ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 19:17

পরাশক্তি-আগ্রাসন ঠেকাতে দরকার এশীয় ঐক্য

Rate this item
(0 votes)

এশিয়া পৃথিবীর মানচিত্রে সর্ববৃহৎ মহাদেশ হিসেবে চিত্রিত। শিশুপাঠ্য বইতে কথাটি ছোটবেলায় সবাই পড়েছি। তবে শিল্পবিপ্লবের চাহিদা মেটাতে ইউরোপীয় বহুজাতিক উপনিবেশবাদীদের অভিযান, বোম্বেটেদের আক্রমণ, বণিক চাতুরি ও চক্রান্ত-প্রতারণার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে একদা সমৃদ্ধ এশিয়া। যেখানে সোনা, যেখানে সমৃদ্ধি, সেখানেই শিকারি দস্যুর নজর পড়ে। যেমন পড়েছিল শান্ত সমৃদ্ধ দক্ষিণ আমেরিকার প্রতি স্পেনীয় দস্যুদের। চক্রান্ত, প্রতারণা ও আঘাতের নির্মমতায় রক্তে ভেসে গিয়েছিল শান্ত জনপদ। খুব একটা ভিন্ন নয় আফ্রিকায় ইঙ্গ-ফরাসি নির্মমতা।


আর এশিয়া? মধ্যযুগে ভারতীয় সমৃদ্ধির ওপর নজর পড়েছিল সভ্যনামীয় একাধিক ইউরোপীয় দস্যুজাতির। স্কুলপাঠ্য টেঙ্ট বইতে পড়েছিলাম: ইউরোপে জনশ্রুতি- ভারত রূপকথার দেশ, সেখানে বাতাসে সোনা ঝরে। এমন বিশেষিত বাক্য মুঘল সম্রাট আকবর ও তাঁর সাম্রাজ্য সোনার ভারতবর্ষ সম্পর্কে। তাই ঝাঁকে ঝাঁকে সমুদ্রপথে ভেসে এসেছিল ইউরোপীয় দস্যুবণিকের দল। নানা চাতুর্যে ইংরেজরা একসময় দখল করে নেয় ভারতের একেকটি করে ভূখণ্ড। শুধু ভারতে নয়, এশিয়ার একাধিক দেশে ইউরোপের বিভিন্ন লুটেরা জাতির অভিযান চলেছে সম্পদের লোভে, মূলত সোনার আকর্ষণে।
এরপর এশিয়ার পরাধীন দেশগুলোতে দীর্ঘ অন্ধকার ছায়া। শতাধিক বর্ষে সে ছায়া গভীর ঘন হয়েছে। অর্থ ও সোনা পাচারের ফলে নিরক্ত হয়েছে এশিয়ার পরাধীন দেশগুলো। দমন, পীড়ন, নির্যাতনের প্রতিক্রিয়ায় দেখা দিয়েছে প্রতিটি দেশে মুক্তিসংগ্রাম। পরাধীন দেশ মুক্ত স্বদেশে পরিণত হয়েছে কোথাও রক্তাক্ত লড়াইয়ের মাধ্যমে, কোথাও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে। কিন্তু উপনিবেশবাদের উত্তরাধিকার ঝেড়ে ফেলা রাজনীতি ও সংস্কৃতি থেকে বড় কঠিন কাজ। ভাষা ও সংস্কৃতিক্ষেত্রে হীনম্মন্যতা ও দাসমনোভাব চেতনার গভীরে অবস্থান করে। ব্যতিক্রম সংখ্যায় অল্প।
এই সেদিন এক বন্ধু খুব আবেগের সঙ্গে বলছিলেন: এশিয়া জাগছে, ধীরে হলেও জাগছে। এশিয়া একদিন ইউরোপকে টপকে যাবে, হয়তো বা আমেরিকাকেও এবং তা অর্থনৈতিক শক্তিতে। বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে, অস্ত্রশক্তিতে না হলেও। সাত দশক আগে (১৩৪৮) পহেলা বৈশাখে বিশ্বসভ্যতার পরিণাম ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্যবাদী চরিত্র উদ্ঘাটন করে ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন 'সভ্যতার সংকট' শীর্ষক আত্মসমালোচনামূলক নিবন্ধ।
সেখানে তাঁর প্রত্যাশা ছিল 'মহাপ্রলয়ের পরে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ ঘটবে', তাঁর ভাষায় 'পূর্বাচল' বা 'পূর্বদিগন্ত' তথা এশিয়া থেকে। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন ছিল একটি আদর্শ বিশ্বের, সংঘাতহীন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানমূলক বিশ্বের। সেটা এখনো স্বপ্নই, যা বাস্তবে দেখা দেওয়ার মতো নয়। কিন্তু ১৯৩৩ সালে 'ইউরোপীয় শক্তিমত্তার' সমালোচনা করে গভীর দুঃখে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন যে এশিয়াকে 'পাশ্চাত্যের সংঘবদ্ধ ক্ষমতা'র কাছে 'পরাজয় স্বীকার' করতে হয়, আত্মবিক্রয় করতে হয়। এ অবস্থার প্রতিরোধে এশিয়াকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
একুশ শতকে পৌঁছে ঐক্যবদ্ধ না হলেও এশিয়ার অন্তত কয়েকটি দেশ ইউরো-মার্কিন অর্থশক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে শুরু করেছে। এ ধীর-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বেশ আগে থেকেই। পণ্য উৎপাদন ও পণ্য বাণিজ্যে জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের আঘাত সামলে উঠে পশ্চিমা শক্তির মাথাব্যথার কারণ হয়ে ওঠে। মাহাথির মোহাম্মদের মালয়েশিয়া পণ্য-বাণিজ্যে কী দুর্বল অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশি বাজারের একাংশ দখল করেছে আধুনিক মালয়েশিয়ার পণ্য।
৬০ বছর আগে অন্যায় যুদ্ধে কোরিয়াকে বিভক্ত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। রাজনৈতিক কারণে অধীনস্থ দক্ষিণ কোরিয়াকে ঢালাও অর্থ সাহায্য দিতে হয় তাদের। সাহায্য করতে হয় শিল্পায়নে এবং 'ইতিহাসের অচেতন শক্তি' হিসেবেই বোধ হয় নিজদের অজান্তেই দক্ষিণ কোরিয়াকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে সাহায্য করতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে।
ছোটখাটো জিনিসপত্র থেকে উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প পণ্য উৎপাদনে জাপান বিশ্ববাজারে ঈর্ষণীয় স্থান দখল করে আছে। বিশেষ করে গাড়ি, কম্পিউটার ও ইলেক্ট্রনিক পণ্যে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও রয়েছে তার বাজার। দক্ষিণ কোরিয়াও এ সবের বেশ কিছু পণ্য উৎপাদনের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে চাইছে না। কিন্তু চীনকে ঠেকানো বোধ হয় কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক শক্তিই যে রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক শক্তির ভিত্তি, এই সহজ সত্য বুঝে নিয়ে চীন বিশ্ব প্রতিযোগিতায় নেমেছে তার রাজনৈতিক মতাদর্শকে পাশ কাটিয়ে। সম্ভবত বিশ্বের এক নম্বর অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার স্বপ্ন নিয়ে চীনের মতাদর্শগত চরিত্রবদল। আর এটা অনুধাবন করে এবং সে অর্জন প্রতিরোধে নেমে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। লক্ষ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে চীনকে কোণঠাসা করা।
সে জন্য তাত্ত্বিক দিক থেকেও আক্রমণে পিছিয়ে নেই ওয়াশিংটন। হান্টিংটনের 'সভ্যতার সংঘাত' অনেকটা তেমন উদ্দেশ্যের তত্ত্ব বলে ধরা হয়। এখানেই শেষ নয়। চীনকে আপাত-মিত্রের সারিতে রেখেই চীন-বিরোধিতায় প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরসহ এশিয়া মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্র শক্তিবৃদ্ধির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সে প্রচেষ্টার প্রথম সফল শিকার একদা জোটনিরপেক্ষ ভারত। এশিয়ার দুই নম্বর শক্তি হিসেবে বিবেচিত ভারত। পাকিস্তানকে তো তারা কব্জা করে সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই। এত দিন পর একসময়কার শত্রু-বিবেচিত ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের আণবিক মিত্র।
মূল লক্ষ্য চীনের চারপাশে বিরোধী প্রাচীর তৈরি করা। তাই এতকাল পর চীনের সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারকে বাগে এনে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। এটা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। সু চির গণতন্ত্র উপলক্ষ মাত্র। খনিজ সম্পদে মিয়ানমারও একটি উল্লেখযোগ্য ভূখণ্ড। সেটাও সম্ভবত নজরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু চীনা পণ্য যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজার দখল করে রেখেছে, তাতে তাকে ঠেকানো শুধু রাজনৈতিক প্রাচীর তুলে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। অর্থনীতিটা বড় নীতি।
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতি বিবেচনা করেই কি চীন ভারত সম্পর্কে নমনীয় নীতি গ্রহণ করতে চলেছে? একদা মিত্র ('হিন্দিচিনি ভাই ভাই') ভূখণ্ড-বিরোধে প্রবল শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও এশিয়ার এক নম্বর রাষ্ট্রশক্তি চীন পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব সম্পর্ক বজায় রেখেই ভারতের সঙ্গে মৈত্রী সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী; এশিয়ার শক্তিসাম্য যাতে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে হেলে না পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র যে এরই মধ্যেই মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে চীনের অন্দরে উঁকি দিতে চাইছে, বেইজিংয়ের সেটা না বোঝার কথা নয়।
রাজনৈতিক-কূটনৈতিক বিচারে চীনের উচিত হবে এশিয়ার এক নম্বর শক্তি হিসেবে দুই নম্বর শক্তি ভারতের সঙ্গে সংগত বোঝাপড়ায় যাওয়া এবং তা এশীয় স্বার্থ বিবেচনায়। রবীন্দ্রনাথ-কথিত ঐক্যবদ্ধ এশিয়া সম্ভব না হলেও জোটবদ্ধ এশিয়া গঠন সম্ভব। মধ্যপ্রাচ্য যদি ইঙ্গ-মার্কিন তাঁবেদারি থেকে মুক্ত হতে না চায়, তাহলেও বৃহত্তর দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট গঠন অসম্ভব নয়।
কারণ অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় এশীয় দেশগুলোর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এদের সূত্রবদ্ধতা ইউরো-মার্কিন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে এশিয়া যেভাবে এগিয়ে চলেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে এশিয়াকে সমীহ করে চলতে হবে ইউরো-আমেরিকাকে। 'ইকোনমিস্ট'-এর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে এশিয়ার অংশগ্রহণ ক্রমেই বেড়ে দ্রুতই ২০১২ সালে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে।
পুঁজিবাজার ও মুদ্রা সঞ্চয় ক্ষেত্রেও এশিয়ার রয়েছে অগ্রগণ্য ভূমিকা, যেখানে চীন সবার ওপরে। এশিয়ার এই অগ্রযাত্রা বজায় রাখা গেলে মহাদেশটি অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। পাশ্চাত্য জাত্যাভিমানও তাদের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে টেক্কা দেওয়ার এটিই সর্বোত্তম উপায়।
লেখক : কবি, গবেষক, ভাষা সংগ্রামী