ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Wednesday, 05 March 2014 14:14

অনেক অভাবে ‘মৃতপ্রায়’ বাংলা চলচ্চিত্র

Rate this item
(0 votes)

দর্শকসংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে কমছে সিনেমা হল। তার সঙ্গে ‘মেধা সঙ্কট’, বিনিয়োগভীতি আর সরকারের উদাসীনতা মিলিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র যে অবস্থায় পৌঁছেছে তাকে ‘মৃত্যুশয্যার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন নির্মাতা, পরিচালক, প্রযোজক এবং সমালোচকরা।

এক সময় ঈদ উৎসবকে মাথায় রেখে বছরের একটি বড় সংখ্যক চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও প্রযোজকদের বিনিয়োগভীতির কারণে প্রতি বছরই

মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের সংখ্যা কমছে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার (বিএফডিসি) তথ্য বিশ্লে¬ষণ করে দেখা যায়, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে মুক্তি পেয়েছিল ১০০টি ছবি। এরপর ২০০৬-০৭ অর্থবছরে ৯৮টি, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৯৬টি, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৬৪টি, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৬৩টি, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৪৫টি এবং ২০১১-১২ এ মাত্র ১১টি চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে এফডিসি থেকে।

চলতি বছরেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মহাম্মদ হান্নান বলেন, “আগে বছরে ১০০ থেকে ১২০টির মতো ছবি নির্মাণ হতো। এ বছরে ৩০টিও হবে কিনা সন্দেহ। যা হবে তাও অতি নিন্মমানের।”

চলচ্চিত্র ব্যবসার এই পতনের ধারার পেছনে অনেক কারণ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ হচ্ছে না বলে দর্শকরা সিনেমা হলে যাচ্ছে না। একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হতে থাকায় প্রযোজকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বিনিয়োগভীতি। পৃষ্ঠপোষকতা আর কারিগরী প্রশিক্ষণের অভাবে গভীরতর হচ্ছে শিল্পী-কুশলী সঙ্কট। ভাল চলচ্চিত্রের সংখ্যা আরো কমে যাচ্ছে বলে বাংলা চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক বাজারও তৈরি হচ্ছে না। তৈরি হয়েছে অনেক ‘অভাবের’ এক দুষ্টচক্র।

“বাংলা সিনেমা তার সুদিন হারিয়েছে অনেক আগেই, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প এখন মৃত্যুশয্যায়”, বলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সভাপতি মাসুদ পারভেজ।

সোহেল রানা নামে অনেক বেশি পরিচিত এই অভিনেতার মতে, পতনের শুরুটা হয়েছিল ১৯৯০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। অশ্লীলতা, মৌলিক ছবির বাইরে বলিউড ও তামিল সিনেমার পুনরুৎপাদন, লো বাজেট এবং একই কাহিনীর পুনরাবৃত্তি বাংলা চলচ্চিত্রের নিয়মিত দর্শকদের হলবিমুখ করে তোলে। ওই ধাক্কাতেই বাংলা চলচ্চিত্র সিংহভাগ দর্শক হারায়।

তবে এর জন্য প্রযোজক পরিচালকদের ‘অতি ব্যবসায়িক মনোভাবকে’ দায়ী করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফাহমিদুল হক।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে তিনি বলেন, “এ মনোভাব থেকে অনেকেই কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়া ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে যান। ফলে প্রতি বছর বহু অপ্রয়োজনীয় ছবি নির্মিত হয়। তথাকথিত সুস্থধারার ভালো ছবির ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য।”

প্রযোজক ও পরিচালকদের পেশাদারিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

“বিনোদননির্ভর ছবি কী, সে বিষয়ে তাদের স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই। এ কারণে তারা গান-মারপিট-প্রেম-স্টার এই পুরনো ফর্মুলাতেই একই ধরনের কাহিনীর ছবি বানাতে থাকেন।”

মাসুদ পরভেজের মতে, গত কয়েক বছরে চলচ্চিত্রে ‘অশ্লীলতা’ ও ‘সহিংসতার’ মতো বিষয়গুলো অনেকখানি নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও নির্মিত চলচ্চিত্রের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে।

“অতীতে চলচ্চিত্র ছিল একটি লাভজনক ব্যবসা। আর প্রযোজক পরিচালকদের সঙ্গে যে শিল্পীরা এখানে কাজ করতেন তারাও ছিলেন আন্তরিক। কিন্তু এখন যারা ছবি প্রযোজনায় আসছেন কিংবা অভিনয় করছেন, তাদের উদ্দেশ্য থাকে কতো দ্রুত টাকা বানানো যায়। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বা অভিজ্ঞতা কোনোটাই তাদের থাকে না।”

এই বিচারে বাংলাদেশে চলচ্চিত্র প্রযোজনাকে মাসুদ পারভেজ তুলনা করেন ‘রেস খেলার’ সঙ্গে।

“চলচ্চিত্র প্রযোজনা এখন অনেকখানি রেস খেলার মতো হয়ে গেছে। যে একজন জিতলো সে সব পেল, আর বাকিরা সব হারালো।”

তাছাড়া এ শিল্পে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতারও অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “শুধু এই সরকার নয়, স্বাধীনতাপরবর্তী কোনো সরকারের সময়ে চলচ্চিত্র শিল্প আলাদা মনোযোগ পায়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে ভুল পদক্ষেপ এবং অসহযোগিতা এ শিল্পের বিকাশকে নানাভাবে ব্যহত করেছে।”

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মহাম্মদ হান্নানও চলচ্চিত্র শিল্পের দশা নিয়ে মাসুদ পারভেজের সঙ্গে একমত। তার ভাষায় আপাতত বাংলা ছবি একটি ‘কোমার মধ্যে’ রয়েছে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “ছবি যে বানাব- সেটা চালাব কোথায়। একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আর হলগুলো রক্ষা করতে সরকারি কোনো উদ্যোগও নেই।”

সংসদে তথ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশের দুই তৃতীয়াংশ সিনেমা হলই বন্ধ হয়ে গেছে। দেশে অনুমোদনপ্রাপ্ত ১২০০ সিনেমা হলের ৭০০ এখন বন্ধ।

আক্ষেপের সঙ্গে হান্নান বলেন, “অনেকে বলেন চলচ্চিত্রে মেধার সঙ্কট চলছে। সেটা মানলাম। কিন্তু ছবি বানানোর জন্য যে অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন সেটাও তো নেই।”

এফডিসিতে ৪০ বছরে ৪১ এমডি

গত ৪০ বছরে এফডিসিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন ৪১ জন, যা এই শিল্পের বিপর্যয়কে তরান্বিত করেছে বলে মনে করেন পরিচালক সমিতির সভাপতি হান্নান।

তিনি বলেন, “চলচ্চিত্র শিল্প একটা ভাস্ট এরিয়া। এখানে সার্বিক বিষয়ে বোঝাপোড়াটা জরুরি। একজন নতুন এমডি আসার পর যখন এই বোঝাপোড়া তৈরি শুরু হয় তখনই তাকে বদলি করে দেওয়া হয়। এটা এফডিসির দুর্ভাগ্য।”

এ প্রসঙ্গে পরিবেশক সমিতির সভাপতি মাসুদ পারভেজ বলেন, “এসব নিয়োগের অধিকাংশই রাজনৈতিক। তও ঠিক ছিল যদি তারা চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট হতেন। আমরা বার বার বলেছি, সিনেমা বোঝেন এমন কাউকে এখানে নিয়োগ দিতে।”

তিনি বলেন, গত ৬ মাসে এফডিসির এমডি হিসাবে নিয়োগ পেয়েছেন ৩ জন। এদের মধ্যে একজন ‘মোটামুটি’ সিনেমা সংশি¬ষ্ট হলেও বাকি দুজন ‘নাটকের লোক’।

“তারা হয়তো নাটকটা ভাল বোঝেন। কিন্তু নাটকের লোক দিয়ে সিনেমার সার্বিক বিষয় বোঝা সম্ভব না।”

এফডিসির কথা বলতে গিয়ে এর কারিগরী দৈন্যদশার কথাও তুলে ধরে মাসুদ পারভেজ। উদাহরণ হিসাবে তিনি বলেন, এখানে অধিকাংশ কাজ হয় ১৯৬০ সালের যন্ত্রপাতি দিয়ে। যারা কাজ করেন, তাদেরও যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে।

“১৯৯০ সালে একটা সাউন্ড ক্যাপচারিং মেশিন আনা হয়। এর ৪০টা নবের মধ্যে অপারেটররা সবগুলো অনই করতে পারে না। এগুলোর ফাংশানই তারা জানে না। আর ল্যাবে নেগেটিভ ডেভেলপের জন্য যে কেমিকেল ব্যবহার করা হয় তা অতি নিন্মমানের। একই নেগেটিভ বাইরে ডেভেলপ করলে তার ফল আসে অনেক ভাল”, বলেন তিনি।

হান্নান বলেন, নাম চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা হলেও সারাবছরই এখানে ‘ফ্লোর’ ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন টিভি অনুষ্ঠান নির্মাণ চলে। শিল্প ঘোষণার পর চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আলাদা সুবিধা পাওয়ার কথা থাকলেও নতুন করে বিভিন্ন ধরনের ‘চার্জ’ বসিয়ে ছবি বানানো কঠিন করে ফেলা হচ্ছে।

ফাহমিদুল হক জানান, ২০০৫-০৬ সালের পর এফডিসিতে নতুন যন্ত্রপাতি আসেনি। টেলিসিনে মেশিন ৩ বছর ধরে নষ্ট। সাব-টাইটেল মেশিন ও ডিজিটাল ডাবিং সিস্টেমেরও একই অবস্থা। যারাই একটু ভালো ছবি নির্মাণ করতে চান এবং চান তার ছবির প্রিন্ট দীর্ঘস্থায়ী হবে, তাদের শুটিং শেষে সম্পাদনা করতে হয় মাদ্রাজে গিয়ে।

অবশ্য এফডিসির বর্তমান এমডি নাট্য ব্যক্তিত্ব পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো আশাবাদী। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এফডিসির অবস্থা এখন আঁধার কেটে ভোর হওয়ার মতো। এখানে এফডিসির নিজস্ব এডিটিং প্যানেল, ল্যাব, সাউন্ড সিস্টেমসহ নয়টা শ্যুটিং ফ্লোর রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই নেই।”

চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তথ্যসচিব হেদায়েত্ল্লুাহ আল মামুন জানান, স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এফডিসিকে ৫৮ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা এ প্রতিষ্ঠানটিকে যুগোপযোগী করে তুলতে পারে।

তবে মাসুদ পারভেজ মনে করেন, এ কাজে ৫৮ কোটি টাকায় কিছুই হবে না।

“এটা আরেকটা দুর্ভাগ্য যে আমাদের কী লাগবে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তগ্রহীতাদের কেউ আমাদের সঙ্গে আলাপ করেন না। এই টাকাটা দেওয়া হবে ৫ বছরে। সেই হিসাবে প্রতি বছরে ১০ কোটি টাকার কিছু বেশি পাওয়া যাবে। অথচ ১২টি ক্যামেরা কিনতে লাগবে ৪৮কোটি টাকা। তাছাড়া ডেভেলপ মেশিনে ৩ কোটি, ডিজিটাল সাউন্ড কমপ্লেক্সের জন্য ১০ কোটি লাগবে। এর বাইরে আরো অনেক বিষয় তো পড়েই থাকল”, বলেন তিনি।

এফডিসিকে যুগোপযোগী করতে এই অর্থ যে যথেষ্ট নয়, তা মানছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ও।

তিনি বলেন, “যদি আমরা এফডিসিকে অ্যানালগ থেকে পুরোপুরি ডিজিটাল করতে চাই, তাহলে এই অর্থ মোটেও যথেষ্ট নয়। তবে উন্নয়নশীল দেশের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও আমাদের মাধায় রাখতে হবে।”

Last modified on Sunday, 09 March 2014 16:13