ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 19:39

সভ্যতার দিকে পা বাড়াতে চাই

Rate this item
(0 votes)

মনে হয় থাকবে শুধু মানুষ আর ব্রয়লার মুরগি। বিশেষ করে এশিয়া এবং আফ্রিকা মহাদেশের জনগণ নিজেদের এমনই এক অবস্থানে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। আফ্রিকার হাতি বা সুন্দরবনের বাঘ দেখতে হলে আপনাকে গিয়ে হাতে-পায়ে ধরতে হবে মার্কিন দূতাবাস বা ব্রিটিশ দূতাবাসে। যদি তারা বুঝতে পারে আপনার পকেটভরা টাকা আছে বা যদি আপনার ভাগ্য ভালো থাকে, তাহলে জুটবে একটি ভিসা। লক্ষাধিক টাকায় (এখনকার বাজারমূল্যে। যে হারে ডলারের দাম বাড়ছে, মুদ্রাস্ফীতি ঘটছে তাতে ১০ বছর পর হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের টিকিটের দাম হবে ১০ লাখ টাকা!) কাটবেন টিকিট। তারপর নিজের বাড়ির হাতি বা বাঘ ১০ হাজার মাইল দূরে দেখে এসে গল্প করবে অন্যদের কাছে।
সত্যিই এমন দুর্ভাগ্যের দিকে নিজেদের ঠেলে দিচ্ছি

আমরা। যে হারে আফ্রিকা এবং এশিয়ার অসাধারণ সব জীবজন্তু হারিয়ে যাচ্ছে তাতে বেশি সময় লাগবে না। ২০১১ সাল আফ্রিকা মহাদেশ ছিল হাতির জন্য এক নরকরাজ্য। হাতির অভয়ারণ্য পরিণত হয়েছে হত্যার পীঠস্থানে। সংবাদটি বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে দেখা গেছে। গত বছর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ মোট ২৩ টন আইভরি (যাকে আমরা হাতির দাঁত বলি) জব্দ করেছে পাচারকারীদের কাছ থেকে। অনুমেয়, এই ধরা পড়া হাতির দাঁতগুলো সংগ্রহ করতেই কত হাতি শিকারিরা হত্যা করেছে। সামান্য দু-তিন কেজি ওজনের আইভরি দুটি সংগ্রহ করতে বিশালদেহী, দীর্ঘায়ু এবং প্রকৃতির অতি রহস্যময় প্রাণীটিকে শিকারিরা নির্বিচারে হত্যা করে দাঁত দুটি কেটে নেয়। আফ্রিকার দুর্বল ও দুর্নীতিপরায়ণ সরকারগুলো এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করে না। অথচ ১৯৮৯ সালে আন্তর্জাতিকভাবে আইন করে আইভরি বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গণ্ডারের থাকে একটি মাত্র শিং। ঠিক নাকের ওপর, কপালের নিচের এই শিংয়ের ওজন বড়জোর এক কেজি। এই এক কেজি ওজনের শিংটি সংগ্রহ করতে নিষ্ঠুরভাবে বিশালদেহী গণ্ডার হত্যা করে শিকারিরা।
আফ্রিকা মহাদেশে এই হাতি ও গণ্ডার হত্যা করা হয়ে থাকে এশিয়ার মানুষের চাহিদার কারণে। এশিয়ার নানা দেশে কুসংস্কারবশত হাতির দাঁত এবং গণ্ডারের শিং দিয়ে তৈরি করা হয় নানা ধরনের ওষুধ-মালিশ। ধনী বা শৌখিন এশিয়ানরা হাতির দাঁতের ওপর নানা শৈল্পিক কারুকাজ করা আসবাব, শো-পিস ও অলংকার পছন্দ করে থাকে। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এসব দাম দিয়ে কেনার লোক তৈরি হওয়ায় বিপদ নেমে এসেছে হাতি-গণ্ডারসহ প্রকৃতির। আফ্রিকা মহাদেশে সর্বাধিক পরিমাণ ৯০ শতাংশ গণ্ডার এখন বেঁচে আছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। সে দেশেই গত বছর প্রায় ৫০০ গণ্ডার হত্যা করা হয়েছে। অথচ এই মহাদেশে ইউরোপীয়রা যখন উপনিবেশ তৈরি করে, তখন সেখানে গোটা মহাদেশে হাতির সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ থেকে এক কোটি। এখন আফ্রিকায় হাতির সংখ্যা নেমে এসেছে ছয় লাখে। তারও আগে, চার কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে টিকে থাকা এই হাতির ৬০০ প্রজাতি ছিল। এখন টিকে আছে মাত্র তিনটি প্রজাতি। এই অতি বুদ্ধিমান প্রাণীটি বেঁচে থাকে ৬০ বছরের বেশি সময়।
আফ্রিকার অন্ধকারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে গৌরবময়, বিরল প্রজাতির রয়েল বেঙ্গল টাইগার নিধন করেছি। অবহেলা, অসচেতনতা, বাণিজ্যলোভে শিকার এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে কোনোক্রমেই দেশের পশুসম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হয়ে উঠছে না। কিছুকাল আগে বাঘ নিয়ে একটি নিবন্ধ লেখার পর জনৈক পাঠক আমাকে একটি ই-মেইল পাঠিয়ে তিরস্কারের ভাষায় মন্তব্য করেছিলেন, 'যে দেশে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই, সেখানে আপনি বাঘের নিরাপত্তা চাচ্ছেন?' তাঁর সে প্রশ্নের উত্তর হলো, আমি হলফ করে বলতে পারি, যে জাতি তার জীববৈচিত্র্যের যত্ন নেবে বা নেয়, সে জাতির নিরাপত্তা বিঘি্নত হওয়ার কোনো কারণ নেই! ভাইরে, বললে খারাপ শোনা যাবে, যে জাতি বিরল প্রজাতির কোনো প্রাণী দেখলে তাকে খুঁচিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করে, এমনকি যে জাতি মাইকে ডেকে ছয়জন মানুষকে একসঙ্গে পিটিয়ে মারে_সে জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি এত সোজা?
যাহোক, অন্য প্যাঁচালে গিয়ে দরকার নেই। তবে বাঘ রক্ষা করা যেত। মানুষকে মানুষের হাত থেকে পাহারা দিয়ে রক্ষা করার চেয়ে বন্য পশু রক্ষা সহজতর। অত মেহনত দরকার পড়ে না। আইন করে এবং নির্দিষ্ট এলাকায় কড়া পাহারার ব্যবস্থা করেই প্রাণী নিধন সম্ভব। বাঘের চামড়াসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ চীন দেশে খুব চাহিদা। রয়েল বেঙ্গল টাইগার হলে তো কথাই নেই। তাই রয়েল বেঙ্গল টাইগার তাদের একমাত্র আবাসস্থল সুন্দরবনেই নিরাপদ নয়।
এশিয়ার মধ্যে জীববৈচিত্র্যে দরিদ্রতম অবস্থা বাংলাদেশের। দেশে মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয় আছে, মৎস্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু মৎস্য নেই। শুনতে অবাক শোনাবে, শকুন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের অনেক পিঁপড়ার প্রজাতিও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক এক গবেষণা থেকে জানা গেছে, সম্প্রতি বিশ্ব থেকে প্রায় ১১ হাজার প্রজাতির প্রাণী হারিয়ে গেছে এবং তার বেশির ভাগই এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে। আরো অসংখ্য প্রজাতির জলজ ও স্থল প্রাণী বিলুপ্তির পথে।
একজন শিক্ষিত মানুষ আমাকে একাধিকবার যুক্তি দাঁড় করিয়ে বলেছেন, বাঘ প্রকৃতির এমন কী কাজে লাগছে! বরং এগুলো হরিণ খেয়ে সাবাড় করে। অথচ আমরা একটি হরিণ খেতে পারি না। সুন্দরবনে বাঘ না থাকলে যে পরিমাণ হরিণ উৎপন্ন হতো তার একটি অংশ দিয়ে দেশের মাংসের চাহিদা কিছুটা মেটানো যেত! আমি এই ভয়ানক যুক্তির কোনো উত্তর দিইনি। চিন্তা কাছাকাছি থাকলে যুক্তিতর্কে যেতে হয়। উত্তর মেরু-দক্ষিণ মেরু হলে চেপে যেতে হয়। আমরা শত শত বছর ধরে দেখে আসছি মানুষ যখন নিজের স্বার্থে অন্যায় করে তখন তার পেছনে শক্তিশালী যুক্তি দাঁড় করে নৈতিক মনোবল তৈরির জন্য। মানুষের ভাতের অভাব হয় মানুষের দোষে, বন্য প্রাণীর দোষে নয়। নিজের দোষে সৃষ্ট অভাব পূরণে বনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব, এটি কোনো যুক্তি?
এক ভদ্রলোক দেখা হলে প্রায়ই বলেন, 'আমরা পাই না মাছ, আর পরিযায়ী পাখি (মাইগ্রেটিং বার্ডস) দেশে এসে টনকে টন মাছ খেয়ে চলে যায়। আমাদের উচিত এগুলো খেয়ে ফেলা!'
একটি সাইবেরিয়ার পাখি বাংলাদেশ পর্যন্ত যখন হাজার হাজার মাইল উড়ে আসে তখন পথে চম্বলের ডাকাতদের মতো ওত পেতে থাকা চিল, বাজপাখি এসবের সম্মুখীন হতে হয় একাধিকবার। হিমালয় পার হওয়ার সময় বৈরী প্রকৃতির সঙ্গে জীবন-মৃত্যু যুদ্ধ করে পার হতে হয়। শুনেছি প্রতিবছর এই পাখিগুলো হাজার হাজার মাইল পথ উড়ে আসতে এবং ফিরে যেতে যেই গাছে বসে বিশ্রাম নেয়, আবার পরের বছর ঠিক সেই গাছে সেই ডালে এসে বসে। প্রকৃতির এ ডিজাইনের কোনো মূল্য নেই? এতটুকু ভূমিতে সাত কোটি মানুষ ১৬ কোটিতে পরিণত হয়ে শুধু খাই খাই করব আর তার খেসারত দেবে প্রকৃতি?
চীনও কিন্তু ভাবতে পারত, পান্ডা না থাকলে কী হয়? চীনের মধ্য ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাস করা বিরল সাদা-কালো রঙের ভালুকের প্রজাতি পান্ডা বিলুপ্তির পথে ছিল। সংখ্যায় ভয়াবহ রকমের কমে গিয়েছিল। এই পান্ডা এখন বাড়তে শুরু করেছে। লাখ লাখ ডলার ব্যয় এবং চীন সরকারের যত্নের ফলে। গণচীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটি ১৯৮৭ সালে বন আইনকে বর্ধিত করে এনভায়রনমেন্টে প্রোটেকশন ল' পাস করে অপরাধ আইনের সংশোধনের মধ্য দিয়ে। সে আইনে বলা হয়, পান্ডা পাচারকারী এবং পান্ডা শিকারিদের শাস্তি হবে সর্বনিম্ন ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং সহায়-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। চীনের আদালত ঘুষ খান না। সুতরাং অপরাধীরা জানে, বাঁচার কোনো উপায় নেই।
চীন এবং ইউরোপের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈরিতা থাকলেও একটি বিষয়ে বড় মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। তা হলো পান্ডাসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষা। সম্প্রতি শিয়াং শিয়াং এবং ইয়াং গুয়াং নামের দুটি পান্ডা চীন থেকে বেড়াতে গিয়েছে এডিনবার্গ চিড়িয়াখানায়। স্কটল্যান্ডের সরকার ওয়েলকাম পার্টি উপলক্ষে ৪৩ হাজার পাউন্ড খরচ করেছে। ইংরেজের দেশে আদর করে শিয়াং শিয়াংকে ডাকা হচ্ছে সুইটি নামে আর ইয়াং গুয়াংকে সানলাইট নামে। চীনের ভাষায় ওদের নামের অর্থ ওটাই। স্কটল্যান্ডের সরকার মনে করছে পান্ডাই চীন ও স্কটল্যান্ডের বন্ধুত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
প্রাণী শুধু প্রাণীই নয়, দেখতে-জানলে হতে পারে বনু্লত্বের প্রতীক। আফ্রিকার কথা জানি না, বাকি এশিয়ার কথা জানি না। একজন বাংলাদেশি হিসেবে দেশের বন্য প্রাণীকে সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে দেখতে চাই। সভ্যতায় পিছিয়ে থেকে অন্যদের সমালোচনা করা থেকে দূরে সরে আসার সময় হয়েছে আমাদের সভ্য নাগরিক হিসেবে। আসুন, আমরা সে চেষ্টাই করি।