমন অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন তিনি। লেখালেখি ছাড়া তাঁর জীবন চলে না।
একবার উরুগুয়াইন লেখক হুয়ান কার্লোস ওনেভি লেখালেখির প্রতি তাঁর এই অদম্য ঝোঁক ও ভাবাবেগ দেখে বলেছিলেন, 'সাহিত্য তো দেখছি তোমার বউ!' আসলেই তাই। সাহিত্যের সঙ্গে আজীবনের এক বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ মারিও। আর স্ত্রী পাত্রিসিয়া ও সন্তানরা থাকেন তাঁকে ঘিরে।
সামগ্রিক উপন্যাস রচনার পথ আরো বিস্তৃত করবেন_এই আশাবাদ ব্যক্ত করে শেষ করছি; আর সবশেষে থাকল ফেলিসিদাসেস।