ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 19:46

এশিয়ার চ্যালেঞ্জ ও আশার রশ্মিরেখা

Rate this item
(0 votes)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নবোদ্ভূত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক সমস্যা এবং সেসবের গুরুত্ব ও অগ্রাধিকারের বিচারে এশিয়ার ভূ-রাজনীতি সাগরসদৃশ পরিমাণে পরিবর্তিত হয়েছে। এ যুদ্ধোত্তর সময়ই সত্যিকারের স্নায়ুযুদ্ধ পূর্ব-পশ্চিম সংঘাতের মধ্য দিয়ে এশিয়ার দৃশ্যপটেই মঞ্চস্থ হয়। এশিয়ার মাটিতেই এ সংঘাতের কতগুলো ভয়ংকর বিস্ফোরণ এবং বিগত শতাব্দীর দীর্ঘতম যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধের অন্তর্ভুক্ত ছিল কোরিয়া উপদ্বীপ ও ভিয়েতনামের ঐতিহাসিক সংঘর্ষ। আরো ছিল লাওস ও কম্বোডিয়ার প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব। এ সময়ই শ্বাসরুদ্ধকর কয়েকটি আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধ, তিন তিনটি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধও তাদের যুগান্তকারী ছাপ এশিয়ার রাজনৈতিক

মানচিত্রে রেখে যায়। ইতিমধ্যে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আফগানরা যুদ্ধ করেছে। কুয়েতে সাদ্দাম হোসেনের দখলের বিরুদ্ধে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ হয়েছে। এরই সম্প্রসারিত ও প্রলম্বিত অংশ হিসেবে মার্কিনিরা ইরাক আক্রমণ ও দখল করেছে। এ মুহূর্তে বৈশ্বিক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আফগানিস্তানে চলছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর একটি দীর্ঘতম পুরোদস্তুর যুদ্ধ।
এশিয়া একটি বিশাল অঞ্চল, যেখানে বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বাস করে। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ ভৌগোলিক পরিসরজুড়ে এ মহাদেশের বিস্তৃতি। এ বিচিত্র মহাদেশে রয়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এবং ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত অঞ্চল। এখানে আছে দারিদ্র্যপীড়িত এবং উত্তেজনা ও অস্থিরতাপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া, সম্পদসমৃদ্ধ কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিকর মধ্য এশিয়া, অর্থনৈতিকভাবে উত্থানরত পূর্ব এশিয়া, দ্রুত পরিবর্তনশীল এক অস্থির মধ্যপ্রাচ্য। আরো রয়েছে জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় অঞ্চল।
উলি্লখিত প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে সভ্যতার বন্ধনে আবদ্ধ জ্ঞাতিত্ব আছে এবং এ অঞ্চলের মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। হতে পারে তা পারস্পরিক পরিপূরক বা সম্পূরকের পরোক্ষ পথে, যা আপাতদৃষ্টিতে দৃষ্টিগোচর নাও হতে পারে। ফলে এখানকার বিশাল ভৌগোলিক পরিসর একটি তুলনাবিহীন কৌশলগত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল তাই সর্বদা বিশ্বের ফোকাসে। বিশেষ করে এশিয়ার বাইরের শক্তিরা সব সময়ই এ অঞ্চলগুলোকে কিছুটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সঙ্গে নিরীক্ষণ করে। কারণ এ অঞ্চলগুলোর প্রায় সবটারই একটি অবাধ্যতার ইতিহাস আছে, আছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। এগুলোর প্রতিটিরই পারস্পরিক ইস্যু অগুনতি।
নয়-এগারো পরবর্তী বিশ্ব তার সংকটের ধরন ও গুরুত্বে অভাবনীয় পরিবর্তন দেখছে? সব জাতিসত্তা ও দেশ তিক্ত বৈরী সম্পর্ক পরিহার করে শান্তিকে আলিঙ্গন করতে চায়। তবু এশিয়ার প্রধান অঞ্চলগুলো এখন বৈশ্বিক উত্তেজনার উৎসস্থল। দীর্ঘ সময়ের এশীয় ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিন প্রশ্ন, কাশ্মীর ইস্যু, কোরিয়া উপদ্বীপে অব্যাহত উত্তেজনা, অমীমাংসিত তাইওয়ান বিরোধ এবং জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের একটি ত্রিভুজাকার সম্পর্ক। একটি সম্প্রসারিত আঞ্চলিক প্রসঙ্গে তা ভারত ও রাশিয়ার অন্তর্ভুক্তিতে একটি পঞ্চকোণী সম্পর্কেও পরিণত হতে পারে। এশিয়ার কোনো কোনো অংশে অসংখ্য উত্তেজনা ও অস্থিতিশীলতার শাখা বিস্তার হতে পারে বিস্তর, যা বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বিঘ্ন হবে।
এশিয়ার চলমান উত্তেজনা ও সংঘর্ষ এখনো আমেরিকার অসমাপ্ত ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধে নিহিত। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার পারমাণবিক সহযোগিতা, ইরানের পারমাণবিক লিপ্সার সংকট, উত্তর কোরিয়ার কথিত পারমাণবিক ও আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণে সাফল্য এবং এ ইস্যুতে ছয় দেশীয় আলোচনায় অচলাবস্থা এবং এতদঞ্চলে নিষ্পত্তিহীন অন্যান্য বিরোধ, যার মধ্যে রয়েছে জাপান-রাশিয়া-চীন-দক্ষিণ কোরিয়া ভৌগোলিক সীমান্ত বিরোধ।
বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ভারসাম্য বিন্যাসে আমেরিকার ইউনিপোলারিটি একটি প্রধান সংকট। এককালের যৌথ নিরাপত্তা (Collctive Security) এবং জাতিসংঘ সনদের আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো এখন একপাক্ষিতার (Unipolarity) গুরুভারে নিষ্পেষিত, অচল। ঐতিহাসিক অভিযোগ ও অমীমাংসিত বিরোধগুলো এখন অব্যাহতভাবে উপেক্ষিত। ঊনবিংশ শতাব্দীর অর্থনৈতিক অ্যাডভেঞ্চার আবার ফিরে এসেছে।
এ দৃশ্যপটকে যা আরো জটিল করে তা হলো, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান অক্ষমতা। ইরাক এখনো রোষানলে দগ্ধ হচ্ছে। আফগানিস্তানেও এখনো নেই কোনো শান্তির সুবাতাস। কাশ্মীরকে ঘিরে অনেক বিবর্তনের পর বিতর্কিত এ ভারতীয় রাজ্যটি এখনো তার আপন বৃত্তে, যা সব পক্ষেরই মোহভঙ্গ না করে পারেনি। জার্মানি স্নায়ুযুদ্ধের পর পুনর্মিলিত হতে পেরেছে, কিন্তু বিভক্ত কোরিয়া তা পারেনি।
এশিয়ায় এ মুহূর্তে একমাত্র আশার আলো দেখাচ্ছে চীন। বিশ্ব সম্প্রদায়ের শক্তির স্তম্ভ হিসেবে চীন ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যই শুধু নয়, কোনো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ানোর জন্যও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় নেমেছে। একটি শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ চীনই এখন শুধু এশিয়ার নয়, বিশ্বের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি। স্নায়ুযুদ্ধ সমাপ্তির পর থেকেই চীনের বৈদেশিক নীতিতে পরিবর্তন বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি এড়ায়নি। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানভিত্তিক এ চৈনিক নীতি আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর একটি অভিনব ছাপ রেখেছে। চীনাদের বিখ্যাত অভিজ্ঞানই এমন পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে থাকবে। এর ফলে একটি ঝুঁকিপূর্ণ দ্বন্দ্বে লিপ্ত না হয়ে চীন এবং পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়েছে। সুসম্পর্ক গড়েছে অন্যান্য বৃহৎ শক্তিসহ তার নিকট প্রতিবেশীদের সঙ্গে। ভারতও এর অন্তর্ভুক্ত, যদিও পঞ্চাশের দশকে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে দেশ দুটি যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। ওই বিরোধের পূর্ণ নিষ্পত্তি না হওয়া সত্ত্বেও অন্য সব ক্ষেত্রে দেশ দুটির মধ্যে সহযোগিতা বিদ্যমান। যুক্তরাষ্ট্রের মতো অযথা কলহে শক্তিক্ষয়ের পক্ষপাতী নয় চীন, বরং একটি অনুকূল সময়ে শক্তি ক্ষয় ছাড়াই সহযোগিতার পথ ধরেই নিষ্পত্তি আসতে পারে বলে চীনাদের বিশ্বাস।
এমন বিশ্বাসের ওপর ভর করেই রাশিয়ার সঙ্গে চীন তার অনেক বিরোধের সমাপ্তি ঘটিয়েছে। শুধু তাই নয়, রাশিয়াসহ সব পার্শ্ববর্তী দেশকে নিয়ে সাংহাই সহযোগিতার নামে চীন ইউরেশিয়ার বিশাল অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে প্রতিহত করেছে। চীন আসিয়ান (ASEAN) দেশগুলোর সঙ্গেও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে এবং আসিয়ান আঞ্চলিক ফোরামের একটি সক্রিয় সদ্য হিসেবে এ গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিক সংগঠনে চীনকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
বিগত বছরে চীন প্রায় সব এশীয় দেশের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের সফর বিনিময় করেছে। এতে ভারত ও পাকিস্তানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আগামী বছরে চীন ও পাকিস্তান নাকি তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৬০তম বার্ষিকী উদ্যাপন করবে। তবে চীন মোটেই অজ্ঞ নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের নবলব্ধ এককেন্ত্রিকতা (Unipolarity) কী এবং কেমন সমস্যা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে জন্ম দিতে পারে। তা সত্ত্বেও চীন নিশ্চিত, একুশ শতক অনেক নতুন সম্ভাবনারও জন্ম দিতে পারে। চীন একবিংশ শতাব্দীর সুযোগ-সুবিধার মধ্যে সভ্যতার অনেক অগ্রগতির চিহ্ন শনাক্ত করে। চীন তার নিজের জন্য আরো কয়েক যুগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং গণতন্ত্রের বিকাশে নিজেদের নিয়োজিত রাখতে চায়। শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে যুগোপযোগী করে তাকে একটি বিশ্ব মানে পেঁৗছাতে চায়। সর্বোপরি জনগণের জীবন-মানের উন্নয়ন চীনের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক একটি এজেন্ডা।
আন্তর্জাতিকভাবে চীন নিঃসন্দেহে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি স্থিতিস্থাপক শক্তি। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি প্রধান নিষ্পত্তিকারক হিসেবে চীনের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। কোরিয়া উপদ্বীপে একটি ত্রিদেশীয় এবং ছয় পক্ষবিশিষ্ট আলোচনার অন্যতম সংগঠক হিসেবে চীন কোরিয়া উপদ্বীপের পারমাণবিক ইস্যুর নিষ্পত্তি প্রচেষ্টারত। চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সক্রিয় সদস্য।
আজকের বিশৃঙ্খল বিশ্বে মার্কিনিদের Longwar Concept এবং চীনাদের Rising peacefully-র একটি চমৎকার মিশ্রণ এখনকার শান্তি ও সংঘাতের পরিমিতি নির্ণয়ে সহায়ক। এটাই নতুন বিশ্বব্যবস্থার নকশা তৈরি করবে। তবে এ নকশা স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার থেকে অবশ্যই ভিন্ন হবে। একইভাবে ভিন্ন হবে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা থেকে। এশিয়া নির্ণীয়মান সেই নকশায় সঠিকভাবেই পূর্ব দিগন্তের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এশিয়ার কাছে।
এ জন্য অবশ্য ভারতকে তার আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের মন্ত্র থেকে সরে আসতে হবে। এতে চীনের দৃষ্টান্ত শিক্ষণীয় হতে পারে। জনগণের জীবনমান উন্নয়নে শক্তি ও সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও চীন এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জড়াতে চায় না_আধিপত্যবাদ তো দূরের কথা। কিন্তু রাজনীতির বিছুটি চীন হয়তোবা শেষ পর্যন্ত এড়াতে
পারবে না।