ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

মাইক্রোসফট থেকে বিল গেটসের অশ্র"সজল বিদায়

Rate this item
(0 votes)

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনার ঝক্কি ছেড়ে ১৯৭৫ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে দাঁড় করিয়েছিলেন কম্পিউটার সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট কর্পোরেশন। সঙ্গে পেয়েছিলেন বাল্যবন্ধু এলেনকে। তিন দশকেরও বেশি সময়ের পরিশ্রমে মাইক্রোসফটকে পরিণত করেছেন সফটওয়্যার শিল্পের বৃহত্তম প্রতিষ্ঠানে। বিনিময়ে টানা ১৩ বছর বিশ্বের শীর্ষ ধনী। শুক্রবার মইক্রোসফটের প্রধান পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন এর প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। বাকিটা জীবন অঢেল সম্পদ নিয়ে তিনি পাশে থাকবেন দুস্থ্য মানবতার।



গেটসকে বিদায় জানাতে শুক্রবার মাইক্রোসফট হেডকোয়ার্টারের আঙ্গিনায় আয়োজন করা হয় এক অনুষ্ঠানের। গেটসের পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত ছিলেন, মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী স্টিভ বালমোর। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে দুজনেই সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করেন।

বিল গেটস বলেন, "আগামীতে এমন একটি দিনও আমার জীবনে আসবে না যেদিন আমি মাইক্রোসফট নিয়ে চিন্তা করব না।"

এ সময় তাকে সম্মান জানাতে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ানোর পর আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি গেটস।

সকলের সামনে দাড়িয়ে হার্ভাডের সহপাঠি বালমোর যখন গেটসকে নিয়ে কথা বলছিলেন তখন আবেগে তার প্রায় শ্বসরুদ্ধ হওয়ার অবস্থা। তিনি বলেন, "বিলকে ধন্যবাদ জানানোর কোনো সুযোগ নেই। বিল প্রতিষ্ঠাতা। বিল নেতা।"

তিনি আরও বলেন, "আমরা বিশাল সুযোগ ভোগ করেছি এবং বিলই তা আমাদের দিয়েছে।"

৫২ বছরের বিল গেটস দেখতে এখনও যুবকের মতো। তবে তার এই যুবকসুলভ চেহারার সঙ্গে বড্ড বেমানান তার পাকধরা চুলগুলো।

মাত্র ১৯ বছর বয়সের লক্ষ্যকে সফল রূপ দিয়ে বিল গেটস জীবনের দ্বিতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন মানব সেবা। নিজের ও স্ত্রীর নামে গড়ে তোলা 'বিল অ্যান্ড মিলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন' এখন তার প্রধান কর্মক্ষেত্র। নতুন ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে সফটওয়্যার প্রযুক্তি ব্যবহার করা এবং বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প বাস্তবায়নে মাইক্রোসফট থেকে পাওয়া অঢেল অর্থ ব্যয় করবে এই ফাউন্ডেশন।

তবে দায়িত্ব থেকে অবসরে গেলেও গেটস মাইক্রোসফটের চেয়ারম্যান থাকবেন এবং এর বিশেষ প্রযুক্তিগত প্রজেক্টে কাজ করবেন। বর্তমানে মাইক্রোসফটের সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ৭ শতাংশ শেয়ারের মালিক গেটস, যার মূল্য ২৩০০ কোটি ডলার।

বিল গেটসের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৮ অক্টোবর সিয়াটলের এক বিখ্যাত পরিবারে। পিতামাতার তিন সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাবা উইলিয়াম হেনরি গেটস জুনিয়র ছিলেন শহরের সবচেয়ে প্রভাবশালী আইনি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার। মা মেরি ছিলেন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সদস্য এবং দাতব্য তহবিল সংগ্রহকারী।

কম্পিউটারের সঙ্গে গেটসের পরিচয় সিয়াটলের লেকসাইড প্রিপারেটরি স্কুলে। এরপর থেকে তার ধ্যানজ্ঞান কম্পিউটার আর কম্পিউটার। সঙ্গে পেলেন প্রযুক্তিপাগল বন্ধু এলেনকে। এলেনের বয়স তখন তার থেকে দুই বছর বেশি।

স্কুলে থাকতেই শুরু করেন প্রথমিক পর্যায়ের এএসআর-৩৩ টেলিটাইপ কম্পিউটারের বেসিক ল্যাঙ্গুয়েক সফট ওয়ার তৈরির কাজ। সিয়াটল হাইস্কুলে থাকতেই মাত্র ১৭ বছর বয়সে তৈরি করে ফেলেন স্কুলের সময়সূচির একটি সফটওয়্যার। সফটওয়্যারটি কিনে নিল তার স্কুল। বিনিময়ে পেলেন ৪ হাজার ২০০ ডলার।

এরপর সফটওয়ার ঘাটাঘটি করতে করতেই তিনি অনুধাবন করলেন, সফটওয়্যারই আগামীতে মানুষের সকল কর্মকাণ্ডের ধরণ বদলে দিতে যাচেছ।

এরপর ভর্তি হলেন হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু সেখানে পড়াশুনার পরিবর্তে তার ধ্যানজ্ঞান ছিল কম্পিউটার। রাতের পর রাত জেগে কম্পিউটার নিয়ে নাড়াচাড়া। কম্পিউটারের জন্য সফটওয়্যার তৈরির প্রচেষ্ট। হার্ভাডেই গেটস খুঁজে পান আরেক প্রযুক্তি পাগল স্টিভ বালমারকে। বালমার এখন মাইক্রোসফটের সিইও।

অবশেষে দুবছর পর ছেড়ে দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়। পড়াশুনা শিকেয় তুলে বন্ধু এলেনকে নিয়ে নিউ ম্যাক্সিকোতে ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট।

১৯৯৫ বিল গেটস তার 'দ্য রোড এহেড' বইতে লেখেন, "আমার যখন ১৯ বছর বয়স তখনই আমি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করি এবং তার ওপর ভিত্তি করে আমি তার সঠিকতা প্রমাণ করেছি।"

মাইক্রোসফট প্রথম সাফল্যের দেখা পেল ১৯৮০ সালে। ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিন কর্পোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মাইক্রোসফটের চুক্তি হল পার্সোনাল কম্পিউটারের আপারেটিং সিস্টেম এমএস-ডস তৈরির।

এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি মাইক্রোসফটকে। একের পর এক সফলতা। বিশ্বজুড়ে সফটওয়্যার শিল্পে মাইক্রোসফটের একচ্ছত্র আধিপত্য বিল গেটসকে বানিয়ে দিল বিশ্বের শীর্ষ ধনী।

মাত্র ৩১ বছর বয়সে বিলিয়নিয়ার হওয়া গেটস ফর্বস ম্যাগ্যাজিনের হিসাবে টানা ১৩ বছর ছিলেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী। চলতি বছরের মে মাসে তিনি এই অবস্থান হারিয়েছেন বন্ধু ওয়ারেন বাফেটের কাছে। বিনিয়োগকারী বাফেট ও মেক্সিকোর টেলিকম ব্যবসায়ী কার্লোস স্লিমের পর ধনসম্পদে গেটসের অবস্থান এখন তৃতীয় স্থানে।



গেটস জানিয়েছেন, যত বেশি সম্পদ তত বেশি দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনের জন্যই তিনি হয়তো মাইক্রোসফট ছেড়ে নেমে পড়লেন মানব সেবায়।

Last modified on Monday, 10 March 2014 01:21