ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 17:11

ইউরোপীয় সংকট দাঁড়াতে দেয়নি বিশ্ব অর্থনীতি

Rate this item
(0 votes)

যুক্তরাষ্ট্রের ঢিলেঢালা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ইউরোপীয় সংকটে শ্লথ ছিল চীনের প্রবৃদ্ধি। অন্যদিকে ইয়েনের মূল্যবৃদ্ধিতে রপ্তানি কমে মন্দায় সুনামি বিধ্বস্থ জাপান। তিন বৃহৎ দেশের অর্থনীতি যখন টানপড়েনে, তখন বলার উপায় নেই ২০১২ সাল ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বছর। কার্যত ২০০৯ সালে শুরু হওয়া মন্দা এখনো পূর্ণভাবে কাটিয়ে উঠতে পারেনি বিশ্ব অর্থনীতি। অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি উদীয়মান এশিয়া। তবুও বিদায় বছরটিতে সম্ভাবনা জাগিয়েছে বেশ কিছু দেশ।


মন্থর ছিল বিশ্ব অর্থনীতি : ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সংকটের জের ধরে ২০১২ সালে কমেছে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব অনুযায়ী এ বছরে বিশ্ব অর্থনীতি মাত্র ৩.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। যেখানে ২০১১ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৮ শতাংশ এবং ২০১০ সালে ছিল ৫.১ শতাংশ। এদিকে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) জানায়, ইউরোজোন সংকট নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যাওয়ায় নতুন বছর বিশ্ব অর্থনীতি আরো মন্থর হবে। সংস্থা জানায়, ২০১৩ সালে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি কমে হবে ১.৪ শতাংশ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আগামী বছরটি কেমন যাবে_এর অনেক কিছুই নির্ভর করছে পশ্চিমা নেতাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের ফিসক্যাল ক্লিফ : ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততা ছিল প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং 'ফিসক্যাল ক্লিফ' সংকট নিয়ে। এ সংকটের সুরাহা না হলে নতুন বছরে কর বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রকে ব্যয় সংকোচন করতে হবে। তাই ফিসক্যাল ক্লিফ সমস্যার সমাধান কিভাবে হয়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে নতুন বছরে দেশটির অর্থনীতি। ২০১২ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ এবং বেকারত্বের হার ৭.৭ শতাংশ। হোয়াইট হাউস জানায়, ২০১৩ সালে প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৩ শতাংশ থেকে কমে হবে ২.৭ শতাংশ।
অর্থনৈতিক সংকটে ইউরোপ : অর্থনৈতিক সংকটের তৃতীয় বছরে মন্দা কাটিয়ে আবারও মন্দায় পড়েছে ইউরোজোন। পর্তুগাল, গ্রিস, স্পেনসহ বেশ কয়েকটি দেশকে ঋণ থেকে রক্ষায় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সহায়তার পাশাপাশি বন্ড কিনেছে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবুও মন্দা মুক্ত করা যায়নি ইউরোজোনকে। ইউরোস্টেট জানায়, ইউরোজোনে বেকারের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে এক কোটি ৮১ লাখ ৯৬ হাজার। গত এক বছরে বেকার বেড়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার।
দুর্দিন কাটাতে পারেনি জাপান : বৈশ্বিক টানাপড়েনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অব্যাহতভাবে কমছে জাপানের রপ্তানি। ২০১২ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি ০.৯ শতাংশ সংকুচিত হয়। এর আগের প্রান্তিক এপ্রিল-জুনে সংকোচিত হয় ০.০৩ শতাংশ। টানা দুই প্রান্তিকে অর্থনীতি সংকোচিত হয়ে জাপান কৌশলগতভাবে মন্দায়। জাপানের অর্থনীতিতে বড় চাপ হিসেবে ধরা হচ্ছে মুদ্রা ইয়েনের মূল্যবৃদ্ধি। এতে সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি আয় কমে যায়। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে দ্বীপ বিরোধকে কেন্দ্র সে দেশেও জাপানি পণ্যের চাহিদা কমেছে। এভাবে রপ্তানি কমে যাওয়ায় প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিপাকে পড়েছে জাপান। এ ছাড়া ২০১২ সালের প্রথম ভাগে রেকর্ড বাণিজ্য ঘাটতি হয় ২.৯ ট্রিলিয়ন ইয়েন (৩৭ বিলিয়ন ডলার)।
প্রবৃদ্ধিতে ছিল আফ্রিকা : বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটেও জোরালো প্রবদ্ধিতে রয়েছে আফ্রিকা। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী আফ্রিকা ২০১২ সালে ৫.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। অন্যদিকে ইউনাইটেড ন্যাশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএনডিপি) আফ্রিকা প্রধান টেগেগনিউক গেট্টু জানান, ২০১৫ সাল নাগাদ আফ্রিকার প্রবৃদ্ধি হবে ৭ শতাংশ।
রপ্তানিতে সাফল্য পায়নি এশিয়া : ঋণ সংকটে প্রধান রপ্তানি বাজার ইউরোপ ও আমেরিকায় পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় ২০১২ সালে কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি সাফল্য পায়নি এশিয়া। রপ্তানি অর্ডার কমে যাওয়ায় শিল্পোৎপাদন কমেছে উদীয়মান দেশগুলোয়। ২০১২ সালের প্রথম ভাগে চীন, জাপান, ভারত, সিঙ্গাপুরসহ এশিয়ার দেশগুলোর রপ্তানি কমে অব্যাহতভাবে। এতে কমে দেশগুলোর প্রবৃদ্ধিও। তবে বছরের শেষ ভাগে এসে এশিয়ায় রপ্তানিতে আবারও সাফল্য দেখা যায়। মার্কিটের অর্থনীতিবিদ অ্যালেক্স হেমিলটন বলেন, বাইরের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় বছরের দ্বিতীয় ভাগে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন এশিয়ার দেশগুলোর জন্য কঠিন হয়ে যায়। ইউরোপের সম্ভাব্য আরেকটি মন্দা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জোড়াতালি দিয়ে এগিয়ে চলা অর্থনীতির প্রভাব থেকে এশিয়াকে রক্ষায় চীনকে যত দ্রুত সম্ভাব মুদ্রানীতি শিথিল করার পরামর্শ দেন বিশ্লেষকরা।
অলিম্পিক জাগায় ব্রিটেন : ইউরোপীয় সংকটে মন্দায় থাকা যুক্তরাজ্যের জন্য ২০১২ সালে সুখবর নিয়ে আসে লন্ডন অলিম্পিক। তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয় ০.৭ শতাংশ, যা আগের প্রান্তিকের চেয়ে ১.০ শতাংশ বেশি। এ অর্জনে ০.২ শতাংশ যোগ হয়েছে শুধু অলিম্পিকের টিকিট বিক্রি থেকে। মজুরি কমেছে উন্নত বিশ্বে : ঋণসংকটকে কেন্দ্র করে উন্নত বিশ্বে ব্যাপক হারে ব্যয় সংকোচন গ্রহণ করায় চাকরির বাজার যেমন ছোট হয়েছে, তেমন কমেছে মজুরিও। আইএলও প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক সংকটে বিশ্বব্যাপী মজুরি প্রবৃদ্ধি কমেছে। বৈশ্বিক মজুরি ২০১১ সালে বেড়েছে মাত্র ০.২ শতাংশ, যেখানে ২০১০ সালে বেড়েছে ১.৩ শতাংশ এবং ২০০৭ সালে বেড়েছে ২.৩ শতাংশ। এ প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। তবে গত দশকে চীনে মুজরি বেড়েছে তিন গুণ। আইএলওর পরিচালক গে রাইডার বলেন, অর্থনৈতিক সংকট বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে তুলনামূলক ভালো পরিস্থিতি ছিল। এশিয়ায় বেতন বেড়েছে ৫.০ শতাংশ, পূর্ব ইউরোপে এবং মধ্য ইউরোপে বেড়েছে ৫.২ শতাংশ এবং ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে বেড়েছে ২.২ শতাংশ।
উন্নয়নশীল বিশ্বে রেমিট্যান্স বাড়ে ৬.৫ শতাংশ : বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী ২০১২ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় রেমিট্যান্স আসে ৪০৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৬.৫ শতাংশ বেশি।
এগিয়ে পর্যটন খাত : টানা অর্থনৈতিক সংকটে বিশ্ব যখন পিছিয়ে তখনো এগিয়ে পর্যটন শিল্প। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে ৪ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী যখন তীব্র বেকারত্ব তখন পর্যটন শিল্পে কর্মীর সংখ্যা ২৩৫ মিলিয়ন। শুধু তা-ই নয়, এ শিল্প থেকে বিশ্ব অর্থনীতি প্রতিবছর পাচ্ছে জিডিপির ৫ শতাংশ।