ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 17:19

শ্যামনগর থেকে ইউরোপ

Rate this item
(0 votes)

 

শরবানু আর ফরিদা বেগম সাতীরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের দুই বাসিন্দা। নানা প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে বারবার বিপর্যস্ত হয়েছেন, তবু সাহস হারাননি। দেশের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছেন সম্মান। কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন 'বাঘবিধবা' শরবানু। আর ইউরোপীয় পার্লামেন্টে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট বিপর্যয়ের সুবিচার চাইলেন শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ফরিদা বেগম।


বাংলাদেশতে যাওয়ার সুমায় শাড়ি পরে গিছলাম। যে জায়গায় প্রথমে গিলাম, তার নাম বেলা সেন্টার। ওইখেনে বিদেশিনীগের সাথে ম্যালা কতা কইছি। আমি বাংলায় কইছি। এক লোক আমার কথা তাগের কাছে ইংরেজিতে কয়ে দিচ্ছিল। ওই জায়গার নাম কোপেনহেগেন।
আমার বাড়ি সুন্দরবনের পাশের গাবুরা গ্রামে। আইলা যখন হইছিল, তখন আমাগের কিছু আর থাকল না। সব শ্যাষ হয়ে গিল। ওত কিছু তো আর আমরা বুঝিনে। ভাবিছিলাম সারাদেশের বুঝি আমাগের মতোই দশা হইছে। পরে শুনিছি, আমার মতো সব হারানো মানুষের সংখ্যা খুব বেশি না। আমার বাপ নওশের কয়াল, আমাকে বিয়ে দিছিল রফিকুল ইসলামের সাথে। পাশেই চকবারা গ্রামে বাড়ি তার। সাত ভাই-বোন ছিলাম বলে, বাপ কারোরই পড়াশোনার দিক বিশেষ খিয়াল করতি পারিনি। আগে রফিকুল ইসলাম চাকরি করত। চাকরি হারানোর পর কিছু করার ছিল না বলে সঙ্গীদের নিয়ে সুন্দরবনে যাতো। কাঠ কাটত, পাতা আনত, মধু, মাছ এসব বিক্রি করে সংসার চলত। একবার এমন কাজেই বনে যেয়ে আর ফিরল না, সাতদিন পর সঙ্গীরা এসে কলো, বাঘে খাইছে তারে। 'স্বামীখেকো ডাইনি' অপবাদ নিয়ে ছাড়তি হলো শ্বশুরবাড়ি।
শুরু করলাম কাঠ কাটা। বনের থেকে যে কাঠ পাতাম, তাই বেঁচে, চিংড়ির ঘেরে কাজ করে সংসার চালাইছি। নদীতে মাছও ধরিছি, জাল টানিছি। এ জীবনে করিনি এমন কাম নেই। সাহস হারাইনি কখনো। ভাইদের সংসারেও খোঁটা খেয়েছি অনেক। এতগুলোন বছর পার করে, কেবল নতুন ঘর বানাইছিলাম। কিন্তু ভাগ্যে সইলো না। গত বছরের ২৫শে মে যে জলোচ্ছ্বাস হলো, তাই আবার সব কেড়ে নিল। আমার তখন শরীর ভালো না, পরে শুনলাম ওরই নাম নাকি আইলা। সেই অসুস্থ শরীরেই বাপজান আমাকে মাদুরে মুড়ে নৌকায় তুলে দিলেন। ঘর-বাড়ি তো আর কিছু নেই! তিন দিন পর জ্ঞান ফিরে দেখি, আমার ছাওয়ালের সাথে, নদীতে পড়ে রইছি নৌকায়। সেই সুমায় এক ফাউন্ডেশন, গণমুখী নাম, আমাগের উদ্ধার করলো। এরপরই কোপেনহেগেনে আমি দ্যাশের কতা কবার গিলাম। এক বিদেশী সংস্থা সব ব্যবস্থা করলো। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে গিলাম সেখানে। আমি ওখেনে বাংলাদেশের তিপূরণ দাবি করিছি। আমাগের দ্যাশ কত কী হারাইছে, তা আমার চেয়ে ভালো কিডা জানে! সুন্দরবন এলাকায় প্রতীকী গণআদালতের রায়ে বনের অধিষ্ঠাত্রী বনবিবি জরিমানার আদালতে তিপূরণ দেওয়ার কথা কইছি। কার্বন নিঃসরণ যেন সহনশীল পর্যায়ে থাকে তাও কইছি।
আমি বারবার হারাইছি। তয়, মুখ থুইবড়ে পরিনি। ছাওয়ালের কথা চিন্তা করিছি। নিজের ভবিষ্যৎ ভাইবছি। তাই শ্যাষের থেকে শুরু করিছি প্রত্যেকবার।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে ফরিদা

'পাখিরও একটা বাসা আছে, আমাগের তা-ও নাই। আইলায় আমাগের বাড়িঘর কাইড়ে নিছে। এখন আমরা বেড়িবাঁধের মইধ্যে থাকি। আপনাদের মতো আমরাও মানুষ। আমাগের জন্যি কিছু করেন।' ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় সংসদে (পার্লামেন্ট) দাঁড়ায়ে বাংলাদেশের কথা এভাবেই বিশ্বের সামনে কইছি। আইলায় (জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে) নিজের তি কী হইছে, তাও বলিছি।
ঘূর্ণিঝড় আইলায় সব হারাইছি। সাতীরার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রামের বাসিন্দা আমি। যখন ওইখানে (ইউরোপীয় পার্লামেন্ট) এসব কথা বলিছি সবাই শুনেছে আমার কথা।
জলবায়ুর সুবিচার নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে যে শুনানি শুরু হয়েছে, তারই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের প থেকে ফরিদা বেগম বক্তব্য দেন। বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে জি-৭৭ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান সমঝোতাকারী ও অন্য সদস্যরা অংশ নেন। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও মালের জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দুজন বক্তব্য দেন।
'আইলার আঘাতে বাড়িঘর সব ডুবে গেছে। আমাগের গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ বেড়িবাঁধে থাকে। জমিতে লবণ-পানি থাকায় চাষাবাদও করা যাচ্ছে না। আধবেলা, একবেলা খেয়ে থাকতে হচ্ছে। ঋতুবৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে গেছে'_এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন এমন গরম পড়ে যে, শরীরের চামড়া পুড়ে যায়। শরীরে নতুন নতুন অসুখ হচ্ছে।
আমাগের এলাকার অনেক মানুষই খুলনা, ঢাকা ও চট্টগ্রামে চলে যাচ্ছে। সেখানে গিয়ে চাকরি খুঁজছে। এলাকায় যারা আছে, তারাও কাজের সন্ধানে রয়েছে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড়ে সব ধ্বংস হওয়ায় এলাকায় কোনো কাজ নেই। এ পরিস্থিতির জন্য উন্নত দেশগুলো দায়ী। আর তাঁরা তিগ্রস্ত হচ্ছেন। ধনী দেশগুলোর উচিত আমাগের সাহায্য করা।