ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ১১ বছরে সর্বোচ্চ

Rate this item
(0 votes)

আমদানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি আরো বেড়েছে। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৩৪৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ঘাটতির এই পরিমাণ গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় আগামী দিনগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে টান পড়তে পারে, টাকার মান পড়ে যেতে পারে, মূল্যস্ফীতির কারণে আমদানি নির্ভর ভোগ্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে, এমনকি কর্মসংস্থান খাতেও মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাণিজ্য ঘাটতি আগের অর্থবছরের ২৮৮ কোটি ৯০ লাখ ডলার থেকে ১৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়ে ৩৪৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে রপ্তানি আয় কমেছে ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অথচ আগের অর্থ বছরের তুলনায় ২০০৫-০৬ সালে রপ্তানি আয় বেড়েছিল ২১ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

বাণিজ্য ঘাটতির এই পরিমাণ গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ১৯৯৬-৯৭ অর্থ বছরে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ২৮০ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের গবেষণা পরিচালক জায়িদ বখত বলেন, "বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিবেচনা করলে এই মুহূর্তে আতঙ্কের কিছু নেই। তবে রপ্তানি আয় যেভাবে কমছে তা আশঙ্কার বিষয়"।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "রপ্তানি আয় কমতে থাকায় দেশের অর্থনীতিতে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে ডলারের বিপরীতে টাকার দাম আরো কমে যেতে পারে। আমদানি নির্ভর ভোগ্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে এবং কর্মসংস্থান খাতে মন্দাভাব দেখা দিতে পারে।"

শিল্পমালিক ও বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৬-০৭ অর্থবছরের প্রথম ভাগে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং ইউরোপীয় বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার প্রভাবে আমাদের রপ্তানি আয় কমে গেছে। বর্তমান সরকারের চলমান সংস্কার কার্যক্রমও এতে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন তারা। তবে সামগ্রিকভাবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিকেই দায়ী করেছেন তারা।

বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্ততকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি ফজলুল হক বলেন, "রপ্তানি আয় কমেছে মূলত দেশের বাইরের বাজার পরিস্থিতির করণে, অভ্যন্তরীণ কারণে নয়"।

তিনি আরো বলেন, "ইউরোপের আবহাওয়া বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকদের চাহিদা কেমন হবে সবসময় তা অনুমান করা সম্ভব হয় না। তারপরও আমরা আশা করছি, সেপ্টেম্বরের মধ্যে আমাদের রপ্তানি আয় বাড়তে পারে।"

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ২৩ পয়েন্ট বেড়ে ১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ হয়েছে। এর আগের বছর এই হার ছিল ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ।

২০০৬-০৭ অর্থবছরে পণ্য আমদানির জন্য বাংলাদেশকে ১৫ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে হয়েছে। অন্যদিকে রপ্তানি খাতে আয় হয়েছে ১২ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ের মধ্যে কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ছয়গুণ, ভোগ্যপণ্যের চারগুণ আর মূলধনী যন্ত্রপাতিতে দ্বিগুণ।

বাণিজ্য সচিব ফিরোজ আহমেদ বলছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি, অন্যদিকে রপ্তানি লক্ষমাত্রা পূরণ না হওয়ার কারণেই বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে।

অবশ্য এখনই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু দেখছেন না তিনি। সচিব বলেন, "এখুনি চিন্তার কিছু নেই, রপ্তানি বাড়ছে। তাছাড়া মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাড়ছে। এটা ভাল দিক। এতে ভবিষ্যতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের উৎপাদন বাড়বে।"

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মীর নাসির হোসেন মনে করেন, দেশের অর্থনীতি একটি রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, "তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা নেওয়ার আগে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সরকারের সংস্কার কার্যক্রমও এক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। এটা সাময়িক। সব কিছু ঠিক হয়ে গেলে অর্থনীতিও তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে।"