ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

বাজেটে পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তা অবহেলিত: রয়টার্স Featured

Rate this item
(0 votes)

২০১৪-১৫ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত বাজেটে পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অবহেলিত হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত ঘোষণা করেছেন ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট। দেশের বিভিন্ন খাতকে উৎসাহিত-অনুৎসাহিত করে, বিভিন্ন খাতে কর বাড়িয়ে-কমিয়ে, আয়ব্যয়ের পরিমাণ নির্দিষ্ট করে বিশাল এক বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার।

বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমেও উঠে এসেছে বাংলাদেশের বাজেটের বিষয়টি। বিশেষ করে যে শিল্পের ওপর এদেশের জাতীয় অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে, সেই পোশাকশিল্পে বিগত বেশ কয়েক বছরে বড় ধরনের বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনার পরেও পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে যে সরকার আদৌ উৎসাহিত করছে- এমন কোনোকিছুর প্রতিফলন এবারের জাতীয় বাজেটে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, আর্থিক মূল্যের হিসাবে বাংলাদেশের প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলারের পোশাকশিল্পের উন্নয়নের জন্য বৃহস্পতিবারের ঘোষিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী ন্যূনতম কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করলেও গত বছর একটি পোশাক কারখানার ভবন ধসে এগারোশ’ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত হওয়ার পরেও দেশের ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন ভবনে অবস্থিত কারখানাগুলো সরিয়ে নতুন জায়গায় নিতে কোনো অর্থ বরাদ্দ করেননি।

 

স্বল্প মজুরি এবং করমুক্ত সুবিধার জন্য চীনের পর পশ্চিমা বিশ্বের তৈরি পোশাকের চাহিদা মেটানোর জন্য বৃহত্তম বাজার হলো দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো।

 

২০১৪-১৫ অর্থবছরে শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য অর্থমন্ত্রী এএমএ মুহিত কারখানার ভবন নির্মাণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকে শুল্কমুক্ত করেছেন এবং অগ্নি-নিরোধক দরজা ও জরুরি আলোর মতো নিরাপত্তামূলক যন্ত্রপাতি থেকেও কর উঠিয়ে নিয়েছেন।

 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ৮০ শতাংশই যায় পশ্চিমা বাজারে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এদেশের পোশাকশিল্পে বেশ কিছু ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যুর পর এদেশের পোশাকশিল্পের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে পশ্চিমা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এই আস্থা পুনরুদ্ধারে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে পরিচালিত কারখানাগুলো সরিয়ে একটি পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলে নেয়ার জন্য সরকারি সহায়তা কামনা করছে পোশাক কারখানাগুলো।

 

গত বছরের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৩০ জনেরও বেশি শ্রমিক নিহত হন। এই ঘটনার মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ তৈরি পোশাক রফতানিকারী বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে নিয়োজিত প্রায় ৪০ লাখ মানুষের অনিরাপদ কর্মস্থান সারা বিশ্বের মনোযোগ কেড়ে নেয়।

 

ফলে বাংলাদেশের শ্রমিকদের অবস্থার উন্নয়নের দিকে নজর দেয় পশ্চিমা বিশ্বের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টির আইনগত ভিত্তি তৈরির ওপর জোর দিতে সংশ্লিষ্ট চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ইউরোপের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এবং ওয়াল-মার্টের মতো বড় বড় মার্কিন ক্রেতারা এদেশের অবাধ্য কারখানা মালিকদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে।

 

গত বছরের শেষের দিকে পোশাক শ্রমিকদের মজুরি ন্যূনতম ৭৭ শতাংশ বাড়িয়ে পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা অর্থাৎ ৬৮ ডলার এবং ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে শ্রমিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ও তাদের অধিকার সংরক্ষণের জন্য শ্রম আইন সংশোধন করে সরকার।

 

প্রধান বিরোধী দলের বর্জন করা এক সাংঘর্ষিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় দফায় সরকার গঠনের পর এটাই দেশটির দ্বিতীয় বাজেট। বিতর্কিত ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হরতাল-অবরোধ ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের কারণে গত বছর প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করায় দেশটির অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছিল। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে এই বাজেটে চলতি বছরের জিডিপি ৬.১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭.৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

 

বিদেশী ব্যবসায়ীরা এদেশের ব্যাপারে কোনো নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের ব্যাপারে পিছিয়ে যাওয়ার কারণে দেশটিতে ক্রমহ্রাসমান বেসরকারি বিনিয়োগই হাসিনা সরকারের প্রধান মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অনিরাপদ ভবন ও একই ভবনে বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভাগাভাগি করে পোশাক কারখানা চালানো প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত প্রায় ১৫ লাখ শ্রমিকের অনিরাপদ জীবনের দিকে তাকিয়ে সারা বিশ্বের ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের বাজার সরিয়ে নিচ্ছে এবং এই ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে পোশাক তৈরির ৩০ শতাংশ অর্ডারও বাংলাদেশের হাত থেকে সরে যাচ্ছে।

 

পশ্চিমা বাজারে তৈরি পোশাক রফতানিকারক পোশাক কারখানাগুলোর মধ্যে ছয়টি কারখানার ভবনকে সম্প্রতি বিশেষজ্ঞরা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করলেও সেগুলো বন্ধ না করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনটিতে।