ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 16:54

পরীক্ষায় ইউরোপ

Rate this item
(0 votes)

পশ্চিমা শক্তিগুলো অনেক দিন ধরেই বলছে যে সিরিয়ায় তারা হস্তক্ষেপ করতে চায় না। কিন্তু গত সপ্তাহে দামেস্কের কাছে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর পশ্চিমারা যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তাতে একরকম সামরিক মহড়ার চিত্রই ফুটে উঠেছে। সে ক্ষেত্রে পুরনো একটি প্রশ্ন আবারও সামনে চলে এসেছে_সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানো হলে ইউরোপে এর হাল ধরবে কে? ঘটনা বিশ্লেষণে এখন পর্যন্ত কারো অবস্থান স্পষ্ট হয়নি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত সপ্তাহে টেলিফোনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিট কথা বলেন। পরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলন্দের সঙ্গেও কথা হয় তাঁর। এখন পর্যন্ত দেখা যায়, শুধু ব্রিটেন ও ফ্রান্সেরই সিরিয়ায় যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর ইচ্ছা আছে। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিষয়ে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জার্মানিকে বড় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানায় যুক্তরাষ্ট্র। জার্মানিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছে।
কোথাও সামরিক অভিযানের প্রশ্নে ইউরোপে মতভেদের ঘটনা নতুন কিছু নয়। ইরাকে সামরিক অভিযানের কথা উঠলে তাতে ফ্রান্স ও জার্মানি বিরোধিতা করে। আবার লিবিয়ায় কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির বাহিনীর বিরুদ্ধে যখন ফ্রান্স ও ব্রিটেন প্রচার চালাচ্ছিল তখন দেখা গেল, জার্মানি জাতিসংঘে এ-সংক্রান্ত ভোটাভুটিতে অংশ নেয়নি। মালিতে সামরিক অভিযানের প্রশ্নেও ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। সিরিয়া প্রশ্নেও ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে প্রথম থেকে মতবিরোধ আছে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকারের ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায় ফ্রান্স। কিন্তু জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, 'আসাদের ভাগ্য নির্ধারণের কথা বলার আগে সমস্যাগুলো স্পষ্ট করতে হবে।' ফরাসি প্রেসিডেন্ট ওলন্দ ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি 'নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সামরিক হস্তক্ষেপ' সমর্থন করবেন।
বার্লিন সরকার আসাদের বিষয়ে গোড়া থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করছে। সামরিক হস্তক্ষেপের আগে তারা শুধু রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণই চায় না, সিরিয়া সরকারই যে এটা চালিয়েছে এবং সরকারের ভেতর কার নির্দেশে এটা হয়েছে তার বিস্তারিত প্রমাণ দাবি করে। অবশ্য কূটনৈতিক বক্তব্য তাদের অন্য রকম। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের মুখপাত্র স্টেফেন সিবার্ট জানান, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার 'আন্তর্জাতিক নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘন। এর সাজা অবশ্যই পেতে হবে। এর বিচার না করে থাকা যায় না।'
রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের যথার্থ সাক্ষ্য-প্রমাণ হাজির করা যে অসম্ভব একটি কাজ সেটা স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই স্পষ্ট। যদিও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে চলতি সপ্তাহের শেষেই আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে নতুন তথ্য-প্রমাণ হাজির করার কথা বলা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সিরিয়া নিয়ে একরকম উভয় সংকটের মধ্যেই পড়েছে। ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান ক্যাথরিন অ্যাশটন স্বীকার করেছেন, ২৮ দেশের এই জোটের পক্ষে বিষয়টিতে ঐকমত্যে পৌঁছানো আসলেই বড় সমস্যা। তাঁর মতে, সামরিক হস্তক্ষেপ করতে হলে তাতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সমর্থন 'অত্যন্ত জরুরি'। ইউরোপের বেশির ভাগ দেশই হয়তো এতে সমর্থন করবে, কিন্তু জাতিসংঘে এর সমর্থন আদায় করা যাবে না। কারণ রাশিয়া সিরিয়ায় বাইরের হস্তক্ষেপের বিরোধী। বৈশ্বিক ইস্যুতে ইইউর মতো একটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা সীমিত থাকায় ইউরোপের কোনো কোনো দেশ বিরক্তও। রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে সিরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়টি আবার ইউরোপের অনেককেই সাম্প্রতিক ইতিহাস মনে করিয়ে দিচ্ছে। ইরাকে হামলার আগে তাদের হাতে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে বলা হলেও পরে সেখানে তেমন আলামত পাওয়া যায়নি। তাই সামরিক হস্তক্ষেপকে বৈধতা দিতে হলে তা অবশ্যই মানবিক প্রেক্ষাপট কিংবা আন্তর্জাতিক বিধিমালা লঙ্ঘন কিংবা রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার যে অভিযোগই হোক না কেন, তার যথার্থতা প্রমাণ করতে হবে।
এদিকে ওবামাও বৈশ্বিক পুলিশের ভূমিকায় থাকতে অনিচ্ছুক। সিরিয়া সংঘাতে এ পর্যন্ত এক লাখ ১০ হাজার মানুষ মারা গেছে। আহত হয়েছে এরও দ্বিগুণ। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ প্রতিবেশী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই মনে করেন, সিরিয়া বিষয়ে ওয়াশিংটনের উদাসীনতাই আসাদকে 'বেপরোয়া' করে তুলেছে। কিন্তু ওবামা বলেছেন, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রশ্নটিই সিরিয়ার পরিণতি বদলে দেবে। কিভাবে আসাদ সরকারকে শাস্তি দেওয়া যায় এবং সিরিয়ায় তাদের (পশ্চিমা) নির্ধারিত 'পরিণতিকে' কিভাবে রাসায়নিক অস্ত্রের সঙ্গে যুক্ত করা যায় সে ব্যাপারে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে তারা।
এমন অবস্থায় ইউরোপের কাছে সিরিয়া সংকট একটি অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দেখা দিয়েছে। জার্মানি কী ভূমিকা পালন করে কিংবা যুক্তরাষ্ট্র তাদের পক্ষে ইউরোপের কাকে কাকে পাশে পায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যুদ্ধ ঘোষণা না করে তারা যদি সিরিয়ায় সীমিত অভিযান চালায় তাতে কি আসাদের পতন ঘটানো যাবে?
এদিকে আসাদও পশ্চিমাদের আগ্রাসনের সাম্প্রতিক ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন, 'মহাশক্তিমানরা (পশ্চিমা জোট) যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে। কিন্তু তারা কি এ যুদ্ধে জিততে পারবে?'