ঢাকা,শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০১৫, ২৯ ফাল্গুন ১৪২১, ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৬

Tuesday, 08 April 2014 19:55

ঢামেকে দালালের ফাঁদে রোগী

মঙ্গলবার সকাল বেলা। ব্যস্ত ও কোলাহলমুখর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে জরুরি বিভাগ। এ সময়ই সেখানে রোগী নিয়ে আসে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। কাছে গিয়ে দেখা যায়, প্রসব ব্যথা নিয়ে সেই অটোরিকশায় ছটফট করছেন মালা বেগম (২৭) নামে এক নারী। সঙ্গে তার বাবা নুরুল ইসলাম ও তার মা শেফালি বেগম। ভাড়া পরিশোধ করে নামতে না নামতেই তাদের ঘিরে ধরে বেশ কজন আয়া।

মালা ও তার পরিবারের লোকজন কিছু বলার আগেই দুজন আয়া বলতে শুরু করেন, সরকারি হাসপাতালে ভাল চিকিৎসা পাবেন না। সিটও খালি নেই। ডাক্তার থাকে না। তার চেয়ে চলেন, কাছেই ভালা হাসপাতাল আছে। টাকাও বেশি লাগবে না।

রোগীর পরিবারের কাছে তারা নিজেদের পরিচয় দেয় মিনা ও কুলসুম নামে।

তারা আবার বলতে শুরু করেন, রোগীর অবস্থা বেশি ভালো না কিন্তু। এখানে আপনার মেয়ের ভালো চিকিৎসা হবে না। এটি সরকারি হাসপাতাল, এখানে কথায় কথায় বেশি টাকা দিতে হবে। সময়ও লাগবে। এ সময় তারা ‘রোগীকে বাঁচাতে’ পরামর্শ দেন, মগবাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে। সেখানে ১০-১২ হাজার টাকার মধ্যে সব কাজ শেষ হয়ে যাবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন মিনা ও কুলসুম।

তবে আয়াদের কথায় কর্ণপাত না করে মালাকে তার বাবা-মা ঢামেক হাসপাতালেই ভর্তি করে। ততক্ষণে সিট না পেয়ে প্রচণ্ড প্রসব ব্যাথায় রোগী কাতরাচ্ছে মেঝেতে শুয়েই।

এই দৃশ্য ঢামেক হাসপাতালের প্রতিদিনের প্রতিমুহূর্তের। এখানে প্রতিনিয়িত দালালদের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন রোগীরা। দিন দিন তাদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। দালাল চক্রের ফাঁদে পড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগী ও তাদের অভিভাবকরা।

কমিশনের বিনিময়ে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঢামেক থেকে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় গ্রাম থেকে আসা রোগীদের। গোটা হাসপাতাল জুড়ে দাবড়ে বেড়াচ্ছে আয়া নামধারী এই দালালচক্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢামেকের একজন আনসার সদস্য ‘নবদেশ’ কে বলেন, হাসপাতালের পরিবেশ নষ্ট করে এ সমস্ত দালালরা। হাসপাতালের রোগীদের ফুসলিয়ে বাইরের বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়াটাই এই দালাল চক্রের কাজ।

ঢামেক কর্তৃপক্ষও যেন তাদের কাছে জিম্মি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ দালালদের সঙ্গে আশপাশের বেশ কিছু ক্লিনিকের সঙ্গে রয়েছে চুক্তি। রোগী পাঠাতে পারলেই কমিশন।

সূত্র জানায়, শুধু রোগী ভাগানোই নয়, ঢামেক প্রসূতি বিভাগ থেকে বাচ্চা চুরির নেটওয়ার্কের সঙ্গেও এসব দালালের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে কর্তৃপক্ষ অভিযান চালালেও কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবার সক্রিয় হয় দালালচক্র।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দালাল ‘নবদেশ’ কে বলেন, জরুরি বিভাগের সর্দার আর ওয়ার্ড মাস্টারকে হাতে রেখেই এসব করি। তাদের দাবি, ঢামেকের এক প্রশাসনিক কর্মকর্তাও তাদের হাতে।

ঢামেকের অনেকে দালালই ‘নবদেশ’ কে জানান, এসব কাজে সর্দার ইমরানই তাদের বস। এসব দালালির কমিশনের ভাগ যায় তার কাছেও। ইমরানের মামা আবদুল খালেক ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী সমিতির সভাপতি।

যদিও সর্দার ইমরান ‘নবদেশ’ কে বলেন, “আমরা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত নই। তাদের তাড়ানোর ব্যবস্থা করছি। এখন তারা বাঁচার জন্য আমার নাম ব্যবহার করছে। আনসার সদস্যদের বলা আছে এ দালালদের দেখামাত্র আটক করতে।”

জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. হরিদাস প্রতাব ‘নবদেশ’ কে বলেন, এই দালালচক্রকে কঠোর হাতে দমনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু তারা এতই সক্রিয় যে তারা ঘুরেফিরে আবারও জরুরি বিভাগে অবস্থান নেয়।

এ ব্যাপারে ঢামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান ‘নবদেশ’ কে বলেন, এ ব্যাপারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছি, এমনকি তাদের পুলিশের হাতেও সোপর্দ করেছি। তাদের বিরুদ্ধ কোনো সাক্ষী পাওয়া গেলেই আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারবো।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, গত ১০ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল থেকে আসা পলি বেগম দালালচক্রের ভুল পরামর্শের কারণে তিনি মারা যান।

পলির পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দালালের খপ্পরে পড়েই মেয়েকে তারা হারিয়েছেন। অন্যদিকে নবজাতকের অবস্থাও ভালো না। তাকে কয়েকদিন আইসিইউতে রাখতে হয়েছিল। এতে দালালরা মোটা অকেংর বিল ধরিয়ে দেন। তা পরিশোধ না করলে বাচ্চাকে দেয়া হবে না বলে জানিয়ে দেয় কর্তৃপক্ষ। পরে মেয়েকে দাফন করে মোটা অঙ্কের টাকা পরিশোধ করে বাচ্চাটিকে নিয়ে যান অভিভাবকেরা।

পরে পলি বেগমের অভিভাবকদের অভিযোগে প্রেক্ষিতে বহির্বিভাগের গেট থেকে এ ঘটনায় জড়িত পাঁচ নারী দালালকে আটক করে আনসার বাহিনীর সদস্যরা। এরা হলেন- মমতাজ, জুলেখা, রাবেয়া, ময়না ও হনুপা বেগম।

 

 

 

Last modified on Tuesday, 08 April 2014 20:11