ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

প্রেরণাদায়ক ব্যতিক্রমী প্রযোজনা

Rate this item
(0 votes)

জীবন কতগুলো আকস্মিকতার ফলাফল। জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ থেকে শুরু করে অনেক ঘটনাই ঘটে যায় যা আকস্মিক। মানবজাতি এই আকস্মিকতা মেনেও নিয়েছে। সবচেয়ে বড় আকস্মিকতা আমরা দেখতে পাই রাষ্ট্রশাসনে। কখনো পেিশশক্তি, কখনো ধর্ম এসে বড় নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়। তৃতীয় বিশ্ব থেকে শুরু করে উন্নত বিশ্বেও এসব ঘটনা ঘটে। কখনো সেনানায়কের তরবারি, ধর্মীয় নেতাদের ব্যাখ্যা মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দেয়, প্রগতির চাকাকেও উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেয়। তেমনি মনে হচ্ছিল বটতলার সাম্প্রতিক প্রযোজনা দ্য ট্রায়াল অব মাল্লাম ইলিয়া নাটকে।যেকোনো নির্দেশকের ও দলের নাট্যানুসন্ধান এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ। জনতার কণ্ঠ বলে নাটককে সমসাময়িক হতে হয়, নাটকে মানুষের

প্রাণের কথা থাকতে হয়। বটতলা তাই নাটক খুঁজতে খুঁজতে চলে গেছে আফ্রিকায়। খুব পরিচিত নয় এমন একজন নাট্যকার মোহাম্মদ বেন আবদেল্লাহকে খুঁজে বের করেছে। সম্ভবত তিনি নাটক লেখেন ইংরেজিতে, শিক্ষা-দীক্ষায় পাশ্চাত্যের অনুসারী। রাষ্ট্র তার বিষয়বস্তু। রাষ্ট্রকে বিষয়বস্তু করতে গিয়েই যেকোনো নাট্যকারের চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় শেক্সিপয়ার। জুলিয়াস িসজার, ম্যাকবেথ, কোরিওলেনাস, হ্যামলেট আরও কত নাটক। জনগণ রাষ্ট্র শাসন করে না কিন্তু জনগণের রক্ত যতক্ষণ শাসকের হাতকে রঞ্জিত করে না ততক্ষণ রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া যায় না। আমাদের দেশে এই উত্থান-পতন যেমন দেখছি, তেমনি পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি। ভারতে বিজেপির উত্থান, গুজরাট উত্তর প্রদেশে দাঙ্গা এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ এসবই প্রমাণ করে। দ্য ট্রায়াল অব মাল্লাম ইলিয়া সেদিক থেকে আমাদের কাছে অনেক নিকটবর্তী। সেই কারণেই বটতলার অনুসন্ধানে ধরা দিয়েছে নাটকটি।
মালওয়াল নামের এক যুবকের পরিকল্পিত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে শুরু হয় নাটক। বন্দী হয় মাল্লাম ইলিয়া, দীক্ষা ছিল ধর্মীয়, কিন্তু তার গুরুকন্যার এক গভীর সংকটে জড়িয়ে পড়ে সে। যাকে সে বিবাহ করতে বাধ্য হয়, সে আরেক শাসকের বাগদত্তা ছিল। এই কন্যার নাম হালিমা। নাটকের শুরুই হালিমাকে হত্যা দিয়ে। তারপর একের পর এক ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় বিপ্লব ও প্রতিবিপ্লব। শাসকদের ক্ষমতা আরোহণের ষড়যন্ত্র চলতে থাকে, মানুষের জীবন নিয়ে খেলা চলতে থাকে। মালওয়ালের এই বিপ্লব প্রশ্ববিদ্ধ হয়, কারণ একি শুধুই তার ক্ষমতায় আরোহণের উচ্চাভিলাষ নাকি তার পরিচয়-সংকট? কারণ, একান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গও যে মাঝে মাঝে রাষ্ট্রে প্রভাব ফেলে তা-ও বোঝা যায় এ নাটকে।
বটতলা দল হিসেবে নতুন হলেও সদস্যদের মোটামুটি নাটকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আছে। অভিজ্ঞ নাট্যকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একেবারেই তরুণেরা। তাই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তারুণ্যের উত্তেজনা আমাদের টেনে নিয়ে যায়। কী অভিনয়ে, কী কোরিওগ্রাফিতে, কী সংগীতে এক গতিময়তা প্রথম থেকেই লক্ষণীয়৷ এ নাটকে কোনো পরিচিত তারকা নেই কিন্তু অভিনয়ে তার কোনো অভাব অনুভূত হয় না। অভিনয় দক্ষতার চেয়ে এখানে তারুণ্যের স্বতঃস্ফূর্ততাই লক্ষণীয়।
নাটকটির মূল পাণ্ডুলিপি দুরূহ৷ উত্তর-আধুনিকতা প্রভাবিত। সময় এবং স্থানের ক্ষেত্রে নানা ধরনের নিরীক্ষা আছে। অনুবাদটিও খুব সহজ নয়। কিন্তু নির্দেশনার গুণে অনেক জটিল বাঁক অতিক্রম করে গেছে। ছায়ানাট্যের কোরিওগ্রাফিও স্বচ্ছন্দভাবে এগিয়ে চলে। অভিজ্ঞ অভিনেতা থাকলে অনেক সময় সুবিধা হয় কিন্তু যদি অভিনেতাদের একটা ছক তৈরি হয়ে যায় তবে কাজটা কঠিন হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে নিরীক্ষাধর্মী যেকোনো প্রযোজনায় নতুনদের নিয়ে কাজ করার সুবিধা অনেক। অভিনয় বিষয়টিই দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি শিল্প। একদার কণ্ঠনির্ভর অভিনয়ে এখন নতুন অনেক মাত্রা তৈরি হয়েছে। সে মাত্রাও আবার পরিবর্তিত হচ্ছে। এ ধরনের প্রযোজনায় বাদ্যযন্ত্রের নির্বাচনও খুব দুরূহ ব্যাপার। যদিও এ প্রযোজনা সংগীতে রেকর্ডেড তবু তার সঙ্গে মাঝে মাঝে লাঠির শব্দ নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। রেকর্ডেড সংগীতের মধ্যে আফ্রিকান ড্রামের ব্যবহার নাট্যগতিকে বাড়িয়ে দেয়।
সারা পৃথিবীতেই দেশীয় নাট্যধারা নির্মাণের একটা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। আফ্রিকাতেও নাট্যরচনা ও আঙ্গিকের পরিবর্তন লক্ষণীয়। যেমন আফ্রিকার নাটকে মুখোশের ব্যবহার। এ নাটকেও মুখোশের ব্যবহার তাত্পর্যপূর্ণ। মুখোশগুলো আরও চরিত্রানুগ হলে আরও ভালো হবে।
নাটকটি দেখতে দেখতে কখনো চেনা ঘটনাপ্রবাহ দেখার মতো রীতিমতো শিউরে উঠি। এসব ঘটনার শেষই বা কোথায়? সামরিকতন্ত্রের পর গণতন্ত্র, গণতন্ত্রের পরে কী? কোথায় গিয়ে ঠেকবে এই মানবজাতির ভবিষ্যৎ।
বটতলা নতুন কিন্তু সব নাট্যভাবনায় উজ্জীবিত। নির্দেশক মোহাম্মদ আলী হায়দারের স্পেস ব্যবহারের কাজ চমত্কার। প্রসেনিয়ামকে ভেঙে একটা অন্য স্পেস তৈরি করার সচেতন প্রয়াস আছে যা প্রযোজনায় নান্দনিকতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশে নাট্যচর্চায় একটি বড় অন্তরায় মঞ্চ। নাটকটি আমি দেখেছিলাম নাটমণ্ডলের অপরিসর মঞ্চে। শিল্পকলা একাডেমীর মঞ্চে অভিনয়টি দেখতে পারলে হয়তো অন্য অনুভূতি হতে পারত। কিন্তু সেখানেও মাসে দুই মাসে একবার অভিনয় করলে একটি নাটক দাঁড়ায় না। নাটকটির প্রারম্ভিক অভিনয়কালে একসঙ্গে অনেকগুলো প্রদর্শনী হওয়া প্রয়োজন, যেখানে টিমওয়ার্ক একটা শৃঙ্খলায় আনা যায়।
এ নাটকের যে পরিপ্রেক্ষিত তা এ দেশের দর্শকদের জন্য প্রয়োজনীয় কারণ ক্ষমতার বদল, বিচারের নামে প্রহসন অতীতে আমরা অনেক দেখেছি। কর্নেল তাহের ও ১৪ জন মুক্তিযোদ্ধার ট্রায়াল একদা আমাদের ভীষণভাবে মর্মাহত করেছিল। বটতলা একটা পরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিচয় ভবিষ্যতে আরও সংহত হোক।