ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 20:34

মরুর দেশে গাঢ় হচ্ছে বাংলার ছায়া

Rate this item
(0 votes)
মরুর দেশ মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমে বাড়ছে মূলত কর্মসংস্থানসূত্রে ও অংশত শিক্ষার জন্য যাওয়া বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। এর সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বিস্তৃত হচ্ছে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি। সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা বাংলার কৃষিও সবুজ করছে সাহারার ঊষর ভূমি।
 
আরব উপদ্বীপ তথা আজকের মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বঙ্গীয় ব-দ্বীপের
সম্পর্ক অনেক প্রাচীন। প্রথম দিকে আরব বণিকরা, পরে ইসলাম প্রচারক ও পরিব্রাজকরা এ অঞ্চলে এসেছেন। তাদের কেউ কেউ থিতুও হয়েছেন বাংলায়। ইসলাম প্রসারের পর বাঙালি মুসলিম জনগোষ্ঠী মূলত হজ ও ধর্মীয় শিক্ষার জন্য আরবে পাড়ি জমাতে শুরু করে। ভাষা হিসেবে আরবি ধর্মীয় কারণেই বাংলাদেশ ও ভারতের বিপুল বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত। একই কারণে আরবি জানা মানুষের সংখ্যাও বাঙালির মধ্যে বেশি।
 
এখনকার মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উইকিপিডিয়ার মতে, ৪০ লাখের ওপরে। বৈধ-অবৈধ ও অস্থায়ী বাংলাদেশি বাঙালি এবং ভারতীয় বাঙালি মিলে এই সংখ্যা ৫০ লাখের বেশি বলে কোনো কোনো সূত্র মনে করে। তাদের সিংহভাগ আসলে শ্রমিক; উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নার্স, ডাক্তার, শিক্ষক ও প্রকৌশলীও রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর অনেকে সপরিবারে বসবাস করেন। আরব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্তি্বক ছাড়াও অর্থনৈতিক সম্পর্কে দুস্তর ব্যবধান থাকায় সেখানকার বাঙালি জনগোষ্ঠী নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই সামাজিক অনুষ্ঠানাদি ও মেলামেশা করে থাকেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি ও বাঙালিদের মধ্যে বিয়ের নজিরও তৈরি হচ্ছে। ২০১৩ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত সৌদি বিচার বিভাগের বরাত দিয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখায় যায়, ওই বছর অন্তত ১৭ জন সৌদি নারী বাঙালি পুরুষকে এবং ২৭ জন বাঙালি নারী সৌদি পুরুষকে বিয়ে করেছেন।
 
মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাঙালি পরিবারগুলোর সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য ওই অঞ্চলের আটটি দেশ_ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, জর্ডান ও মিসরে বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত ছয়টি 'কমিউনিটি স্কুল' রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ সরকারের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পড়ালেখা ও পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় বলে এমন একটি স্কুলে পাঁচ বছর শিক্ষকতা করা বাঙালি তরুণী ফাতেমা আবেদীন নাজলা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ২০টির বেশি ব্যক্তিউদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত স্কুল রয়েছে, যেখানে আরবি ও ইংরেজি ছাড়াও বাংলা পড়ানো হয় দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে।
 
মধ্যপ্রাচ্যের বাঙালিরা বাংলা ভাষা চর্চার পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো বিশেষত একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করে আড়ম্বরপূর্ণভাবে। ইতিমধ্যে ওমানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি শহীদ মিনার। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে বাংলা ভাষাবিদ্বেষী গোষ্ঠী শহীদ মিনার তৈরি ও ফুল দেওয়াকে ধর্মবিরোধী আখ্যা দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। ওমানের শহীদ মিনার এর উপযুক্ত জবাব হিসেবে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। বিদেশের মাটিতে ঘোষণা করছে বাংলা ভাষার মর্যাদা এবং মাতৃভাষার প্রতি বাঙালি জনগোষ্ঠীর আবেগ ও আত্মত্যাগের কথা।
 
বিপুল বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাসের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বাঙালি দোকানপাট, রেস্টুরেন্ট যেমন গড়ে উঠেছে, তেমনই আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যেও প্রসারিত হচ্ছে বাংলা ভাষা। বাঙালি খাবারও ক্রমে জনপ্রিয় হচ্ছে আরবদের মধ্যে। তবে সবচেয়ে দ্রুত প্রসার লাভ করছে বাংলাদেশের কৃষি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, সৌদি আরবের তায়েফসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঙালিরা বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করে সেদেশের মানুষের সামনে হাজির করেছে এক বিস্ময়। ওমানের সালালাহ্ ও মাসকাটের আশপাশ এলাকায় শত শত বাংলাদেশি বিভিন্ন সবজি আবাদ করে সেদেশে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছেন। যে ওমান কিছুদিন আগেও নিত্যপ্রয়োজনীয় সবজির প্রশ্নে পুরোপুরি ছিল আমদানিনির্ভর, সেই ওমান এখন বাঙালি জনগোষ্ঠীর কল্যাণে তাদের মাটির সবজি রফতানিও করে। ওমানের কৃষিবাজার পুরোপুরি এখন বাঙালির দখলে। কাতারেও বিভিন্ন এলাকায় বাঙালি জনগোষ্ঠী কৃষি খামারে কাজ করতে করতে নিজেরাই উদ্যোক্তায় পরিণত হয়েছেন। কুয়েতের কেন্দ্রস্থল থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে ওয়াফরা এলাকা বাঙালি জনগোষ্ঠীর হাতের ছোঁয়ায় পরিণত হয়েছে কৃষি নগরীতে। বাংলার কৃষির এই অবদান কেবল বাঙালি জনগোষ্ঠীকে উদ্যোক্তাতেই পরিণত করছে না, মরুর দেশে সবুজ ছায়াও তৈরি করছে। বড় কথা, কৃষিজাত শাক-সবজির বাংলা নামের মাধ্যমে বাংলা ভাষা প্রবেশ করছে আরব বিশ্বের দৈনন্দিন জীবনে। মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমে গাঢ় হচ্ছে বাংলার ছায়া।