ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Friday, 28 February 2014 20:17

৬ বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক চুক্তি

Rate this item
(0 votes)

শেষ পর্যন্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ছয় বিশ্বশক্তির মধ্যে ঐতিহাসিক চুক্তি হয়েছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে এ চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের একটি যুদ্ধের আশঙ্কা কমবে।

জেনেভায় ছয়টি পশ্চিমা দেশের সঙ্গে ছয় মাসের জন্য স্বাক্ষরিত এ চুক্তি অনুযায়ী ইরান সাময়িকভাবে তার পারমাণবিক তৎপরতা কমাবে; কাটছাঁট করবে পরমাণু কর্মসূচি। পরমাণু অস্ত্র তৈরির লক্ষ্যে জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) সমৃদ্ধ করবে না।

বিনিময়ে দেশটির ওপর বিভিন্ন ক্ষেত্রে আরোপিত

নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। জেনেভায় চার দিন ধরে আলোচনার পর শনিবার গভীর রাতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চীন ও জার্মানির মধ্যে এ সাময়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, ইরান ৫ শতাংশের বেশি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করবে না। অর্থাৎ পরমাণু অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম থাকবে না ইরানের হাতে। ইউরেনিয়ামের মজুদও কমাবে। বিনিময়েতেল রফতানি বাড়াতে পারবে তেহরান। দীর্ঘদিন ধরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ায় ইরানের আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে। সে সঙ্গে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা উত্তেজনা হ্রাস পাবে। এ চুক্তি হওয়ায় আগামী ছয় মাসে আলোচনার মাধ্যমে আরও ব্যাপকভিত্তিক চূড়ান্ত চুক্তিতে পেঁৗছানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জেনেভায় এ আলোচনায় অংশ নেন ইরানসহ সাতটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। এ ঐতিহাসিক চুক্তিকে ইরানের পরমাণু বোমা তৈরির পথ আটকানোর 'গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ' উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, এর ফলে ইরানকে পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার পথ খুলবে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বলেছেন, তারা পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচির পথে পা বাড়াবেন না। তবে শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার অক্ষুণ্ন আছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান ক্যাথেরিন অ্যাশটন বলেছেন, বিরোধ মীমাংসায় ব্যাপকভিত্তিক চুক্তির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পরমাণু অস্ত্রধারী দেশ ইসরায়েল এ চুক্তির কঠোর সমালোচনা করে বলেছে, 'জেনেভায় ঐতিহাসিক চুক্তি নয়, ঐতিহাসিক ভুল' হয়েছে। কারণ, এ চুক্তির পরও ইরানের পরমাণু অস্ত্রের জ্বালানি তৈরির স্থাপনাগুলো অক্ষুণ্নই থাকবে। খবর এএফপি, বিবিসি, এপি, রয়টার্স অনলাইনের।

পরমাণু কর্মসূচি প্রশ্নে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশ অভিযোগ করে আসছে, ইরান গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পথে অগ্রসর হচ্ছে। অন্যদিকে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তারা বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।

এ নিয়ে বাদানুবাদ ও উত্তেজনা কখনও কখনও এমন মাত্রায় পেঁৗছে যে, আশঙ্কা সৃষ্টি হয় যুদ্ধ আসন্ন। ইরানের পরমাণু স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বিমান হামলা চালাবে বলেও বিভিন্ন সময় খবর বেরিয়েছে। তবে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন হয় ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি দায়িত্ব গ্রহণের পর। দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্কারপন্থি রুহানি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গেও এ নিয়ে টেলিফোনে কথা বলেছেন।

এর পরই আলোচনার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভার এ আলোচনা ছিল সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে তৃতীয় দফার আলোচনা। বিশ্বশক্তি অর্থাৎ 'পি৫+১' (যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন, জার্মানি) হিসেবে পরিচিতি পাওয়া দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে চার দিন ধরে নিবিড় আলোচনা চালিয়েছেন।

অনেক তর্ক-বিতর্ক, জল্পনা-কল্পনার পর শনিবার গভীর রাতে ঐতিহাসিক এ চুক্তিটি হলো। এর পরই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভাদ জারিফ টুইটার বার্তায় জানান, আমরা একটি চুক্তিতে পৌচেছে ।

চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কিছু কাজ বন্ধ রাখাসহ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে অস্ত্র পরিদর্শকদের আরও বেশি প্রবেশাধিকার দিতেও রাজি হয়েছে ইরান। বিশেষ করে নাতাঞ্জ এবং ফর্দো পারমাণবিক স্থাপনায় যে কোনো দিন অস্ত্র পরিদর্শকদের প্রবেশ করতে দেবে দেশটি।

বিনিময়ে ইরানের ওপর আগামী ছয় মাসে নতুন করে আর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না পশ্চিমা বিশ্ব। সে সঙ্গে ইরানের তেল রফতানি এবং মূল্যবান ধাতুসহ কয়েকটি খাতে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে আরোপিত আগের নিষেধাজ্ঞাগুলো বহাল থাকবে।

শর্ত মেনে চললে ইরানের জব্দ করা ৭০০ কোটি ডলার ফেরত দেবে যুক্তরাষ্ট্র। চুক্তির আওতায় কিছু পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখতে রাজি হওয়ার মধ্য দিয়ে পশ্চিমাদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ প্রশমনে আস্থা অর্জনের পদক্ষেপ নিল ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'এটি প্রথম পদক্ষেপ মাত্র। আমাদের এখন আস্থা ফিরে পাওয়ার পথে হাঁটতে হবে।'

চুক্তির পর এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস বলেছে, সমৃদ্ধকরণের কাজে যে ধরনের কারিগরি সম্পৃক্ততা থাকে, তাও বাতিল করবে ইরান। এ ছাড়া তেহরান তার ইউরেনিয়াম মজুদ ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতেও সম্মত হয়েছে। তবে হোয়াইট হাউস জোর দিয়ে বলেছে, এ চুক্তি স্বল্পমেয়াদি। আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহারের জন্য ইরানকে অবশ্যই আরও কিছু করতে হবে এবং বিশ্বকে বোঝাতে হবে, তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। হোয়াইট হাউস আরও বলছে, ইরান ফর্দো কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য নতুন কোনো সেন্ট্রিফিউজ স্থাপন করবে না এবং নাতাঞ্জ কেন্দ্রে থাকা সেন্ট্রিফিউজও সরিয়ে নেবে।

জেনেভায় বুধবার শুরু হওয়া আলোচনায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও যোগ দেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট ফাবিয়াস, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাইদো ওয়েস্টারওয়েল, ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই লাভরভ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বশক্তি ও ইরানের সঙ্গে এই চুক্তি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা। বুধবার শুরু হওয়া এ আলোচনা শুক্রবারই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সমঝোতায় পেঁৗছানোর আশায় আলোচনার মেয়াদ দু'দিন বাড়ানো হয়। এর আগে, এ মাসের শুরুর দিকে জেনেভায় তিন দিনব্যাপী আলোচনা করে বিশ্বশক্তি ও ইরান।