ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

থমকে যাওয়া বিনিয়োগ খাতের কথাই বলছে দারুণ তেজি শেয়ার বাজার

Rate this item
(0 votes)

ঢাকা, অক্টোবর ২৭ - দেশে বাণিজ্য বায়ু যখন প্রায় থমকে আছে বলে মনে হচ্ছে তখন শেয়ার বাজারের পরিস্থিতি ঠিক উল্টো। অন্য খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমে আসায় বাজারের বেশিরভাগ টাকা ছুটছে অল্প কিছু শেয়ারের পেছনে। ফলে ওইসব শেয়ারের দাম বাড়তে বাড়তে প্রকৃত মূলধন ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে অযৌক্তিক উচ্চতায়। সূচক কিংবা লেনদেনের কোনো রেকর্ডই বেশি দিন স্থায়ী হচ্ছে না। সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ভাষায়, এ অবস্থা 'অস্বাভাবিক'। আর বাজারের এই

অস্বাভাবিক উর্ধ্বগতি অর্থনীতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না বলেই মত প্রকাশ করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনীতির সূচকগুলো থেকে এটা স্পষ্ট যে দেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের গতি একবারেই মন্থর হয়ে পড়েছে। নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাওয়ায় এবং দুর্নীতি ও কর ফাঁকির বিরুদ্ধে সরকারের অভিযানের কারণে ব্যবসায়ীরা টাকা খাটাতে ভয় পাচ্ছেন। আর তাদের হাতে জমে যাওয়া অলস টাকাই শেষ পর্যন্ত শেয়ার বাজারে আসছে। কিন্তু বাজারে ভালো মানের শেয়ারের অভাব থাকায় ফুলে ফেঁপে উঠছে অল্প কিছু শেয়ার ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির শিক্ষক আবু আহমেদ বলেন, "দেশের অর্থনীতিতে যখন আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় সাধারণত তখনই শেয়ার বাজার চড়তে থাকে। এটাই সুস্থ প্রক্রিয়া। কিন্তু এখন দেশের অর্থনীতিতে আশা করার মতো কিছু না ঘটলেও পুুঁজিবাজার রমরমা হয়ে উঠেছে। এটা পরস্পরবিরোধী।"

তার মতে, "আমাদের শেয়ার বাজার এখন অর্থনীতির সূত্রগুলোকে ভুল প্রমাণ করতে চলেছে। এর কারণ আর কিছু নয়, দেশের অর্থনীতি মন্থর হয়ে এসেছে কিন্তু পুঁজি বাজার লাগামহীন গতিতে চড়ছে।"

সরকারি পরিসংখ্যানে দেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি সম্পর্কে যেসব তথ্য রয়েছে তা মোটেও ভালো কোনো অবস্থার কথা বলছে না। চলতি বছরের জুলাই মাসে রপ্তানি আয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে ৯০ দশমিক ২৩৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। কেবল তৈরি পোশাক খাতেই রপ্তানি আয় কমেছে ২৪ শতাংশ।

গত এক বছরে বিনিয়োগ বোর্ড স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাবের সংখ্যাও কমে এসেছে উল্লেখযোগ্য হারে। অথচ ব্যাংকগুলোতে ১৪ হাজার ২০০ কোটিরও বেশি টাকা অলস পড়ে আছে।

অন্যদিকে এসইসির নেওয়া সংশোধনমূলক পদক্ষেপ ও সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কারণে সাময়িক দরপতনের ঘটনা ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকেই শেয়ার বাজারের উর্ধ্বগতি অব্যহত রয়েছে।

অবশ্য বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, শেয়ার বাজারের এই তেজীভাবের কারণে জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে সহসা কোনো ইতিবাচক প্রভাব না পড়লেও এই প্রক্রিয়ায় ভবিষ্যতে শিল্পায়নের জন্য পুঁজি গঠনের পথ তৈরি হচ্ছে। বাজারে এই সংশোধনী পর্যায় শেষ হওয়ার পর সেই সুফল পাওয়া যেতে পারে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী সালাহউদ্দিন আহমেদ খান বলেন, "তত্ত্বীয়ভাবে অর্থনীতির সূচকগুলো এখন বিনিয়োগের জন্য ভালো পরিস্থিতির ইংগিত দিচ্ছে না। তবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখনকার অবস্থাকে একটি সাময়িক অবস্থা বলেই মনে করছে।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের শিক্ষক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম মনে করেন, বাংলাদেশের শেয়ার বাজার এখনও অর্থনীতির 'ব্যারোমিটার' হয়ে ওঠেনি।

তিনি বলেন, "অল্পকিছু শেয়ারের পেছনে অনেক বেশি টাকার লেনদেন হচ্ছে বলেই বাজারের এই তেজীভাব। ব্যবসা-বাণিজ্য আর বিনিয়োগ পরিস্থিতির মন্দার কারণে অন্য খাতে বিনিয়োগ না হয়ে এসব টাকা শেয়ার বাজারে আসছে। ফলে বাজারের বর্তমান অবস্থা দেখে দেশের ব্যবসা বা বিনিয়োগ সামর্থ্য সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে না।"

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ডিজিইএন বা সাধারণ সূচক মাত্র দশ মাসে ১২৯২ পয়েন্ট বা ৮০ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২৫ অক্টোবরে ২ হাজার ৯০১ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট হয়। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর সূচক ছিল ১ হাজার ৬০৯ দশমিক ৫১ পয়েন্টের ঘরে।

গত ডিসেম্বরের শেষে বাজার মূলধন ছিল ৩১৫ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন টাকা। বোনাস শেয়ার আর ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নতুন কিছু শেয়ার বাজারে আসার পর ২৫ অক্টোবর বাজার মূলধন ৭০৭ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছায়।

অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ বলেন, "বিকল্প বিনিয়োগের পথ না থাকায় শেয়ার বাজারে অর্থের যোগান বেড়েছে। এটা শেয়ারের বাজারের প্রবৃদ্ধির জন্য ভাল। তবে স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ না বাড়লে এ থেকে অর্থনীতির জন্য ভাল কিছু পাওয়া যাবে না।"

এইমস বাংলাদেশের ইওয়ার সাইদও প্রায় একই ধরনের মত প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, "শেয়ার বাজারের এই উর্ধ্বগতি দেশের অর্থনীতির জন্য সত্যিকার অর্থে ভালো কিছু বয়ে আনবে না। বরং বাজারের অবস্থা থেকে এটাই স্পষ্ট যে আবাসন ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতের বাজার এখন মন্দা।"

Last modified on Saturday, 08 March 2014 10:04