ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 20:32

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ

Rate this item
(0 votes)

তিউনিসিয়ায় শুরু হয়ে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে 'আরব বসন্ত' নামে আখ্যায়িত যেসব অভ্যুত্থান বিদ্যমান সরকারের বিরুদ্ধে ঘটেছিল, তার মধ্যে সরাসরি জনগণের শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তিউনিসিয়া ও মিসরে স্বৈরশাসকরা উচ্ছেদ হয়েছিল। মিসরের ঘটনাই এদিক দিয়ে ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মিসর মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব থেকে বড় ও শক্তিশালী মক্কেল রাষ্ট্রই নয়, ইসরায়েলের সঙ্গে তথাকথিত শান্তি চুক্তি সম্পাদনের কারণে তারা এ অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক বা রণনৈতিক মিত্র। রাজা ফারুককে তাড়িয়ে প্রথমে জেনারেল নগিব ও পরে কর্নেল নাসেরের সামরিক শাসন মিসরে শুরু হয়ে সেটা জারি থাকে হোসনি মোবারকের শাসন শেষ হওয়া পর্যন্ত। অর্থাৎ এই দীর্ঘ সময়ে মিসরের গণতান্ত্রিক সরকার বলে কিছু আসেনি। নগিব থেকে শুরু করে নাসের,

আনোয়ার সাদাত ও হোসনি মোবারকের সামরিক শাসনের অধীনেই মিসর শাসিত হয়েছে। নাসেরের শাসন সামরিক হলেও সেটা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কবলমুক্ত ছিল। তার মৃত্যুর পর আনোয়ার সাদাতের সময় মিসরে মার্কিন আধিপত্য এমনভাবে কায়েম হয়, যাতে সাদাত ইসরালেরের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি করেন এবং দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে মিসর শান্তি চুক্তি করাকে অন্যান্য আরব দেশে এবং মিসরের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আনোয়ার সাদাত মুসলিম ব্রাদারহুডের এক সদস্যের গুলিতে নিহত হন। তারপর হোসনি মোবারক ক্ষমতায় এসে সাদাতের নীতিই বহাল রাখেন। তার সময় মিসর আরও বেশি করে মার্কিনের ওপর নির্ভরশীল হয়। সমগ্র সামরিক বাহিনীর ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পায়। সামরিক বাহিনীকে মার্কিন সরকার আর্থিক ও অস্ত্র সাহায্য বৃদ্ধির কারণেই এটা সম্ভব হয়।

সামরিক বাহিনীর মাধ্যমেই মোবারক দীর্ঘদিন ধরে মিসরে তার শাসন বলবৎ রাখেন। ২০১০ সালে মিসরে মোবারকের শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান শুরু হলে মিসরীয় সামরিক বাহিনী সেই অভ্যুত্থান দমনের জন্য ব্যাপকভাবে রাস্তায় নামেনি। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ছাড়া জনগণের সঙ্গে তখন সামরিক বাহিনীর কোনো সংঘর্ষ ঘটেনি। সামরিক বাহিনী এক ধরনের অবলোকনকারী হিসেবেই দাঁড়িয়ে ছিল। সেই অবস্থায় মোবারকের বিরুদ্ধে জনগণের বিক্ষোভ সত্ত্বেও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো জনবিক্ষোভ তখন ছিল না। এটা ছিল এক মার্কিন কৌশল। তাদের বোঝার অসুবিধা হয়নি যে, তৎকালীন পরিস্থিতিতে মোবারককে রক্ষা করা কিছুতেই সম্ভব ছিল না। কাজেই তাকে রক্ষার জন্য সামরিক বাহিনীকে না নামিয়ে দূরে রাখাই তারা নিজেদের স্বার্থে প্রয়োজন মনে করেছিল। সামরিক বাহিনী মোবারকের পক্ষে দাঁড়ালে তারাও জনগণের বিক্ষোভ আন্দোলনের লক্ষ্যস্থানে পরিণত হতো। সামরিক বাহিনী এভাবে এক ধরনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিসরের ওপর তার নিয়ন্ত্রণের মূল হাতিয়ার সামরিক বাহিনীকে রক্ষা করতে পেরেছিল। এই বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে তারা মিসরে নিজেদের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল।

২০১৩ সালে মিসরে প্রথমবারের মতো একটি সাধারণ নির্বাচন হয় এবং তাতে মুসলিম ব্রাদারহুড জয়লাভ করে। তাদের নেতা মুরসি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। মুসলিম ব্রাদারহুড একট মুসলিম মৌলবাদী রাজনৈতিক দল। কিন্তু মিসরের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তারাই প্রথম থেকে সংগ্রাম করে এসেছে। এ জন্য নাসের তাদের নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও তাদের শক্তি তারা বজায় রেখেছিল। তারই প্রতিফলন ঘটে ২০১৩ সালের নির্বাচনে। এই নির্বাচিত সরকার সাদাতের আমলে মিসরের সঙ্গে ইসরায়েলের শান্তি চুক্তির বিরোধী ছিল। তারা এই চুক্তি বাতিলের পক্ষে ছিল। তারা ক্ষমতায় থাকলে চুক্তি বাতিল হতো। এটাই হলো মূল কারণ যে জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় মিসরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম নির্বাচিত সরকার উৎখাত করে আবার সেখানে সামরিক শাসন ফিরিয়ে এনেছে। এই সামরিক শাসনকে আইনসিদ্ধ করার জন্য সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি আসন্ন নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হচ্ছেন। তার বিজয় নিশ্চিত। এর ফলে দেখা যাবে যে, ২০১০ সালের বিশাল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে হোসনি মোবারকের সামরিক শাসন উচ্ছেদ করার পর সংক্ষিপ্ত এক নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের পর মিসরে আবার সামরিক শাসনের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। মিসর এখন কিছুক্ষণের জন্য আবার সামরিক বাহিনী দ্বারা শাসিত হতে যাচ্ছে, যেভাবে রাজতন্ত্র উচ্ছেদের পর থেকে দেশটি একটানাভাবে সামরিক বাহিনী দ্বারা শাসিত হয়ে এসেছে।

লিবিয়ায় কর্নেল গাদ্দাফি ছিলেন কড়া মার্কিনবিরোধী শাসক। সামরিক শক্তি তিনিও ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু লিবিয়ার জনগণের জন্য তিনি অনেক কিছু করেছিলেন। এ জন্য জনগণের মধ্যে তার ভিক্তি শক্ত ছিল। বেনগাজিভিত্তিক কিছু গাদ্দাফিবিরোধীকে সংগঠিত করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার যে চেষ্টা করেছিল, তা ব্যর্থ হয়েছিল। কাজেই সরাসরি সামরিক বল প্রয়োগ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অন্য পথ খোলা ছিল না। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ছিল মার্কিনের বড় রকম সহযোগী। কাজেই জাতিসংঘ লিবিয়াকে হড় ভষু ুড়হব ঘোষণা করার পর হড় ভষু ুড়হব-এর নিয়মকানুনও সম্পূর্ণ ভঙ্গ করে ফ্রান্স, ইতালি, ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ায় ব্যাপকভাবে বোমাবর্ষণ করে লিবিয়ায় সামরিক শক্তি ও জনগণের প্রতিরোধ ধ্বংস করে গাদ্দাফির শাসনের অবসান ঘটিয়ে সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এখানে বলা দরকার যে, রাশিয়া ও চীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জাতিসংঘে হড় ভষু ুড়হব-এর পক্ষে ভোট দেওয়ার কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছিল। তারা ভেটো দিলে মার্কিন ও তার সহযোগী সাম্রাজ্যবাদীদের এবং তাদের পদলেহী আরব লীগের দ্বারা লিবিয়ার ওপর সামরিক বিমান হামলা কোনোক্রমেই সম্ভব হতো না। কাজেই লিবিয়াকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীনের বড় রকম অবদান ছিল।

নিজেদের এই মূঢ় ভ্রান্তি রাশিয়া ও চীন পরে উপলব্ধি করায় সিরিয়াতে তারা আর এই ভুল করেনি। সিরিয়ায় আসাদের শাসন কোনো গণতান্ত্রিক শাসন নয়। কিন্তু তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, তারা ইসরায়েলের বিরোধী। এ কারণেই সিরিয়ায় আসাদের সরকার উৎখাতের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মরিয়া হয়েছে। লিবিয়ার মতো সিরিয়াতেও তারা হড় ভষু ুড়হব করার জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাব আনতে চেষ্টা করলেও তা হয়নি। কারণ, এবার রাশিয়া ও চীন তার বিরুদ্ধে ছিল। শুধু তাই নয়, রাশিয়া এখন পুরোদস্তুর সিরিয়ার পক্ষে থাকায় আসাদের সরকার সিরিয়ায় এখনও টিকে আছে। শুধু রাশিয়া নয়, ইরান এবং লেবাননের হেজবুল্লাহ তাদের পক্ষে। তাছাড়া আসাদের বিরোধী যে গ্রুপগুলো আছে, সেগুলো মার্কিন ও ইউরোপীয় কোনো কোনো দেশ এবং সে সঙ্গে সৌদি আরব থেকে বড় আকারে অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য পেলেও তাদের মধ্যে ঐক্য নেই। কাজেই সামরিক আগ্রাসন চালাতে অসমর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেখানে অন্য রকম ষড়যন্ত্র করছে। এই ষড়যন্ত্রের খেলায় তারা জাতিসংঘকে যুক্ত করেছে। এই মুহূর্তে সুইজারল্যান্ডে জাতিসংঘ আয়োজিত সমঝোতা বৈঠকও তারই অংশ। এ বিষয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা দরকার। কিন্তু যে বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার, সামরিক আক্রমণের ওপর নির্ভরশীল এবং এসব ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি ব্যবহারকারী সিরিরায় বিভিন্ন কারণে সামরিক শক্তি ব্যবহার করতে অপারগ হওয়ার জন্যই তারা এক কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। আগের মতো সহজে কার্যোদ্ধার তাদের হচ্ছে না।