ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 16:52

এবার ইউরোপ নিয়েও শঙ্কা

Rate this item
(0 votes)

অনেক ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নেও বাংলাদেশের জিএসপি নিয়ে শঙ্কা দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রে সেই সুবিধা স্থগিত হওয়ায় এবার ইউরোপে জিএসপি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে।

গত ১১ জুন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠক করে বিজিএমইএ। পোশাক খাতের উন্নয়নে সত্যিকার কিছু করা না হলে যে বিপদে পড়তে হবে সেই ইঙ্গিত দেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেলিগেশনপ্রধান উইলিয়াম হানা। ওই বৈঠক শেষে যৌথ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, "এখন বাংলাদেশের পোশাক খাত একটি 'টার্নিং পয়েন্টে' আছে এবং এটা টার্নিং পয়েন্ট হতেই হবে। এখান থেকে পোশাক খাতকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। আর এ ক্ষেত্রে আমরা বাংলাদেশের পাশে থাকব।" তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ যে অঙ্গীকারগুলো করেছে, তার সত্যিকার বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিজিএমইএর ভূমিকা মুখ্য। পাশাপাশি ক্রেতাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার। ২০১১-১২ অর্থবছরে বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি করে দুই হাজার ৪৩০ কোটি ডলার আয় করেছিল। এর মধ্যে ইউরোপে রপ্তানি হয়েছিল এক হাজার ২৭৪ কোটি ডলারের পণ্য। এর ৮০ শতাংশই আবার পোশাক। ফলে ইউরোপে জিএসপির কিছু হলে বাংলাদেশের পোশাক খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব হবে মারাত্মক।
যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি বাতিল বা স্থগিত হলে তার প্রভাব যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডাসহ অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়তে পারে, এমন আশঙ্কা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা আছে। বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদ মাস দুয়েক আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো এক প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপির আওতায় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ খুবই কম। তাই এই সুবিধা বাতিল বা স্থগিত হলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি খুব একটা হয়তো কমবে না। তবে এতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডাসহ অন্যান্য দেশে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশে কেবল অস্ত্র বাদে বাংলাদেশের সব পণ্য শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাচ্ছে। একই ধরনের সুবিধা দিচ্ছে কানাডাও।
একই রকম শঙ্কার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিনও। তিনি বলেন, 'আমাদের ভয় আমেরিকার বাজার নিয়ে নয়। ইউরোপ বা কানাডাসহ যেসব দেশে আমাদের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তের প্রভাব ওই সব দেশের ওপর পড়ে কি না, এই নিয়ে শঙ্কা আছে। আমরা আশা করছি যুক্তরাষ্ট্রের মতো অন্য দেশ এমন সিদ্ধান্ত নেবে না।'
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা বিভাগের প্রধান ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউরোপের সঙ্গে সরকারের একটি বোঝাপড়ার চেষ্টা চলছে। তবে ওই সব দেশের জনগণও দেশগুলোর সরকারকে চাপে ফেলার সুযোগ পাবে। রানা প্লাজা ও তাজরীনের ঘটনার পর সরকার কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা তাদের জানানো হয়েছে। তবে সব কিছু নির্ভর করবে সরকার ও বাণিজ্য সংগঠনগুলো যেসব উদ্যোগ নিয়েছে তার ধারাবাহিকতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়নের ওপর।
গত এপ্রিলে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিরাপত্তা নীতি ও পররাষ্ট্রবিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ (উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি) ক্যাথরিন অ্যাশটন ও বাণিজ্য কমিশনার ক্যারেল ডি গুশট যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ইইউ যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে, যেখানে বর্তমানে জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) ও 'এভরিথিং বাট আর্মস' স্কিম ব্যবহারের কথা ভাবা হচ্ছে। 'জিএসপি' ও 'এভরিথিং বাট আর্মস'- স্কিমের আওতায় বাংলাদেশি পণ্য ইইউর বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার সুবিধা পায়। তার পরেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ইউরোপীয় ইউনিয়নে গিয়ে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা রক্ষায় জোর অনুরোধ করে এসেছেন।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা ও তাদের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে এক চিঠিতে জানিয়েছে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতারাও বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির ব্যাপারে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমদানিকারকদের সংগঠন ফরেন ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা ব্রাসেলসে বাংলাদেশ দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর তপন কান্তি ঘোষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানিয়ে দিয়েছেন, স্থানীয় ক্রেতাদের চাপে বাংলাদেশের নন-কমপ্লায়েন্স কারখানা থেকে পোশাক আমদানি করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় ইউরোপের বাজারে রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে করণীয় নির্ধারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দিয়েছে ব্রাসেলস দূতাবাস।
বাণিজ্যসচিব মাহবুব আহমেদের কাছে লেখা চিঠিতে তপন কান্তি ঘোষ বলেছেন, ইউরোপের ফরেন ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের মহাপরিচালক (ডিজি) জন ই ইগার্ড ও সোশ্যাল কমপ্লায়েন্স ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) লরেন্স বাগঝু ২০ ডিসেম্বর ব্রাসেলসে বাংলাদেশ দূতাবাসে আসেন। সেখানে বাংলাদেশের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর তপন কান্তি ঘোষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁরা বলেছেন, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত। তাজরীনে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই ইউরোপের ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানিকারকদের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। শ্রমিক অধিকার রক্ষা হয় না এমন কারখানাগুলোর পাশাপাশি কমপ্লায়েন্স নয় এমন কারখানা থেকেও পোশাক আমদানি না করার জন্য ক্রেতারা চাপ দিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপের ক্রেতাদের পক্ষে বাংলাদেশের নন-কমপ্লায়েন্স কারখানা থেকে পোশাক আমদানি করা সম্ভব হবে না।