ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Thursday, 18 September 2014 10:20

‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল-২০১৪’ পাস সংসদে

সংসদে উত্থাপিত ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল-২০১৪’ বিল পাস হয়েছে। এই বিল পাস হওয়ার মাধ্যমে সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা ফিরলো সাংসদদের হাতে। বুধবার রাতে সংসদ অধিবেশনে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল কণ্ঠ ও বিভক্তি ভোটে পাস হয়। এর আগে ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল-২০১৪’ পাসের প্রস্তাব করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

বিলটি রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর গেজেট আকারে প্রকাশ হওয়ার পর কার্যকর হবে। গত ৭ সেপ্টেম্বর আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বিলটি উত্থাপন করেন। উত্থাপনের পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এক সপ্তাহের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের জন্য বিলটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে প্রেরণ করা হয়। এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয় থেকে সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখায় বিলটি পাঠানো হয়। বিলে সংবিধানের বিদ্যমান ৯৬ অনুচেছদের পরিবর্তে নতুন ৯৬ অনুচেছদ প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন ৯৬ অনুচেছদের (১) দফায় বলা হয়েছে, এ অনুচেছদের বিধানাবলী সাপেক্ষে কোন বিচারক সাতষট্টি বৎসর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। (২) দফায় বলা হয়েছে, প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে কারণে মোট সদস্য-সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে প্রদত্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ ব্যতিত কোন বিচারককে অপসারিত করা যাবে না।(৩) দফায় বলা হয়েছে, এই অনুচেছদের (২) দফার অধীন প্রস্তাব সম্পর্কিত পদ্ধতি এবং কোন বিচারকের অসাদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত সংসদে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করবেন।(৪) দফায় বলা হয়, কোন বিচারপতি রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদ ত্যাগ করতে পারবেন। এছাড়া বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭-এর বিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং তাহাদের পক্ষে এ ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে। এর প্রতিফলনে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত রাষ্ট্রপতিকে সংসদ কর্তৃক অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ (অনুচেছদ ৫২), সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ (অনুচেছদ ৫৭), সংসদ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সমর্থিত প্রস্তাবের মাধ্যমে স্পিকারকে অপসারণ (অনুচেছদ ৭৪) এবং সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দ্বারা সমর্থিত প্রস্তাবের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণকে পদত্যাগ ও অপসারণ সম্পর্কিত পূর্ববর্তী বিধান অদ্যাবধি অপরিবর্তিত থাকলেও সামরিক শাসক কর্তৃক অসাংবিধানিক পন্থায় সামরিক ফরমান সেকেন্ড প্রক্লেমেশন (১৫তম সংশোধনী) আদেশ ১৯৭৮-এর সেকেন্ড সিডিউল দ্বারা সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্যরে অভিযোগে সংসদ কর্তৃক অপসারণের বিধান পরিবর্তনক্রমে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং অপর দু’জন প্রবীণ বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সংসদে রাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গের ন্যায় উচ্চ আদালতের বিচারকদের জবাবদিহিতার নীতি বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিদ্যমান রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনুচেছদ ৯৬ পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণকে সংসদের মাধ্যমে অপসারণের বিধান পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে অনুচেছদ ৭-এর চেতনা পুনর্বহালের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) আইন, ২০১৪-এর বিল উত্থাপন করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৭২-এর সংবিধানে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতেই ছিল। সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর সময় এ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। সংশোধনীটি হয় ১৯৭৪ সালে। পরে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলে এক সামরিক আদেশে বিচারপতিদের অভিশংসনের জন্য সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন করা হয়। এদিকে সংসদের বৈঠক ৮ সেপ্টেম্বর সোমবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ মুলতবি ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য, গত ১৮ আগস্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত বিল মন্ত্রিসভার অনুমোদন পায়। এর পরপরই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছিলেন, সংসদের চলমান অধিবেশনে বিলটি পাসের সম্ভাবনা রয়েছে। বাহাত্তরের সংবিধানে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্যের অনুমোদনের ভিত্তিতে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের যে বিধান ছিল, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সেটিই আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। পাশাপাশি বাদ পড়েছে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে বিচারক অপসারণের নিয়মটি। বাহাত্তরের সংবিধানে এই ৬৯ অনুচ্ছেদটি থাকলেও জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সামরিক ফরমানবলে ৬৯ অনুচ্ছেদটি সংশোধন করে এই ক্ষমতা জুডিসিয়াল কাউন্সিলের কাছে অর্পণ করা হয়। এটি করা হয়েছিল জাতীয় সংসদের অনুপস্থিতিতে, ১৯৭৮ সালে। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জার্মানি, নিউজিল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সংবিধানেও অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে রয়েছে। প্রসঙ্গত, নবম সংসদেও বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। ২০১১ সালে এ বিষয়টি ওঠে আসে। পরের বছর ২০১২ সালে তৎকালীন স্পীকার এ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের একটি রুলিংকে কেন্দ্র করে হাইকোর্টের একজন বিচারপতিকে অপসারণের দাবি তোলেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। তখন থেকেই বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনার দাবি ওঠে।